Published on
:
2 min read
এই সময়, কেশপুর: চণ্ডীমঙ্গল রচয়িতা কবিকঙ্কণ মুকুন্দরামের প্রেরণাতেই নাকি তৈরি হয়েছিল কেশপুরের গড় সোনাপোতা গ্রামে দেব পরিবারের পুজো। দেবী এখানে অষ্টাদশভুজা। সাধারণত বাড়ির পুজোয় দুর্গার এমন রূপ দেখা যায় না। বিভিন্ন গবেষকদের লেখায় জানা গিয়েছে, কবিকঙ্কণ মুকুন্দরামের প্রেরণাতেই দেব পরিবারে অষ্টাদশভুজা দুর্গার পুজো শুরু হয়েছিল। সেই নিয়মে আজও পুজো হয়।
দেব পরিবারের বর্তমান সদস্যরা জানিয়েছেন, পশ্চিম মেদিনীপুরের বিস্তীর্ণ অঞ্চল এক সময়ে ঘন জঙ্গলে ঘেরা ছিল। ফলে বন্যপ্রাণীর নানা বিপদ থেকে রক্ষার তাগিদে স্থানীয় মানুষের মধ্যে দেবী আরাধনার যে লোকবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল, তার সঙ্গেও এই পুজোর ঐতিহ্য জড়িয়ে রয়েছে। সেই সূত্রেই দেবীর উগ্রচণ্ডা বা অরণ্যরক্ষাকারী রূপের সঙ্গে এই আরাধনার সম্পর্কের ব্যাখ্যা পাওয়া যায় গবেষকদের লেখায়। প্রকাশিত ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, কেশপুরের গড় সোনাপোতার এই পুজোর সঙ্গে কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর নাম জড়িয়ে রয়েছে। ‘চণ্ডীমঙ্গল’-এর রচয়িতা মুকুন্দরাম এক সময় এই পরিবারে গৃহশিক্ষক হিসেবে যুক্ত ছিলেন বলে জানা যায়। তাঁর উদ্যোগেই পরিবারের দুর্গারাধনায় এই বিশেষ অষ্টাদশভুজা রূপের প্রচলন হয় বলে জনশ্রুতি। বিভিন্ন গবেষকদের লেখাতেও মুকুন্দরামের সঙ্গে এই পুজোর যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিমার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য তাঁর আঠারোটি হাত। বিভিন্ন হাতে থাকে ত্রিশূল, বজ্র, খড়্গ, গদা, ধনু, তির, ডমরু, ঘণ্টা, শঙ্খ, চক্র, অঙ্কুশ, পাশ, ঢাল-সহ নানা অস্ত্র ও উপকরণ। এক হাতে থাকে অসুরের কেশের মুষ্টি।
প্রতিমার গড়নে প্রাচীন লোকায়ত শিল্পরীতির ছাপও সুস্পষ্ট। দেবীর সঙ্গে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের প্রচলিত মাটির তৈরি প্রতিমা এখানে থাকে না। তাঁদের উপস্থিতি চালচিত্রের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়। দেব পরিবারের পুজো শুরু হয়ে যায় জিতাষ্টমী থেকে। এই পুজোর আর এক বিশেষ আকর্ষণ নহবত। পুজোর দিনগুলিতে গ্রামের প্রবেশপথের কাছে বাঁশের উঁচু মাচা তৈরি করে সেখানে বসেন বাদকেরা। ঢাক-ঢোল, শিঙা-সহ নানা বাদ্যযন্ত্রের সুরে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। কয়েক প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই রীতি আজও পুজোর অন্যতম পরিচয়।
কালের নিয়মে পরিবর্তন হয়েছে। যার হাত ধরে হারিয়েছে জমিদারি, কমেছে আর্থিক সামর্থ্য। দেবোত্তর সম্পত্তির সীমিত আয় এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও অবশ্য দেব পরিবারের সদস্যরা পুজোর ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন। নীলমাধব দেব, লক্ষণ দেব, কমল দেব, দিবাকর দেব-সহ পরিবারের সদস্যরা এখনও নিয়ম মেনে পুজোর দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।
