ইরানের বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রশাসনের রেকর্ডটি বেশ হতাশাজনক। মাসের পর মাস তীব্র বোমা হামলা চালিয়েও তারা যেমন ইসলামিক প্রজাতন্ত্রকে কাবু করতে পারেনি, তেমনি আলোচনার টেবিলেও তেহরানের ইচ্ছাকে দমাতে ব্যর্থ হয়েছে।
তবু সাত মাসের ধারাবাহিক ব্যর্থতার পরও মার্কিন কর্মকর্তারা বিশ্বাস করছেন যে তাঁরা বুঝি পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন। তাঁরা নতুন নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে ভাবছেন যে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র খুব দ্রুত হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য হবে।
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে ওয়াশিংটন ইরানের অনেক ক্ষতি করেছে। কিন্তু ইসলামিক প্রজাতন্ত্র নিজে মনে করে না যে তাদের পতন ঘটছে। বরং তেহরান বিশ্বাস করে যে তারা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে পরাস্ত করবে। আর এই আত্মবিশ্বাসের কারণগুলোও খুব একটা দুর্বোধ্য নয়। কারণ, মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার মুখে ইরানি সরকার কেবল টিকেই থাকেনি, বরং তারা তীব্র আক্রমণাত্মক জবাব দিয়েছে।
তেহরানের অবস্থান আরও সংহত হয়েছে। কৌশলগত কিছু বিষয়ে তাদের ভেতরের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু তাদের মূল লক্ষ্য অভিন্ন: পারস্য উপসাগর থেকে মার্কিন বাহিনীকে তাড়িয়ে দেওয়া, ওয়াশিংটনকে সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে বাধ্য করা এবং ইরানকে একটি ‘মহাশক্তি’ হিসেবে মেনে নিতে যুক্তরাষ্ট্রকে বাধ্য করা।
ইসলামিক প্রজাতন্ত্র মনে করে তাদের এই লক্ষ্য এখন হাতের নাগালেই রয়েছে। তেহরানের জয়ের তত্ত্বটি হচ্ছে, তারা দীর্ঘ সময় টিকে থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে এমন এক অসহনীয় কষ্টের মুখে ফেলবে, যার ফলে ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত ইরানকে কোণঠাসা করার নীতি থেকে পিছু হটতে বাধ্য হবে।
বদলে যাওয়া
যুদ্ধ যে ইরানকে গভীরভাবে ক্ষতবিক্ষত করেছে, তা নিয়ে কারও দ্বিমত নেই। মাসের পর মাস মার্কিন ও ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে দেশটির শিল্প ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, বেকারত্ব বেড়েছে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যে নিপতিত হয়েছে। ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধের কারণে মূল্যস্ফীতি আকাশচুম্বী।
কিন্তু কৌশলগত দিক থেকে এই সংঘাত মার্কিন শিবিরের জন্য বিপর্যয়কর প্রমাণিত হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা ছিল, বিমান হামলা এবং ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার বহুমুখী পদক্ষেপগুলো ইসলামিক প্রজাতন্ত্রকে হাঁটু গেড়ে বসাতে বাধ্য করবে। কিন্তু তা হয়নি।
ওয়াশিংটন ভেবেছিল খামেনিকে হত্যা করলেই সরকারবিরোধী ব্যাপক জনরোষ বা গণ–অভ্যুত্থান শুরু হবে। সে পরিকল্পনাও ব্যর্থ হয়। বরং খামেনির মৃত্যুর পর ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের কট্টর সমর্থকেরা ঝাঁকে ঝাঁকে রাস্তায় নেমে আসে। দেশের প্রধান প্রধান শহরগুলোতে তারা রাতের পর রাত মিছিল করেছে এবং তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সাধারণ ইরানিরাও স্বদেশের সমর্থনে রাজপথে নেমে যোগ দিয়েছে।

জাতীয়তাবাদের এই জোয়ার অবশ্য ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের প্রতি সাধারণ মানুষের কোনো অন্ধ সমর্থন নয়। অনেক ইরানিই দেশের নেতৃত্বের ওপর এখনো গভীরভাবে ক্ষুব্ধ। কিন্তু সরকারের ওপর সেই ক্ষোভ এখন ওয়াশিংটনের প্রতি ক্ষোভের নিচে ঢাকা পড়ে গেছে।
অতীতে সাধারণ ইরানিরা ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের এই দাবি নিয়ে সন্দিহান ছিল যে যুক্তরাষ্ট্র আসলেই তাদের দেশটাকে ধ্বংস করতে চায়, এবং তারা বরং চেয়েছিল তেহরান যেন ওয়াশিংটনের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলে।
