রাজধানীতে মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত বেপরোয়া হয়ে উঠছে ছিনতাইকারীরা। ফাঁকা সড়ক, ফ্লাইওভার, বাস টার্মিনাল ও রেলস্টেশনসংলগ্ন এলাকায় ওঁৎ পেতে থেকে যাত্রী ও পথচারীদের টার্গেট করছে তারা। রিকশা-অটোরিকশায় চলাচলকারী যাত্রীদের ব্যাগ, মুঠোফোন ও টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি ধারালো অস্ত্রের আঘাতে প্রাণঘাতী হামলাও চালাচ্ছে। দিন-রাতের বিভিন্ন সময়ে তিন ধাপে সক্রিয় এসব চক্রের সদস্যদের মধ্যে বাড়ছে তরুণদের সংখ্যা। পুলিশের অভিযান ও গ্রেপ্তার অব্যাহত থাকলেও থামছে না ছিনতাই। গত তিন মাসে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) আওতায় এ সংক্রান্ত মামলা হয়েছে মাত্র ৬৫টি। তবে ভুক্তভোগীদের অনেকেই মামলা না করায় ছিনতাইয়ের প্রকৃত চিত্র আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, মাদকাসক্তি, অর্থনৈতিক সংকট ও সামাজিক প্রতিরোধের ঘাটতি
রাজধানীতে ছিনতাইয়ের বিস্তার ঘটাচ্ছে।
ছিনতাইয়ের ঘটনা ও গ্রেপ্তার আসামিদের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পুলিশের তালিকাভুক্ত ও গ্রেপ্তার হওয়া ছিনতাইকারীদের অধিকাংশের বয়স ২০ থেকে ২৫ বছর। পুরনো পেশাদার অপরাধীদের পাশাপাশি ছিনতাইয়ে প্রতিদিন নতুন মুখ বাড়ছে। এসব ছিনতাইকারী প্রতিদিনের ২৪ ঘণ্টাকে তিন ধাপে ভাগ করে ছিনতাই করছে। এর মধ্যে মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত ছিনতাইকারীরা বেশি ভয়ংকর হয়ে ওঠে। ছিনতাইকারীদের হাতে প্রাণ যাচ্ছে সাধারণ মানুষের।
গতকাল শনিবার সকাল সোয়া ৭টার দিকে রাজধানীর শ্যামলীতে স্ত্রীসহ ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন সাংবাদিক শাহজাহান আকন্দ শুভ ও তার স্ত্রী। অটোরিকশায় কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ডে যাওয়ার সময় একটি মোটরসাইকেলে আসা দুজন ছিনতাইকারী হেঁচকা টানে ভ্যানিটি ব্যাগ নিয়ে যায়। ছিনতাইকারীরা নগদ টাকা, মোবাইল ফোন ও অন্য মূল্যবান মালামাল নিয়ে গেছে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মোহাম্মদপুর সাদেক খান রোডে সকাল সাড়ে ৭টার দিকে হৃদয় মিয়া নামে এক ব্যবসায়ীকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে মোটরসাইকেল ও টাকা ছিনতাই করা হয়েছে। সম্প্রতি মোহাম্মদপুর রায়েরবাজার কবরস্থানে ছিনতাইয়ের শিকার হন এক যুবক। তিনি জানান, বাবাসহ মায়ের কবর জিয়ারত করতে গিয়েছিলেন। কবর জিয়ারত শেষে পেছন ফিরে তাকাতেই কয়েকজন তাদের চাপাতি হাতে ঘিরে ধরে মোবাইল ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেয়।
এর আগে চোখের চিকিৎসা করাতে বগুড়া থেকে ঢাকায় এসে ২৯ আগস্ট ভোরে ছিনতাইকারীর ব্যাগের টানে রিকশা থেকে পড়ে মারা যান শিক্ষক রনজিলা পারভিন। চলতি বছরের শুরুতে উত্তরায় মুক্তা আক্তার এবং গত জুনে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সামনে সোহেলি ইসলামও একই কৌশলে ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে প্রাণ হারান।
