বয়সকালে ট্রেডমিলে হাঁটা কি ভাল? এই প্রশ্ন অনেকেরই। ষাট বছরে মিলিন্দ সোমান যে ব্যায়াম করেন, বা সত্তর ছুঁইছুঁই বয়সে অনিল কপূর যে ভাবে জিমে গিয়ে ওজন তোলেন, তা সকলের পক্ষে করা সম্ভব নয়। নিরাপদও নয়। হার্টের অসুখ আছে যাঁদের অথবা বাতের ব্যথায় কাতর, অথচ শরীর সুস্থ রাখতে হালকা ব্যায়াম করার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকেরা, তাঁরা কী করবেন? এমন ব্যায়াম আছে যাতে সারা শরীরের পেশির স্ট্রেচিং হবে, অথচ পরিশ্রমও হবে না। জাপানি কায়দার ওই শারীরচর্চার নাম তাই চি। বয়স্কদের জন্য নিরাপদ ও কার্যকর ব্যায়াম। পুজোর সময়ে যদি শরীর চাঙ্গা রাখতে হয় এবং বাতের ব্যথাবেদনা দূর করতে হয়, তা হলে কম কায়িক পরিশ্রমে তাই চি করা যেতেই পারে।
মূলত চিনা মার্শাল আর্ট থেকে এসেছে তাই চি বা তাইজ়িকুয়ান ব্যায়াম। চিনের সেনারা আত্মরক্ষা ও শারীরিক প্রশিক্ষণের জন্য তা অভ্যাস করতেন। তাঁদের এই কৌশলই পরে শারীরচর্চার অঙ্গ হয়ে ওঠে। মন ও শরীরের যত্নে এখন তাই চি-কে সবচেয়ে নিরাপদ ব্যায়াম বলে উল্লেখ করেন ফিটনেস প্রশিক্ষকেরা। এই ব্যায়াম যেমন শরীর ও মনের ক্লান্তি কাটাতে সহায়ক, তেমনই নানা রোগের নিরাময়ও হতে পারে। তাই একে মুভিং মেডিটেশন বা চলমান ধ্যানও বলা হয়।
তাই চি ব্যায়ামে শরীরের নানা সমস্যার সমাধান হতে পারে।
তাই চি করার নিয়ম
‘চি গং’ নামক চিনের এক প্রাচীন শক্তি অনুশীলনের সঙ্গে জড়িত তাই চি। বর্তমানে এর পদ্ধতিতে অনেক বদল আনা হয়েছে। শরীরে হালকা মোচড় দিয়ে, হাত-পা সঞ্চালন করে তাই চি করা যায়। যেমন, ধরা যাক, সামনে কোনও দেওয়াল বা ভারী আসবাব থাকলে যে শক্তি দিয়ে তাকে ঠেলবেন, যে ভঙ্গিমা হবে শরীরের, সেই একই শক্তি, একই ভঙ্গি তাই চি অভ্যাসের সময়ে করা হবে। অথচ সামনে কোনও বস্তু থাকবে না। তাই চি-র জন্য জরুরি শান্ত পরিবেশ আর হালকা পোশাক। তাই চি অভ্যাসের সময়ে শ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার দিকেও নজর রাখতে হবে। সঠিক ভাবে শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে নিতে যদি তাই চি অভ্যাস করা যায়, তা হলে সারা শরীরের ব্যায়াম হয়। একই সঙ্গে মেডিটেশন করার মতো ফলও পাওয়া যায়।
তাই চি ওয়াকিং শুধু হাঁটার কোনও পদ্ধতি নয়, এটি রোগ নিরাময়ের উপযোগী এক বিশেষ চিকিৎসাপদ্ধতিও। জটিল কোনও রোগ সারাতে এর প্রয়োগ প্রাচীনকালেও হত। বয়সের কারণে যাঁদের পা কাঁপে, ভারসাম্য বজায় রাখতে সমস্যা হয় এবং পড়ে গিয়ে হাড় ভাঙার ভয় থাকে, তাঁদের জন্য তাই চি ওয়াকিং আদর্শ। স্ট্রোকের পর শরীরের পুনর্গঠন করতে বা অ্যালঝাইমার্স অথবা পারকিনসন্সের মতো রোগে আক্রান্ত রোগীদের স্নায়ু ও পেশির সমন্বয় ফেরাতে চিকিৎসকেরা তাই চি ব্যায়ামের পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
বয়স্কদের জন্য তাই চি ব্যায়াম নিরাপদ ও কার্যকর।
পদ্ধতিও নানা রকম
ইয়াং স্টাইল তাই চি
এটি সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ্ধতি। খুব ধীরে ধীরে হাত ও পা প্রসারিত করে ব্যায়ামটি করা হয়। শরীরের ভারসাম্য রক্ষা এবং পেশির নমনীয়তা বৃদ্ধিতে এই ব্যায়াম কার্যকর।
সান স্টাইল তাই চি
দুই পা জোড়া রেখে ঘরের নিত্য কাজকর্ম করার মতো নানা ভঙ্গি করতে হবে। হাঁটুতে ব্যথা থাকলে, এই ধরনের তাই চি কার্যকর হতে পারে।
তাই চি ব্যায়াম নানা ধরনের হয়।
চেন স্টাইল তাই চি
এটি তাই চির আদি রূপ। মার্শাল আর্টের মতো নানা ভঙ্গি থাকে। এই ব্যায়ামে শরীরের শক্তি প্রয়োগ করতে হয়। এই ধরনের তাই চি প্রশিক্ষকের থেকে শিখে অভ্যাস করাই ভাল।
আরও কিছু সহজ পদ্ধতি আছে, যেমন হাঁটু সামান্য ভেঙে স্কোয়াটের ভঙ্গিতে দাঁড়ান। দুই হাত পাশে তুলুন। এক হাত উপরে আর এক হাত নীচে নিন। হাওয়ায় উড়ে বেড়ানোর ভঙ্গিমায় শরীরকে ধীরে ধীরে ডান-বাম দিকে নাড়ুন।
ডান পা ভাঁজ করে শরীরের ওজন বাঁ পায়ে রাখুন। ডান হাত বুকের সামনে তুলুন। কিছুক্ষণ ভারসাম্য রাখুন, তার পরে পা বদলান। এই ভাবেও করতে পারেন।
তাই চি করলে সারা শরীরের রক্তসঞ্চালন বাড়বে, মস্তিষ্কেরও ব্যায়াম হবে। বয়সকালে মেরুদণ্ডের রোগ বা ভুলে যাওয়ার রোগ থেকে রেহাই পেতে পারেন। সঠিক পদ্ধতিতে অভ্যাস করলে ডিমেনশিয়া বা অ্যালঝাইমার্স হওয়ার ঝুঁকিও থাকবে না।
