সাতক্ষীরার উপকূলীয় ও সুন্দরবন সংলগ্ন শ্যামনগরের লোনা পানির দূরহ সংকট কাটাতে এবং খাবার পানির প্রাপ্যতা সহজ করতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান আবুল খায়ের গ্রুপ। সংস্থাটির অর্থায়নে শ্যামনগরের খাগড়াঘাট ও কৈখালি গ্রামে স্থাপন করা হয়েছে দুটি অত্যাধুনিক ‘রিভার্স অসমোসিস’ (RO) পানি শোধনাগার।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) আনুষ্ঠানিকভাবে পানি শোধনাগার দুটি উদ্বোধন করেন আবুল খায়ের গ্রুপের করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড লিগ্যাল বিভাগের প্রধান শেখ শাবাব আহমেদ। চালু হওয়া প্ল্যান্ট দুটির একটি খাগড়াঘাটে নূরউদ্দীনের বাড়ির সামনে এবং অপরটি কৈখালিতে আলাউদ্দিন মল্লিকের বাড়ির সামনে স্থাপন করা হয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শেখ শাবাব আহমেদ বলেন, “উপকূলীয় এলাকার সুপেয় পানির সংকট আমাদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। আমরা এমন একটি টেকসই সমাধান চেয়েছিলাম, যা সরাসরি মানুষের জীবন রক্ষায় ভূমিকা রাখবে, রোগবালাই কমাবে এবং শিশুদের স্বাভাবিক শারীরিক বিকাশে সহায়তা করবে।”
উপকূলীয় জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন:
বছরের পর বছর ধরে সিডর ও আইলা-পরবর্তী সময়ে শ্যামনগরের মাটি ও পানিতে ক্ষতিকর মাত্রায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি পায়। এতে পেটের পীড়া, উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনির জটিলতার পাশাপাশি সবচেয়ে বড় ভোগান্তিতে পড়তে হতো ঘরের নারী ও শিশুদের। মিষ্টি পানির খোঁজে মাইলকে মাইল হাঁটতে গিয়ে কোমলমতি মেয়েদের নিয়মিত স্কুলে যাওয়া ব্যাহত হতো। শোধনাগার দুটি চালু হওয়ায় এখন ঘরের পাশেই নিরাপদ খাবার পানি পাচ্ছেন এলাকাবাসী, ফলে স্বস্তি ফিরেছে পরিবারগুলোতে।
প্রযুক্তি ও টিডিএস মানদণ্ড:
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের খুলনা আঞ্চলিক ল্যাবরেটরির পরীক্ষায় দেখা গেছে, প্রক্রিয়াটির পর পানিতে দ্রবীভূত লবণের পরিমাণ (টিডিএস) অভাবনীয় মাত্রায় হ্রাস পেয়েছে। কৈখালির সাধারণ নলকূপের পানিতে টিডিএস ছিল ৮,২১৭ মিলিগ্রাম, যা শোধনের পর নেমে এসেছে মাত্র ২৮ মিলিগ্রামে। অন্যদিকে খাগড়াঘাটে ৪,০৮১ মিলিগ্রামের টিডিএস কমে দাঁড়িয়েছে ৯২ মিলিগ্রামে। তা ছাড়া ক্ষতিকর আয়রনের পরিমাণও শূন্যের কাছাকাছি নেমে এসেছে।
পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুৎ ও অপচয় রোধে প্রযুক্তি:
প্রতিটি প্ল্যান্টে ১০টি করে সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। এতে জাতীয় গ্রিড বা পল্লী বিদ্যুতের নির্ভরতা ছাড়াই নবায়নযোগ্য সৌরবিদ্যুতে সার্বক্ষণিক পাম্প সচল থাকছে। তা ছাড়া পানি অপচয় বন্ধে গ্রাহকদের দেওয়া হয়েছে ‘ডিジタル স্মার্ট কার্ড’। ডিজিটাল কার্ড স্পর্শ করলেই পানি সরবরাহ শুরু হয় এবং সরিয়ে নিলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
তরুণদের কর্মসংস্থান:
প্রকল্পটি শুধু পানি সরবরাহই করছে না, বরং স্থানীয় তরুণদের কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করেছে। স্থানীয় সামাজিক সংগঠন ‘শরুব ইয়ুথ ক্লাব’-এর সদস্যরা শোধনাগারগুলোর দৈনন্দিন পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও বিতরণ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করছেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
