পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন বাংলাদেশের অন্যতম সমস্যা। সেই সাথে আছে প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা আর ঠিকাদারি খাতের অনিয়ম। গ্রাম-গঞ্জের উন্নয়ন প্রকল্পে প্রায়ই দেখা যায় রাস্তা খুঁড়ে দীর্ঘদিন ফেলে রাখা হয়। গতকাল নয়া দিগন্তের খবর থেকে জানা গেছে, ময়মনসিংহের ভালুকায় পাকা করার উদ্দেশ্যে একটি রাস্তা খুঁড়ে রাখা হয়েছে আট বছর আগে। তারপর উধাও হয়ে গেছে ঠিকাদার। দীর্ঘ আট বছর ধরে খুঁড়ে রাখা এই রাস্তা ধরে যাতায়াত করেন ছয় গ্রামের মানুষ। বর্ষা কিংবা শুষ্ক মৌসুম, কোনো সময়ই চলাচলের উপযোগী থাকে না সড়কটি।
আংগারগাড়া বাজার থেকে চামিয়াদি বাজার পর্যন্ত প্রায় ছয় কিলোমিটার সড়কের উন্নয়নে ২০১৮-১৯ সালে দরপত্র আহ্বান করা হয় ময়মনসিংহ রিজিওনাল রুরাল ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের আওতায়। একই প্যাকেজে আরো দু’টি সড়কের কাজ ছিল। ‘ডলি কনস্ট্রাকশন’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ছয় কোটি ৯৩ লাখ ১৯ হাজার ৩৮৮ টাকায় কাজটি পায়। কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর। শেষ করার কথা ১৬ মার্চের মধ্যে। সময়মতো কাজ শেষ না করায় ওই প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি বাতিল করা হয়। সেই সাথে লাইসেন্স বাতিলের সুপারিশ করে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু সমস্যার সমাধান কি হলো?
এত বড় অবহেলা ও অনিয়মের পরও চুক্তি বাতিল বা ব্যবস্থা নিতে এত সময় পেরিয়ে যাওয়া প্রশাসনিক নজরদারির শিথিলতা। সড়কটি এখনো বেহাল অবস্থায়ই রয়েছে। যোগাযোগের সমস্যা হচ্ছে। ছয় গ্রামের কৃষি ও খামার অর্থনীতিতে পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব। সড়কের আশপাশে আছে দুই শতাধিক পোলট্রি ও গবাদিপশুর খামার। খামার মালিকরা বইছেন অতিরিক্ত পরিবহন খরচের চাপ। কৃষকরা সময়মতো পণ্য বাজারে নিতে পারছেন না। শিক্ষার্থীদের স্কুলে আসা-যাওয়ায় সমস্যা হচ্ছে। যাতায়াত খরচ চার থেকে পাঁচগুণ বেড়ে গেছে। খরচ বেড়ে যাওয়ায় পণ্য বিক্রি করে পুষিয়ে উঠতে পারছেন না কৃষকরা। ভালুকার ওই সড়কের মতো দেশে অনেক সড়ক আছে, যেগুলোর খবর পত্রিকার পাতায় আসেনি। এই অচলাবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে ব্যবস্থাপনায় সংস্কার আনা জরুরি। কাজ ফেলে উধাও হয়ে যাওয়া ঠিকাদারদের কেবল লাইসেন্স বাতিল করলেই হবে না, তাদের দায়িত্বহীনতায় যে আর্থসামাজিক ক্ষতি হয়েছে, সেই ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে। আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। এটি কেবল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায় নয়। এলজিইডিসহ সরকারি তদারকি কর্মকর্তাদের ব্যর্থতা ও পরোক্ষ যোগসাজশের বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আনা জরুরি। আট বছর ধরে কাজ বন্ধ থাকার পরও মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলী ও প্রশাসনিক কর্তারা কেন চুপ ছিলেন, সঠিক সময়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেননি কেন, সে হিসাবও বের করতে হবে। মনিটরিং ব্যবস্থা আরো গতিশীল করা জরুরি, যাতে প্রকল্প শুরুর পর কোনো ঠিকাদার কালক্ষেপণ করলে শুরুতেই ব্যবস্থা নেয়া যায়। এখন স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত নাগরিক কমিটি গঠন এবং ডিজিটাল নজরদারির মাধ্যমে প্রতিটি কাজের অগ্রগতি প্রকাশ্যে আনার সময় এসেছে।
ভালুকার এই সড়কের কাজ দ্রুত শুরু করতে হবে, যাতে ভুক্তভোগীদের ভোগান্তির অবসান হয়।