কিন্তু ইরানি শহরগুলোতে বোমাবর্ষণ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে বারবার দেশটির সভ্যতাকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার হুমকি সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্বে আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছে।
ওয়াশিংটন যখন প্রথম ২০২৫ সালের জুনে ইরানে বোমা হামলা চালায়, তখন থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিভিন্ন মতাদর্শের সাধারণ ইরানিদের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘ কথোপকথনে এই দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জানুয়ারি মাসের গণবিক্ষোভের সময় সংঘটিত দমন–পীড়নের পর বিশাল জনতা তাদের সরকারের ওপর চরম ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছিল।
কিন্তু আমরা দেখেছি, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এবং ট্রাম্পের ধ্বংসাত্মক কথাবার্তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক মনোভাব সম্পূর্ণ বদলে গেছে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকারের দাবিতে দীর্ঘদিন আন্দোলন করে জেল খাটা ৪৫ বছর বয়সী ভিন্নমতাবলম্বী আলী আমাদের বলেন, ‘আমরা আমেরিকান প্রতিশ্রুতির ওপর অন্ধের মতো বিশ্বাস করেছিলাম। কিন্তু এই যুদ্ধ এবং ট্রাম্প প্রশাসন যা বলেছে ও করেছে, তাতে এটা পানির মতো পরিষ্কার হয়ে গেছে যে আমেরিকানরা আমাদের একটা মিথ্যা গল্প বিক্রি করেছিল। তারা ইরানের সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ ছাড়া আর কিছুই চায় না, যা আমাদের কাছে একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।’
ত্রিশোর্ধ্ব লেখক ও চিত্রশিল্পী মহাসাও একই রকম অনুভূতি ব্যক্ত করেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র এত দিন যে স্বাধীনতা, সম্মান ও গণতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে নিজেদের তুলে ধরেছে, তার সবকিছুকেই এখন আমার কাছে ডাহা মিথ্যা বলে মনে হয়। বছরের পর বছর ধরে আমি আমার রাষ্ট্রের ওপর যতই রাগান্বিত থাকি না কেন, এটি আমাদের মাতৃভূমি—বাইরের কোনো দেশের অধিকার নেই আমাদের নেতাদের হত্যা করার, আমাদের শিশুদের ওপর বোমা ফেলার এবং আমাদের ধ্বংস করার চেষ্টা চালানোর।’
এ কারণেই, দেশ যুদ্ধের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও খামেনির জুলাই মাসের জানাজা মিছিলে লাখ লাখ মানুষের ঢল নেমেছিল বলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ওই অনুষ্ঠানে লোকজন একে অপরের মধ্যে লাল পতাকা বিলি করছিল, যা তাদের রক্তক্ষয়ী প্রতিশোধ নেওয়ার গভীর ইচ্ছার প্রতীক।
ইসলামিক প্রজাতন্ত্র মনে করে তাদের এই লক্ষ্য এখন হাতের নাগালেই রয়েছে। তেহরানের জয়ের তত্ত্বটি হচ্ছে, তারা দীর্ঘ সময় টিকে থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে এমন এক অসহনীয় কষ্টের মুখে ফেলবে, যার ফলে ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত ইরানকে কোণঠাসা করার নীতি থেকে পিছু হটতে বাধ্য হবে।
অনেক মার্কিন কর্মকর্তা হয়তো মনে করেন যে চরম অর্থনৈতিক চাপ শেষ পর্যন্ত মানুষের মনস্তত্ত্বে পরিবর্তন আনবে। কিন্তু এটি একধরনের অলীক কল্পনা। ১৫ বছর ধরে ইরান এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তুলেছে, যা বিশেষভাবে মার্কিন অর্থনৈতিক যুদ্ধ মোকাবিলা করার উপযোগী।
ইরানি কর্মকর্তারা প্রতিবেশী দেশগুলোর ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন এবং খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে দেশকে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তুলেছেন। ফলস্বরূপ, ইরানের অর্থনীতি মারাত্মক চাপের মধ্যে থাকা এবং মূল্যস্ফীতি বেশি হওয়া সত্ত্বেও দেশের শহর বা জনপদগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বা সেবার কোনো ঘাটতি দেখা দেয়নি।
