
কমিটি গঠন ও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইকে ঘিরে রাউজান উপজেলা বিএনপি’র দীর্ঘদিনের চেপে রাখা অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও দ্বন্দ্ব আবারও প্রকাশ্যে এসেছে। একদিকে স্থানীয় সংসদ সদস্যের ঘোষিত নতুন আহ্বায়ক কমিটি, অন্যদিকে ২০২৫ সালের কমিটির বহাল থাকার দাবি–সব মিলিয়ে নতুন করে জেগে উঠে উপজেলা বিএনপির পুরনো বিরোধ।
জানা গেছে, বর্ধিত সভা করে গত শনিবার রাউজান উপজেলা বিএনপি’র আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা করা হয়। সভায় আলহাজ্ব নুরুল হুদা চেয়ারম্যানকে আহ্বায়ক ও ফিরোজ আহমেদকে সদস্য সচিব করে ৩১ সদস্যের এ কমিটি ঘোষণা দেন স্থানীয় সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী। একইদিন রাউজানের ১৩টি ইউনিয়নে নতুন আহ্বায়ক কমিটিও ঘোষণা হয়।
এদিকে গত শনিবার রাউজান উপজেলা বিএনপির কমিটি ঘোষণার পর অধ্যাপক জসিম উদ্দিন চৌধুরী ও মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন যৌথ স্বাক্ষরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে রাউজানের ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদ প্রত্যাশীদের নির্ধারিত ফরম সংগ্রহ করে জমা দেয়ার আহবান জানান। এর মধ্যে অধ্যাপক জসিম উদ্দিন চৌধুরী উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন নিজেকে সাধারণ সম্পাদক পরিচয় দেন। একইসঙ্গে যৌথ বিবৃতিতে তারা দাবি করেছেন, ২০২৫ সালে উত্তর জেলা বিএনপির তত্ত্বাবধানে ঘোষিত তাদের কমিটির কার্যক্রম এখনো চলমান। জানা গেছে, ২০২৫ সালে দ্বিবার্ষিক সম্মেলন ও কাউন্সিলের ঘোষণা থাকলেও পরে সম্মেলন ছাড়াই উপজেলা বিএনপির সভাপতি–সম্পাদক হিসেবে আনোয়ার হোসেন ও জসিম উদ্দিন চৌধুরীর নাম ঘোষণা করে কাউন্সিলের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার। এই দুইজন বিএনপি চেয়ারম্যানেরর উপদেষ্টা গোলাম আকবর খোন্দকারের অনুসারি।
বিরোধের শুরু যেভাবে : জানা গেছে, উত্তর জেলা বিএনপি’র পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৮ জানুয়ারি রাউজান উপজেলা বিএনপি ও পৌরসভার দ্বিবার্ষিক সম্মেলন ও কাউন্সিল হওয়ার কথা। সম্মেলনের ভেন্যু হিসাবে ধার্য্য করা হয় রাউজান উপজেলা সদরের এ কে এম ফজলুল কবির চৌধুরী অডিটোরিয়াম। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ১০ ও ১১ জানুয়ারি সকাল ১০ টা থেকে ৫টা পর্যন্ত দলীয় কার্যালয় নাসিমন ভবন চট্টগ্রাম হতে প্রার্থীগণ মনোনয়ন পত্র সংগ্রহ, ১২ জানুয়ারি জমা প্রদান এবং ১৪ জানুয়ারি যাচাই–বাছাই ছিল। তবে নির্ধারিত সে সম্মেলন হয়নি। এরপর ১৪ জানুয়ারি বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় আনোয়ার ও জসিমকে নির্বাচিত দেখানো হলেও তা প্রকাশ করা হয় ২০ জানুয়ারি।
এরপর গিয়াস কাদের চৌধুরীর অনুসারিরা আনোয়ার–জসিমের ওই কমিটি বিলুপ্তির দাবি জানান। সংবাদ সম্মেলনের পাশাপাশি পালন করেন বিভিন্ন কর্মসূচিও। পরবর্তীতে বিভিন্ন কর্মসূচিতে আলহাজ্ব নুরুল হুদা চেয়ারম্যানকে আহ্বায়ক ও ফিরোজ আহমেদকে সদস্য সচিব পরিচয় দেয়া হত। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২৯ জুলাই রাউজান–রাঙামাটি সড়কের হালদা সেতুর অদূরে সর্তাঘাট এলাকায় বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষ হয়। এসময় হামলা করা হয় চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির তৎকালীন আহ্বায়ক গোলাম আকবর খোন্দকারের উপর। এ ঘটনার জের ধরে বিলুপ্ত করা হয় উত্তর জেলা বিএনপি’র কমিটিও।
এদিকে গত ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীকে দলের প্রার্থী ঘোষণা করার হলে তারপক্ষে প্রচারণায় অংশ নেয়ার জন্য নিজের কর্মীদের নির্দেশনা দেন গোলাম আকবর খোন্দকার। নির্বাচন পরবর্তী সময় থেকে এখন পর্যন্ত গোলাম আকবর খোন্দকার অনুসারিদের একটি বড় অংশকে গিয়াস কাদের চৌধুরীর নেতৃত্বে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতেও দেখা যাচ্ছে।
