খুলনা কি ক্রমেই খুন-খারাবির নগরীতে পরিণত হচ্ছে? এক দিনে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে গুলি করে যুবক ও গৃহবধূকে হত্যার ঘটনা এই প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। গত বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) ভোরে তুষার (২৭) এবং সন্ধ্যায় খুশি (২৪) নামের দুজনকে হত্যা করা হয়েছে। পৃথক দুটি হত্যাকাণ্ডের পর নগরজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক। কথার আগে গুলি চলছে-সুশাসনের জন্য নাগরিকের খুলনা জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট কুদরত ই খুদার এই বক্তব্য পরিস্থিতির ভয়াবহতাই তুলে ধরে। একটি নগরীতে মানুষ যদি নিজের জীবন ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকে, তবে সেই পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বলার সুযোগ নেই।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত নয় মাসে খুলনা নগর ও জেলায় ৬৬টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে নগরীতেই ৩৩টি। আবার ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী দেড় বছরে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ৯১। এসব পরিসংখ্যান নিছক সংখ্যার হিসাব নয়; প্রতিটি হত্যাকাণ্ড একটি জীবন, একটি পরিবার এবং সমাজের নিরাপত্তাবোধের ওপর আঘাত। এর সঙ্গে হুমকি-ধমকি, চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধের অভিযোগ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার তথ্য পরিস্থিতিকে আরো উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
খুলনায় অপরাধী গোষ্ঠীর তৎপরতা যে জননিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে উঠেছে, পুলিশের বক্তব্যেও তার প্রতিফলন রয়েছে। নগর ও আশপাশে একাধিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সক্রিয় থাকার কথা জানিয়েছে পুলিশ। রূপসা, বটিয়াঘাটা, দিঘলিয়া ও তেরখাদাকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন খুলনার পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত নয় মাসে রূপসায় ১১টি, তেরখাদায় দুটি, দিঘলিয়ায় চারটি এবং বটিয়াঘাটায় তিনটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এসব এলাকায় অপরাধের বিস্তার ঠেকাতে বিশেষ নজরদারি ও কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এখন অপরিহার্য।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে: সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর হাতে অস্ত্র আসছে কোথা থেকে, তাদের অর্থের জোগানদাতা কারা, বিরোধের নিষ্পত্তির বদলে কেন গুলিই হয়ে উঠছে শেষ কথা? শুধু হত্যাকাণ্ডের পর অভিযান চালিয়ে অপরাধী গ্রেফতারের চেষ্টা যথেষ্ট নয়। অবৈধ অস্ত্রের উৎস, মাদক কারবারের নেটওয়ার্ক, অপরাধীদের আশ্রয়দাতা এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকতার সম্ভাব্য যোগসূত্র শনাক্ত করতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাব যা-ই থাকুক, অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
খুলনায় অতীতেও হত্যাকাণ্ডের উচ্চ হার নিয়ে উদ্বেগ ছিল। অতীতের কোনো সরকারের আমলে পরিস্থিতি খারাপ ছিল বলে বর্তমানের রক্তপাতকে মেনে নেওয়া যায় না। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে নাগরিকের নিরাপত্তার মানও বদলাতে হবে। জনগণ শুধু অপরাধের পর পুলিশের তৎপরতা দেখতে চায় না; তারা চায় অপরাধ সংঘটনের আগেই কার্যকর প্রতিরোধ।
এ জন্য নগর ও জেলাভিত্তিক হত্যাকাণ্ডের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ, অপরাধপ্রবণ এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, মাদক কারবার দমন, দ্রুত তদন্ত এবং নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে তদন্ত ও অভিযানের অগ্রগতি তদারকির ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে গ্রেফতার অভিযান সাময়িক তৎপরতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
খুলনার মানুষ আতঙ্ক নয়, নিরাপত্তা চায়; আশ্বাস নয়, দৃশ্যমান ফলাফল চায়। সরকারের দায়িত্ব কেবল অপরাধের পর প্রতিক্রিয়া দেখানো নয়, অপরাধের পরিবেশ ভেঙে দেওয়া। খুলনা হোক কিংবা দেশের অন্য কোনো অঞ্চল- প্রতিটি নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কোনো অজুহাত গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। রক্তপাত বন্ধ, অপরাধী চক্রের দৌরাত্ম্য নির্মূল এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এখনই কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে।
সানা/আপ্র/২৪/১০/২০২৬
