কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই কোম্পানি ওপেনএআইয়ের নির্বাহী কনফারেন্স রুমে গোপনে অডিও রেকর্ডার বসানোর অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রে এক সৌদি নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই।
গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি ওপেনএআইয়ের একজন প্রকৌশলী ছিলেন বলে মঙ্গলবার বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে মার্কিন বিচার বিভাগ।
রয়টার্স লিখেছে, এ ঘটনা এমন সময়ে ঘটল যখন বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি কোম্পানি ও সরকারগুলোর মধ্যে এআইভিত্তিক প্রযুক্তি এবং মেধা দখলের প্রতিযোগিতা তীব্র রূপ নিয়েছে।
সাম্প্রতিক এই ঘটনা অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুবিধা পেতে সংবেদনশীল এআই গবেষণাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া নিরাপত্তা ঝুঁকিই উন্মোচন করেছে।
বিবৃতিতে মার্কিন বিচার বিভাগ বলেছে, গ্রেপ্তার হওয়া ৩৫ বছর বয়সি ওই প্রকৌশলীর নাম আবদুল রহমান আলফোজান।
তিনি ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ওপেনএআইতে কর্মরত ছিলেন। তার পক্ষে কোনো আইনজীবী নিযুক্ত হয়েছেন কি না তা স্পষ্ট নয়।
তদন্তকারীদের দেওয়া তথ্য অনুসারে, ৩০ সেপ্টেম্বর স্যান ফ্রান্সিসকোতে ওপেনএআইয়ের একটি ভবনের নির্বাহী কনফারেন্স রুমের টিভির পেছনের ইউএসবি পোর্টে একটি রেকর্ডিং ডিভাইস দেখতে পাওয়া যায়।
এফবিআইয়ের অভিযোগে বলা হয়েছে, বুড়ো আঙুলের আকারের ছোট এই ডিভাইসটিতে একটি মাইক্রোফোন ছিল, যা একটি ক্যামেরার সঙ্গেও যোগ করা যেত। পুরো ডিভাইসটি আড়াল করতে পেঁচিয়ে রাখা হয়েছিল টয়লেট পেপার।
আনুমানিক ২৮ সেপ্টেম্বরের দিকে এটা সেখানে বসানো হয়। তবে ডিভাইসটিতে থাকা ডেটা এনক্রিপ্ট করা থাকায় তা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
পরবর্তীতে আলফোজানের ব্যক্তিগত ব্যাগ তল্লাশি করে প্রায় একই ধাঁচের আরেকটি কাস্টমাইজড ডিভাইস উদ্ধার করেন তদন্তকারীরা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ওপেনএআই বলেছে, এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিকে চিহ্নিত করতে ও ডিভাইসটি কোত্থেকে এসেছে তা শনাক্ত করতে তারা নিজস্ব এআই মডেল ব্যবহার করেছে।
We discovered a sophisticated recording device that was hidden inside one of our offices. We used our models to understand the device and where it had come from, identifying that a specific employee had planted it a few days earlier. We referred the matter to the FBI, and we’re…
— OpenAI Newsroom (@OpenAINewsroom) October 13, 2026
কোম্পানিটির দাবি, গ্রেপ্তার হওয়া কর্মী অফিসের আরও কিছু গোপন ও সংবেদনশীল স্থানেও একই ধরনের রেকর্ডার বসিয়ে ভেতরের আলোচনা গোপনে ধারণ করার পরিকল্পনা করছিলেন বলে তাদের কাছে প্রমাণ রয়েছে।
“এই মুহূর্তে আমাদের এমন কোনো ইঙ্গিত মেলেনি যে, এই ব্যক্তি অবৈধভাবে কোনো মডেল ওয়েটস, সোর্স কোড বা গ্রাহকদের তথ্যে প্রবেশ করেছেন বা তা বাইরে পাচার করেছেন। ওই কর্মীকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।”
বিষয়টি পরবর্তীতে এফবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করে ওপেনএআই, যা নিয়ে বর্তমানে আরও তদন্ত চলছে। এ নিয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত সৌদি দূতাবাস।
এক বিবৃতিতে এফবিআই পরিচালক ক্যাশ প্যাটেল বলেছেন, “অভিযোগ অনুসারে, আবদুল রহমান আলফোজান তার নিয়োগকারী কোম্পানির সুপার ইন্টেলিজেন্স প্রযুক্তি সম্পর্কিত সংবেদনশীল কথা গোপনে ধারণ করতেই এক্সিকিউটিভ কনফারেন্স রুমে একটি গোপন রেকর্ডার লুকিয়ে রেখেছিলেন।”
এফবিআইয়ের দায়ের করা অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় এক মাস ধরে আলফোজান ওপেনএআইয়ের মিটিং রুমের ক্যালেন্ডার ও সুযোগ-সুবিধা সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের জন্য এআই প্রডাক্টিভিটি এজেন্ট ব্যবহার করেছিলেন।
তিনি ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করে আসছিলেন। আদালতে দোষী সাব্যস্ত হলে আলফোজানের সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, আড়াই লাখ ডলার জরিমানা ও তিন বছরের তত্ত্বাবধানমূলক মুক্তি (সুপারভাইজড রিলিজ) হতে পারে।
বুড়ো আঙুলের আকারের ছোট এই ডিভাইসটিতে একটি মাইক্রোফোন ছিল, যা একটি ক্যামেরার সঙ্গেও যোগ করা যেত। ছবি: রয়টার্স
তার লিংকডইন প্রোফাইলের তথ্য অনুসারে, আলফোজান যুক্তরাষ্ট্রের ‘ম্যাসেচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি’ বা এমআইটি ও ‘ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে’তে পড়াশোনা করেছেন।
এর আগে, তিনি প্রযুক্তি কোম্পানি মেটা ও মাইক্রোসফটেও কাজ করেছিলেন। তবে তার লিংকডইন প্রোফাইলে দেওয়া এসব তথ্যের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করেনি রয়টার্স।
এদিকে, ইনফরমেশন প্রতিবেদনে লিখেছে, ওপেন সোর্স সফটওয়্যারের নিরাপত্তাত্রুটি শনাক্ত ও সমাধানের কাজ করা স্টার্টআপ ‘ট্রেইল অফ বিটস’ অধিগ্রহণের প্রাথমিক আলোচনা চালাচ্ছে ওপেনএআই।
এ বিষয়ে অবগত ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে ইনফরমেশন লিখেছে, আলোচনা এখনও চলমান রয়েছে ও এটা চূড়ান্ত না-ও হতে পারে।
এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি ওপেনএআই বা ট্রেইল অফ বিটস।
অন্যদিকে, সংবেদনশীল তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোম্পানির নীতি লঙ্ঘনের অভিযোগে শুক্রবার আরও তিন গবেষককে চাকরিচ্যুত করার কথা বলেছে ওপেনএআই।
চাকরিচ্যুত গবেষকরা হলেন জ্যাসমিন ওয়াং, টমেক কোরবাক ও মিকিতা বালেসনি।
তারা যৌথ চিঠিতে দাবি করেছেন, এ ধরনের আকস্মিক পদক্ষেপ কর্মীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে এবং গবেষকরা যে পরিবেশে নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন সেই সংস্কৃতিকে ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে।