সম্প্রতি রাতের অন্ধকারে ফ্লাইওভারের দুই পাশে নাইলনের শক্ত সুতা টানিয়ে মোটরসাইকেল চালকদের ফাঁদে ফেলা হচ্ছে। সুতায় আটকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন বাইকাররা। এরপরই অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে তাদের টাকা, মোবাইল, ল্যাপটপ এমনকি মোটরসাইকেলও ছিনিয়ে নিচ্ছে ছিনতাইকারীরা। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী সাইফুর রহমান সম্প্রতি গভীর রাতে মহাখালী ফ্লাইওভার দিয়ে বাসায় ফিরছিলেন। ফ্লাইওভারের মাঝামাঝি পৌঁছতেই হঠাৎ তার গলায় কিছু একটা এসে লাগে এবং এতে তিনি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। কিছু বুঝে উঠার আগেই তার ফোন মানিব্যাগ কেড়ে নেয় ছিনতাইকারীরা। ১৫ সেপ্টেম্বর রাত আড়াইটায় আইটি বিশেষজ্ঞ তানভীর আহমেদ মহাখালী ফ্লাইওভারে একইভাবে দামি স্মার্টফোন, ল্যাপটপ ব্যাগ এবং মানিব্যাগ খোয়ান।
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ আমাদের সময়কে বলেছেন, ছিনতাইসহ অপরাধ দমনে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট, বিশেষ করে ঢাকার প্রবেশ পথে ২৪ ঘণ্টা চেকপোস্ট চলছে। সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও যানবাহন নিবিড় তল্লাশির আওতায় আনা হচ্ছে। পাশাপাশি আমাদের ফুট প্যাট্রল, মোবাইল প্যাট্রল এবং মোটরসাইকেল প্যাট্রল জোরদার করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর এলাকার সার্বিক নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্থাপন করা হয়েছে সিসি ক্যামেরা। আসামি গ্রেপ্তারের পাশাপাশি মামলার তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
পুলিশের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গতকাল শনিবার মোহাম্মদপুর থেকে ১৩ জন ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। গ্রেপ্তার হওয়া ছিনতাইকারীদের মধ্যে ১৯ বছর বয়সী ২ জন, ২০-২২ বছর বয়সী ৩ জন, ২৩-২৫ বছর বয়সের ৪ জন ও ২৬ বছর বয়সী একজন রয়েছে। এছাড়া তিনজন ছিনতাইকারী কিশোর। ছিনতাইকারীদের গড় বয়স মাত্র ২২ বছর। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, তরুণদের পাশাপাশি কিশোরও ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়ছে। প্রতিদিনই ছিনতাইকারীদের দলে বাড়ছে নতুন মুখ। মাদক ও গ্যাং কালচারের কারণে কঠোর অভিযানের ফলেও ছিনতাইয়ের ঘটনা থামছে না।
পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ছিনতাইকারীদের বিনিয়োগ কেবল ঝুঁকি। মাদকাসক্ত হওয়ায় তাদের ভয়-ডর কম। মাদকের টাকা জোগাড় করতে এসব অপরাধী কোনো বাছ-বিচার না করেই ছুরি চালিয়ে দেয়। গ্রেপ্তারের পর দেখা যাচ্ছে একই ছিনতাইকারী আগে অন্তত ৮-১০ বার গ্রেপ্তার হয়েছিল। কারাগার থেকে বের হয়ে আবার ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়ছে।
ডিএমপির পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলার সংখ্যা খুবই কম। গড়ে প্রতিদিন একটি মামলাও হয় না। ডিএমপিতে চলতি বছরের গত তিন মাসে ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা হয়েছে মাত্র ৬৫টি। এর মধ্যে জুলাই মাসে মামলার সংখ্যা ছিল মাত্র ২০টি, আগস্টে বেড়ে দাঁড়ায় ২২টি এবং সেপ্টেম্বর মাসে মামলার সংখ্যা ছিল ২৩টি।