অত:পর কমিটি : স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার রাউজানের গহিরাস্থ গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর বাসভবনে উপজেলা বিএনপির বর্ধিত সভা হয়। এতে রাউজানের প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে স্থানীয় বিএনপি নেতৃবৃন্দ অংশ নেন। ওই সভায় আলহাজ্ব নুরুল হুদা চেয়ারম্যানকে আহ্বায়ক ও ফিরোজ আহমেদকে সদস্য সচিব উপজেলা বিএনপি’র কমিটি ঘোষণা করেন প্রধান অতিথি গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘সাংগঠনিক শক্তির কোনো বিকল্প নেই। শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তুলতে হলে যোগ্য নেতৃত্ব, তৃণমূলের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং নেতাকর্মীদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কর্মসূচি বাস্তবায়ন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ এবং ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় বিএনপিকে তৃণমূল থেকে আরও সুসংগঠিত করতে হবে। সময়ের প্রয়োজনেই উপজেলা বিএনপি ও ১৩টি ইউনিয়নে নতুন আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে।’
‘কার্যক্রম চলমান’ দাবি : রাউজান উপজেলা বিএনপির সভাপতি–সাধারণ সম্পাদক পরিচয়ে অধ্যাপক জসিম উদ্দিন চৌধুরী ও মো. আনোয়ার হোসেন গতকাল এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, ‘রাউজান উপজেলা ও পৌরসভা বিএনপি’র কমিটি গঠিত হয়েছিল চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপি’র তত্ত্বাবধানে ও নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে গঠনতন্ত্র অনুসরণ করে। এই কমিটির কার্যক্রম এখনো চলমান রয়েছে। উপজেলা বিএনপি’র কমিটি গঠনের এখতিয়ার জেলা কমিটি ও কেন্দ্রীয় কমিটির। গঠনতন্ত্র অন্য কাউকে এই ক্ষমতা প্রদান করে নাই। কোনো নেতা, এমপি ও মন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে কমিটি দেয়ার এখতিয়ার নেই’।
এর আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে রাউজানের ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদ প্রত্যাশীদের নির্ধারিত ফরম সংগ্রহ করে জমা দেয়ার আহবান জানা তারা। এ সংক্রান্ত একটি ঘোষণায় তারা বলেন, ১১ অক্টোবর থেকে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত দলীয় ফরম সংগ্রহ ও জমা দেয়া যাবে। আবেদন ফরম ফি দুই হাজার টাকা। এছাড়া আগামী ১৪ অক্টোবর ইউনিয়ন পরিষদ উপলক্ষে আলোচনা সভা গোলাম আকবর খোন্দকারের নগরের বাসায় অনুষ্ঠিত হবে বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘোষণা দেন আনোয়ার হোসেন।
সামগ্রিক বিষয়ে জানতে অধ্যাপক জসিম উদ্দিন চৌধুরী আজাদীকে বলেন, আমাদের কমিটিই আসল। জেলা বিএনপি অনুমোদন দিয়েছে। উপজেলা কমিটি গঠন বা অনুমোদন করার এখতিয়ার জেলা ছাড়া অন্য কারো নেই। উপজেলা বিএনপি গঠনতন্ত্র প্রদত্ত ক্ষমতাবলে ১৪ টা ইউনিয়নে কমিটি গঠন করেছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ফরম প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বলেন, জুম মিটিং করে ঢাকা থেকে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ফি না থাকলে যে কেউ আবেদন করবে, তাই একটা ফি নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শনিবার ঘোষিত উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব ফিরোজ আহমেদ আজাদীকে বলেন, ২০২৫ সালে উপজেলা বিএনপির পকেট কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তৃণমূলের মতামত ছাড়াই গঠন করা ওই কমিটি কেউ মানেনি। এমপি মহোদয় কমিটি ঘোষণার আগে তৃণমূলের মতামত নিয়েছেন। তাছাড়া ২০২৫ সালে যারা সভাপতি–সম্পাদক হওয়ার দাবি করেছেন তারা গত সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে প্রচরণায় অংশ নেননি, তাদের সঙ্গে তৃণমূলেরও কোনো সম্পর্ক নেই। গত প্রায় দুই বছরে রাউজানে তারা কোনো সাংগঠনিক কার্যক্রমও পরিচালনা করেননি। তারা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য কেন্দ্রীয় নির্দেশনা ছাড়ায় ফরম বিক্রি করছে।
এদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী দলীয় নেতাকর্মীদের বলেন, যোগ্যতা, সততা, জনসম্পৃক্ততা ও গ্রহণযোগ্যতাই হবে প্রার্থী বাছাইয়ের প্রধান মাপকাঠি। কোনো ধরনের তদবির, স্বজনপ্রীতি কিংবা ব্যক্তিগত প্রভাবের ভিত্তিতে চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্য প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হবে না। যাঁরা জনগণের আস্থা অর্জন করেছেন, মানুষের পাশে থাকেন এবং জনসেবায় আন্তরিক, তাঁদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। ইউপি সদস্যরা সরাসরি জনগণের প্রতিনিধি। তাই তাঁদের প্রার্থী বাছাইয়ে যথাযথ যাচাই–বাছাই নিশ্চিত করতে হবে। প্রার্থীদের তালিকা হতে হবে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য। কোনো অনৈতিক তদবিরের কাছে নতি স্বীকার করা যাবে না।