এর মানে এই নয় যে ইরানিরা তাদের দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব আশাবাদী। তারা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং স্বাভাবিক অবস্থা ও অর্থনৈতিক স্বস্তি ফিরে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল। তবে তারা মার্কিন-ইসরায়েলি এই আগ্রাসনকে কোনো মুক্তির আলো হিসেবে দেখছে না। বরং তারা একে দেখছে আগ্রাসন হিসেবে।
এর ফলে যে জাতীয়তাবাদী চেতনার জন্ম হয়েছে, তা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার ব্যবধানকে ঝাপসা করে দিয়েছে এবং নতুন কোনো রাজনৈতিক অভ্যুত্থানের আশঙ্কাকে অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে। এই যুদ্ধ প্রকারান্তরে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে।

বেদনা ও প্রাপ্তি
দেশের সাধারণ মানুষের মতো ইরানি সরকারও এই সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে ওয়াশিংটনের প্রতি আরও কঠোর ও বৈরী দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতে শুরু করেছে। দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তাঁর বিশ্বস্ত সহযোগীদের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে বসিয়েছেন (যদিও তিনি নিজে আত্মগোপনেই রয়েছেন), যাঁরা মূলত ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সঙ্গে যুক্ত কট্টরপন্থী ব্যক্তিত্ব।
তাঁরা মনে করেন, যেকোনো উসকানির বিরুদ্ধে একটি চূড়ান্ত ও আক্রমণাত্মক জবাব না দিলে ভবিষ্যতে আরও আগ্রাসন ঠেকানো যাবে না। তাঁরা কূটনীতির বিষয়ে আমেরিকার সদিচ্ছা নিয়ে গভীর সংশয়ে রয়েছেন। তাঁরা যুক্তি দেখান যে আলোচনার মাঝেই যুক্তরাষ্ট্র দুবার ইরানে হামলা চালিয়েছে এবং জুনে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক থেকে সরে এসেছে—তাই তাদের কোনোভাবেই বিশ্বাস করা যায় না।
তুলনামূলকভাবে ইরানের মধ্যপন্থীরা কিছুটা ভিন্ন মনোভাব পোষণ করেন। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ, সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ জারিফের মতো ব্যক্তিরা ধারাবাহিকভাবে বলে আসছেন যে তেহরানের উচিত এই সংঘাতে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোঁজা। পেজেশকিয়ান ও গালিবাফ সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক দুর্দশার দিকটি বারবার তুলে ধরেছেন।
তবে দেশের কট্টরপন্থী নেতাদের সঙ্গে তাঁদের ব্যবধান যতটা মনে হয়, আসলে ততটা নয়। একজন বিশ্লেষক আমাদের জানান, ‘কেউই বলছে না যে ইরানের আত্মসমর্পণ করা উচিত।’ তাঁরা অর্থনৈতিক স্বস্তিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে দেখলেও, তাঁদের সমাধান হলো, যুক্তরাষ্ট্রকে জুন মাসে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি বাস্তবায়ন করতে বাধ্য করা।
তাঁরা মনে করেন, ট্রাম্প কেবল তখনই এই চুক্তিতে ফিরে আসবেন যখন তিনি ইরানের বিজয়ের বাস্তবতাকে মেনে নিতে বাধ্য হবেন, আর তার অর্থ হলো আমেরিকার জন্য এই যুদ্ধের ব্যয় ও মাশুল আরও বাড়িয়ে দেওয়া।
ফলস্বরূপ, ইরানের আচরণ হবে সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত এবং অসামঞ্জস্যপূর্ণ। যুদ্ধ যদি আবার শুরু হয়, তবে তা কেবল দেশের আশপাশের এলাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে। তেহরানের মূল ধারাটি বিশ্বাস করে যে অতিরিক্ত সতর্কতা বা পূর্বানুমেয় নীতি কেবল আমেরিকার চাপকেই আরও বাড়িয়ে দেবে এবং তাদের প্রধান সামরিক লক্ষ্যগুলোকে একচুলও এগিয়ে নেবে না।
ইরানের লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে পারস্য উপসাগর থেকে মার্কিন বাহিনীকে পুরোপুরি তাড়িয়ে দেওয়া এবং ইরানের আঞ্চলিক প্রাধান্যকে স্বীকার করে নিতে ওয়াশিংটনকে বাধ্য করা। পারস্য উপসাগরজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলোতে ইরানের বারবার হামলা ইতিমধ্যে ঠিক এই উদ্দেশ্যেই পরিচালিত হচ্ছে। এক অর্থে তারা এতে সফলও হয়েছে।
