টেস্টোস্টেরন হরমোন থেরাপি নারীদের মেনোপজ-পরবর্তী বিভিন্ন উপসর্গ কমাতে সম্ভাব্য চিকিৎসা হিসেবে আলোচনায় এসেছে। তবে নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, এ থেরাপি গ্রহণের সঙ্গে হৃদরোগের বাড়তি ঝুঁকির সম্পর্ক থাকতে পারে।
নারীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) এখনো কোনো ধরনের টেস্টোস্টেরন থেরাপির অনুমোদন দেয়নি। এরপরও চিকিৎসকেরা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অনুমোদিত ব্যবহারের বাইরে এ চিকিৎসা দিয়ে থাকেন, বিশেষ করে শারীরিক সম্পর্কের আগ্রহ কমে গেলে তা বাড়ানোর জন্য।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ দাবি করছেন, ওজন বৃদ্ধি ও ক্লান্তির মতো সমস্যাও টেস্টোস্টেরন থেরাপির মাধ্যমে কমানো সম্ভব। তবে নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, মেনোপজ-পরবর্তী নারীদের এ থেরাপি গ্রহণের সঙ্গে হৃদরোগের বাড়তি ঝুঁকির সম্পর্ক থাকতে পারে।
২০২৬ সালে মেনোপজ সোসাইটির বার্ষিক সভায় উপস্থাপিত গবেষণাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রেক্সেল ইউনিভার্সিটি কলেজ অব মেডিসিনের গবেষকেরা ৪৫ বছর বা তার বেশি বয়সি ৬ হাজার ৩০০ জনের বেশি নারীর স্বাস্থ্যতথ্য বিশ্লেষণ করেন।
তথ্য নেওয়া হয় ‘ট্রাইনেটএক্স ইউএস কোলাবোরেটিভ নেটওয়ার্ক’ থেকে। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে একদল টেস্টোস্টেরন থেরাপি নিয়েছিলেন, অন্যদল নেননি। আগে থেকেই হৃদরোগে আক্রান্ত নারীদের গবেষণার বাইরে রাখা হয় এবং প্রায় তিন বছর তাদের পর্যবেক্ষণ করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, টেস্টোস্টেরন থেরাপি নেওয়া নারীদের মধ্যে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার হার ছিল ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। অন্যদিকে এ থেরাপি না নেওয়া নারীদের ক্ষেত্রে হার ছিল শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ দুই দলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া গেছে। তবে উভয় দলের ক্ষেত্রেই আক্রান্তের মোট হার তুলনামূলক কম ছিল।
গবেষণার প্রধান লেখক ও ড্রেক্সেল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জুয়েজি জিয়াং বলেন, টেস্টোস্টেরন থেরাপি ও হৃদরোগের ঘটনার মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেলেও এ হরমোন সরাসরি হৃদরোগ সৃষ্টি করে—এমন প্রমাণ গবেষণায় মেলেনি।
কেন বাড়তে পারে ঝুঁকি?
গবেষকেরা সম্ভাব্য কয়েকটি কারণের কথা বলেছেন। টেস্টোস্টেরন কোলেস্টেরলের বিপাক, রক্তচাপ, রক্তনালির কার্যক্রম এবং শরীরের অন্যান্য বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। হরমোনের মাত্রা, ব্যবহারের পদ্ধতি ও ডোজের ওপর এসব প্রভাব নির্ভর করতে পারে।
নারীদের জন্য অনুমোদিত টেস্টোস্টেরন ওষুধ না থাকায় কখনো পুরুষদের জন্য তৈরি ওষুধ কম মাত্রায় ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সেই মাত্রাও কোনো কোনো নারীর শরীরে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হরমোন তৈরি করতে পারে। দীর্ঘদিন এমন মাত্রায় হরমোন গ্রহণের হৃদরোগ-সংক্রান্ত প্রভাব এখনো স্পষ্ট নয়। এ ছাড়া থেরাপি নেওয়া নারীদের অন্য কোনো অশনাক্ত বৈশিষ্ট্যও ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
ইয়েল স্কুল অব মেডিসিনের অধ্যাপক মেরি জেন মিনকিন এবং নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক লরেন স্ট্রাইচার মনে করেন, গবেষণাটি সতর্ক হওয়ার মতো তথ্য দিলেও এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
মায়ো ক্লিনিকের গবেষক ও মেনোপজ সোসাইটির চিকিৎসা পরিচালক স্টেফানি ফোবিয়নও ফলাফলকে আপাতত সম্ভাব্য ঝুঁকির সতর্কসংকেত হিসেবে দেখছেন। তার মতে, ঝুঁকির পার্থক্য উল্লেখযোগ্য হলেও আক্রান্তের সংখ্যা কম হওয়ায় আরও গবেষণা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের ক্ষেত্রে টেস্টোস্টেরন থেরাপির দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা বুঝতে বড় পরিসরে পরিকল্পিত গবেষণা দরকার। শারীরিক সম্পর্কে আগ্রহ কমে যাওয়ার চিকিৎসায় নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে এটি বিবেচনা করা হলেও মস্তিষ্ক ঝাপসা লাগা, ক্লান্তি বা ওজন বৃদ্ধির মতো সমস্যা দূর করতে এর কার্যকারিতার পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই।
তাই এ থেরাপি নেওয়ার আগে শারীরিক সম্পর্কে আগ্রহ কমে যাওয়ার চিকিৎসায় অভিজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা জরুরি। নিজের সিদ্ধান্তে হরমোন ব্যবহার না করে সম্ভাব্য উপকারিতা, ঝুঁকি ও বিকল্প চিকিৎসা সম্পর্কে জেনে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সূত্র: এভরিডে হেল্থ