তবে ভুক্তভোগীরা বলছেন, এই মামলার হিসাব ছিনতাইয়ের প্রকৃত চিত্র না। ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে অনেকেই আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে চান না। এ কারণে অধিকাংশ ছিনতাই ঘটনা অজানা থেকে যায়। ছিনতাইয়ের ঘটনায় খোয়া যাওয়া মালামাল উদ্ধারের নজির কম থাকায় ভুক্তভোগী থানা পর্যন্ত যেতে চান না। ছিনতাইয়ের ঘটনায় হতাহতের ঘটনা ঘটলেই কেবল প্রকাশ্যে আসে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, অর্থনৈতিক সংকট দীর্ঘ সময় চলতে থাকলে নৈতিক বিপর্যয় তৈরি হয়ে ছিনতাই ও লুটের মতো ঘটনা আরও বাড়বে। মাদকের কারণেও ছিনতাই ঘটনা বাড়ছে। আর এসবের ভুক্তভোগী হচ্ছে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ, যা জনজীবনে উদ্বেগ তৈরি করছে। এ ছাড়া ডাকাতি-ছিনতাইয়ের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রতিরোধ না থাকায় এ ধরনের অপরাধ থামছে না।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারাও বলছেন, ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত অন্তত ৯০ ভাগই মাদকাসক্ত। মূলত মাদকের টাকা জোগাতেই তারা ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়ে। মাদকাসক্তরা কোনো বাছ-বিচার ছাড়াই টার্গেট পথচারীদের শরীরের ছুরি কিংবা চাকু বসিয়ে দেয়। মাদকের সহজলভ্যতা না ঠেকাতে পারলে মাদকাসক্ত ছিনতাইকারীদের ঠেকানো কঠিন। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে ছিনতাইকারীদের শেল্টার দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। রাজধানীতে ছিনতাইকারীদের কয়েকটি গ্রুপ পার্শ্ববর্তী সাভার, গাজীপুর, টঙ্গী, নারায়ণগঞ্জ এলাকা থেকে রাতে ঢাকায় এসে ছিনতাই করে পালিয়ে যায়।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দিনে-রাতে ভাগ করে রাজধানীতে চলছে ছিনতাই-ডাকাতি। সময় বণ্টনের পাশাপাশি তিন শতাধিক স্পটকে ভাগাভাগি করে নিয়েছে ছিনতাইকারীরা। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত ছিনতাইকারীরা ব্যাংক পাড়াসহ বাণিজ্যিক এলাকাগুলোকে বেছে নিচ্ছে। বিকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ছিনতাইকারীরা ছড়িয়ে পড়ছে অলিগলি ও নীরব রাজপথে। টার্গেট তাদের পথচারী। ভোর রাত থেকে সকাল পর্যন্ত বাস টার্মিনাল, লঞ্চ টার্মিনাল ও রেলস্টেশনের আশপাশে ওঁৎ পতে থাকা ছিনতাইকারীরা দূরপাল্লার যাত্রীদের টার্গেট করছে। তবে বর্তমানে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সামনে ছিনতাই কমে এলেও রাতের ছিনতাই থামানো যাচ্ছে না।
ভোর রাত ভয়ংকর : পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা দূরপাল্লার বাসগুলো যাত্রী নিয়ে টার্মিনাল বা কাউন্টার এলাকায় মধ্য রাত বা ভোরের দিকে নামিয়ে দেয়। এ সময় বাসের কাউন্টারগুলো বন্ধ থাকে। এ কারণে দূরের যাত্রীরা কোথাও অপেক্ষা করতে না পেরে ঝুঁকি নিয়ে নিজ নিজ বাসায় ফেরার উদ্যোগ নেন। বিশেষ করে ভোররাতে ঢাকার রাস্তা ফাঁকা হয়ে যাওয়ায় ছিনতাইকারীরা রাতের শেষ ভাগকে বেছে নেয়। ভোরে বাস, ট্রেন বা লঞ্চ থেকে ঢাকায় নামা মানুষকে টার্গেট করে ছিনতাইকারীরা। এ সময় দোকানপাট ও অধিকাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় প্রত্যক্ষদর্শী মানুষ কম থাকে। ফলে ছিনতাইকারীদের মধ্যে ধরা পড়ার ভয় কম থাকে। ছিনতাইকারীদের মোটরসাইকেলে করে দ্রুত পালিয়ে যেতে পারায় ভোররাত ছিনতাইকারীদের জন্য উপযুক্ত সময়।