তেহরান অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী যে তারা বর্তমান পথ ধরেই কাঙ্ক্ষিত বিজয় অর্জন করতে পারবে। এখানে কোনো ধরনের আপস করার প্রয়োজন নেই।
তেহরান একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের উপসাগরীয় অংশীদারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে, যাতে তারা তাদের দেশের অভ্যন্তরে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো বন্ধ করে দেয়।
এই উদ্দেশ্যে তারা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছে যে পারস্য উপসাগরের শান্তি ও নিরাপত্তা নির্ভর করছে মার্কিন সামরিক উপস্থিতিকে এই অঞ্চল থেকে বিতাড়ন করার ওপর।
অবশ্য ইরান অর্থনৈতিক স্বস্তি অর্জন না করেও তার আশপাশের এলাকা থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে বিতাড়িত করতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, ট্রাম্প প্রশাসন অর্থনৈতিক ‘ডি-ডে’ ঘোষণা করেছিল এই কারণে যে একদিকে তাদের সামরিক বাহিনী ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল এবং অন্যদিকে ইরানের নৌবাহিনীর হামলায় মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো ইরানি উপকূল থেকে অনেক দূরে সরে যেতে বাধ্য হয়েছিল।
তবে ইরানের বিশ্বাস, তারা পর্যাপ্ত আর্থিক ক্ষতিসাধনের মাধ্যমে তাদের এই প্রতিপক্ষকে কোনো না কোনো ধরনের অর্থনৈতিক বোঝাপড়ায় আসতে বাধ্য করতে পারবে। হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তেহরান, যাকে তারা তাদের সার্বভৌম ভূখণ্ড বলে মনে করে। ওয়াশিংটন এই প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তুলছে, কিন্তু এটা যুক্তরাষ্ট্র চিরকাল টিকিয়ে রাখতে পারবে না।
ইরানের আঞ্চলিক অংশীদারেরাও এ ক্ষেত্রে তাদের সাহায্য করে যাচ্ছে। ইরাকে অবস্থিত ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল পাইপলাইনে হামলা চালিয়েছে, যা সৌদি আরবের তেল লোহিত সাগরের টার্মিনালে বহন করে নিয়ে যেত। ইয়েমেনের হুতি মিত্ররাও ধারাবাহিকভাবে সৌদির তেল স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
এমনকি হুতিরা নতুন নতুন বিশাল ভূখণ্ড দখল করে সোজা বাব আল-মানদেব প্রণালিতে পৌঁছে গেছে। এটা প্রমাণ করে যে লেবানন ও সিরিয়ায় ইরানের নেটওয়ার্ক কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সামগ্রিকভাবে তারা এখনো বেশ শক্তিশালী এবং কার্যকর রয়েছে।

ধীরস্থিরভাবে চলা
যুক্তরাষ্ট্র হয়তো মনে করতে পারে যে তারা ইরানকে কোণঠাসা করে ফেলেছে। কিন্তু তেহরান তা মনে করে না। তারা নিজেদের পিঠ ঠেকে যাওয়া বা বিকল্পহীন বলে মনে করে না। বরং তাদের দৃঢ় বিশ্বাস যে তারা একটি পরাশক্তির মর্যাদা অর্জন করেছে।
তারা তাদের সামরিক পারফরম্যান্স নিয়ে গর্বিত এবং তাদের নতুন আন্তর্জাতিক সম্মান ও মর্যাদার অনুভূতি রয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত ‘সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা’ এবং পশ্চিমাবহির্ভূত ‘ব্রিকস’ জোটের বৈঠকে যখন ইরানের প্রতিনিধিদলকে সদস্যরাষ্ট্রগুলো অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে অভ্যর্থনা জানায়, তখন তেহরানের কর্মকর্তারা আনন্দে উল্লাস প্রকাশ করেছিলেন।
ইরান এখনো বিশাল সব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি এবং যুদ্ধে তারা যা অর্জন করেছে তাকে কীভাবে একটি স্থায়ী ও শান্তিকালীন সুবিধায় রূপান্তর করতে হবে, তার কোনো চূড়ান্ত পথ তারা এখনো খুঁজে পায়নি। তবে প্রয়োজন পড়লে তারা লড়াই চালিয়ে যেতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তেহরান অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী যে তারা বর্তমান পথ ধরেই কাঙ্ক্ষিত বিজয় অর্জন করতে পারবে। এখানে কোনো ধরনের আপস করার প্রয়োজন নেই।
নর্গেস বাজোগ্লি নৃবিজ্ঞানী এবং জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক। ওয়ালি নাসের জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক। ফরেন এফেয়ার্স থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।
