নোবেলজয়ীর নাম ঘোষণার কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রকাশ পায় তাঁর মুখের একটি বিশেষ পোর্ট্রেট-কালো কালির দৃঢ় রেখায় আঁকা, সোনালি পাতের ঝলকে উজ্জ্বল। ডিজিটাল ছবির যুগে কেন নোবেল কমিটি এখনও হাতে আঁকা ছবি ব্যবহার করে? লিখছেন লিখছেন অর্ণবকুমার রায়।
গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নোবেল পুরস্কারবিজয়ীদের নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে আর-একটি অনন্য দৃশ্যও বিশ্ববাসীর নজর কেড়ে চলেছে সমানভাবে। পুরস্কারবিজয়ীদের নাম ঘোষণার কয়েক মিনিটের মধ্যেই নোবেল প্রাইজের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামে ভেসে ওঠে একটি বিশেষ ধরনের পোর্ট্রেট। সাধারণ ফোটোগ্রাফ নয়, কালো মোটা দাগে আঁকা মুখ, আর তার উপর সোনালি পাতের ঝলক।
ডিজিটাল ক্যামেরা, আর হাই রেজোলিউশন ছবির যুগে কেন নোবেল কমিটি হাতে আঁকা ছবি ব্যবহার করে? এর নেপথ্যে আছে একটি দারুণ বাস্তব সমস্যা থেকে জন্ম নেওয়া সৃজনশীল সমাধানের গল্প। সে গল্পের শুরু ২০১২ সালে। সুইডিশ শিল্পী নিকোলাস এলমেহেড তখন নোবেল মিডিয়ার আর্ট ডিরেক্টর হিসাবে যোগ দেন। নোবেল প্রাইজের ওয়েবসাইট, সোশ্যাল মিডিয়া, প্রেস রিলিজ– সবকিছুর ভিজুয়াল ভাষা তৈরির দায়িত্ব তাঁর। তিনি দ্রুতই একটি বড় সমস্যার মুখোমুখি হন।
নোবেল প্রাইজের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামে ভেসে ওঠে একটি বিশেষ ধরনের পোর্ট্রেট। সাধারণ ফোটোগ্রাফ নয়, কালো মোটা দাগে আঁকা মুখ, আর তার উপর সোনালি পাতের ঝলক।
নোবেল পুরস্কার ঘোষণার মুহূর্তটি পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুততম সংবাদপ্রবাহের একটি। নাম ঘোষণা হওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ‘রয়টার্স’, ‘বিবিসি’, ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ থেকে শুরু করে বিশ্বের প্রায় সব গণমাধ্যম খবরটি ছড়িয়ে দেয়। তখন তাদের একটি ভাল ছবি দরকার হয়। কিন্তু সমস্যা হল, অনেক বিজয়ীই সাধারণ মানুষের কাছে তেমন পরিচিত নন। বিশেষ করে বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে। তাঁদের কোনও ভালো, হাই রেজোলিউশন, কপিরাইট-মুক্ত ছবি অনেক সময় পাওয়াই যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে থাকা একটি ঘোলা, ছোট ছবিই হয়তো সম্বল। ভালো ছবি না পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা সম্ভব নয়, আবার নিম্নমানের ছবি ব্যবহার করলে নোবেল পুরস্কারের মতো সম্মানজনক ব্র্যান্ডের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়।
এই উভয়সংকট থেকে বের হওয়ার জন্যই এলমেহেড একটি তাৎক্ষণিক বুদ্ধি বের করলেন– তিনি নিজেই দ্রুত হাতে পোর্ট্রেট এঁকে দেবেন। প্রথম দিকে এটি ছিল শুধুই একটি জরুরি সমাধান। তিনি নিজেই জানিয়েছেন যে, ক্যানভাসে এই প্রতিভাবানদের ফুটিয়ে তুলতে তাঁর সাধারণত প্রতিটি ছবির জন্য কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে, কয়েক দিন নয়। যদিও তাঁর কাছে অভ্যন্তরীণ তথ্য থাকে, তবুও কঠোর গোপনীয়তার কারণে তিনি ঠিক কখন এই তথ্য হাতে পান, তা প্রকাশ করতে পারেন না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে থাকা একটি ঘোলা, ছোট ছবিই হয়তো সম্বল। ভালো ছবি না পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা সম্ভব নয়, আবার নিম্নমানের ছবি ব্যবহার করলে নোবেল পুরস্কারের মতো সম্মানজনক ব্র্যান্ডের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়।
কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষ এই ছবিগুলিকেই ভালোবেসে ফেলল। সাংবাদিকরা, সাধারণ মানুষ, শিল্পজগৎ– প্রত্যেকে এই আঁকা ছবির জন্য অপেক্ষা করতে শুরু করল। যা শুরু হয়েছিল প্রয়োজনে, তা-ই হয়ে উঠল ঐতিহ্য। নোবেল পুরস্কারবিজয়ীদের এই পোর্ট্রেটের ডিজাইনের পিছনেও আছে গভীর চিন্তা। ছবিগুলিতে কোনও অপ্রয়োজনীয় রং বা জটিল শেডিং নেই। শুধু গাঢ় কালো রেখায় মুখের আদল ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এর কারণ হল– ভিজিবিলিটি। হালে বেশিরভাগ মানুষ খবর দেখে মোবাইল ফোনে, ছোট থাম্বনেলে। সেখানে একটি সাধারণ ছবি অস্পষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু মোটা কালো রেখার এই ছবি ৫০ পিক্সেল সাইজেও পরিষ্কার বোঝা যায়। সংবাদপত্রের সাদা-কালো প্রিন্টেও এটি সমান উজ্জ্বল থাকে। এটাই এলমেহেডের মূল কৌশল– কম দিয়ে বেশি বলা।
প্রথম দিকের ছবিগুলিতে কিন্তু সোনালি রং ছিল না, শুধু কালো-সাদা ছিল। ২০১২ সালে প্রথম যখন তিনি ছবি আঁকা শুরু করেন, তখন শুধু কালো মার্কার ব্যবহার করতেন। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ছবিগুলোতে নীল ও হলুদ রঙের মিশ্রণ ছিল। ২০১৭ সালে নোবেল ফাউন্ডেশন তাদের পুরো ব্র্যান্ড আইডেনটিটি নতুন করে সাজায়। স্টকহোমের বিখ্যাত ডিজাইন এজেন্সি ‘স্টকহোম ডিজাইন ল্যাব’ নোবেল মেডেলের আসল সোনা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে সোনালি রংকে নোবেলের প্রধান ভিজুয়াল উপাদান হিসাবে প্রতিষ্ঠা করে। মেডেলের সঙ্গে মিল রেখে সবকিছুতে সোনালি ছোঁয়া আনা হয়।
প্রথম দিকের ছবিগুলিতে কিন্তু সোনালি রং ছিল না, শুধু কালো-সাদা ছিল। ২০১২ সালে প্রথম যখন তিনি ছবি আঁকা শুরু করেন, তখন শুধু কালো মার্কার ব্যবহার করতেন। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ছবিগুলোতে নীল ও হলুদ রঙের মিশ্রণ ছিল।
এই পরিবর্তনের পরের বছর, ২০১৮ সাল থেকে এলমেহেড তাঁর আঁকায় নতুন উপাদান যোগ করেন– আসল সোনালি পাত। এখন তিনি যেভাবে ছবিটি তৈরি করেন, তা শুনলে অবাক হবেন। এটি ডিজিটাল ইলাস্ট্রেশন বা এআই দিয়ে তৈরি নয়। প্রথমে তিনি মোটা, টেক্সচারযুক্ত সুতি কাগজ নেন। তার উপর কালো অ্যাক্রিলিক কালি এবং বিশেষ মার্কার দিয়ে দ্রুত কিন্তু আত্মবিশ্বাসী টানে মুখের রেখা ফুটিয়ে তোলেন। ছবিতে কোনও ভুল সংশোধনের সুযোগ প্রায় থাকে না।
এরপর আসে সবচেয়ে জাদুকরী অংশ। তিনি একটি বিশেষ আঠা দিয়ে ছবির নির্দিষ্ট অংশে–যেমন চুলে, ব্যাকগ্রাউন্ডে বা চশমার ফ্রেমে, আসল ধাতব সোনার অতি পাতলা পাত বসিয়ে দেন। এই সোনার পাত আলো পড়লে সত্যিকারের মেডেলের মতোই ঝলমল করে। পরে এই হাতে অঁাকা শিল্পকর্মটিকেই স্ক্যান করে ডিজিটাল মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
অনেকেই ভাবেন, এগুলো ডিজিটাল ইলাস্ট্রেশন বা ‘এআই’ নির্মিত। কিন্তু প্রতিটি ছবিই একটি অরিজিনাল আর্টওয়ার্ক, যার আসল কপিটি নোবেল মিউজিয়ামে সংরক্ষিত থাকে। এভাবেই একটি ব্যবহারিক প্রয়োজন থেকে জন্ম নেওয়া আইডিয়া এখন নোবেল পুরস্কারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গিয়েছে। কালো কালির দৃঢ়তা বিজয়ীর ব্যক্তিত্বের গভীরতাকে বোঝায়, আর সোনালি পাত মনে করিয়ে দেয় সেই চিরন্তন সোনার মেডেলের কথা, যা মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠ অর্জনের প্রতীক। তাই প্রতি বছর যখন সেই পরিচিত পোর্ট্রেটটি প্রকাশিত হয়, তখন আমরা বুঝে যাই– জ্ঞান, সৃষ্টি আর মানবতার জয়ের আর-একটি নতুন অধ্যায় শুরু হল।
