৩৪ মিনিট আগে
সর্বশেষ আপডেট: ৩২ মিনিট আগে
আমিনুল ইসলাম
ছবি: স্টার
প্রায় দুই শতাব্দী ধরে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মণ্ডা। স্বাদে ও ঐতিহ্যে আলাদা এই মিষ্টির টানে দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন মুক্তাগাছায়। সময় বদলেছে, মিষ্টির বাজারে বেড়েছে নানা ধরনের প্রতিযোগিতা, কিন্তু গোপাল পালের হাত ধরে শুরু হওয়া মণ্ডার সুনাম আজও অমলিন।
পূজা-পার্বণ এলেই বাড়ে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার বিখ্যাত মণ্ডার চাহিদা। বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজায় এই মিষ্টির কদর থাকে বেশি। ভক্তরা পূজামণ্ডপে মণ্ডা নিবেদন করেন। অতিথিদের আপ্যায়নেও থাকে এই বিশেষ মিষ্টান্ন।
বিখ্যাত এই মণ্ডার ইতিহাসের শুরু রাম গোপাল পালের হাত ধরে। তিনি গোপাল পাল নামেই বেশি পরিচিত। ১৮২৪ সালে তিনি প্রথম এই মিষ্টি তৈরি করেন বলে তার পরিবারের ইতিহাস বিষয়ক একটি পুস্তিকায় উল্লেখ রয়েছে। সেই থেকে মুক্তাগাছার মণ্ডা ময়মনসিংহ অঞ্চলের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ হয়ে উঠেছে।
দোকানের ভেতরে কাচের শোকেসে রাখা আছে মণ্ডার প্রতিষ্ঠাতা গোপাল পালের একটি বড় কাঠের ভাস্কর্য। এটিও দোকানটির পরিচিত প্রতীকে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় কাঠমিস্ত্রি স্বরূপ সূত্রধর প্রায় ১২৪ বছর আগে ভাস্কর্যটি তৈরি করেন বলে জানা যায়।
বর্তমানে গোপাল পালের পঞ্চম প্রজন্মের উত্তরসূরি ‘রামেন্দ্রনাথ পাল অ্যান্ড ব্রাদার্স’ এই ব্যবসা পরিচালনা করছে।
মুক্তাগাছার মণ্ডা ২০২৪ সালে বাংলাদেশ সরকারের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পায়। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) এটিকে বাংলাদেশের ২৬তম জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
প্রয়াত রমেন্দ্রনাথ পালের লেখা ‘গোপাল পালের প্রসিদ্ধ মণ্ডা আলেখ্য’ পুস্তিকা অনুযায়ী, ১৮২৪ সালে গোপাল পাল প্রথম এই মিষ্টি তৈরি করেন। স্বাদ ও বৈশিষ্ট্যের কারণে অল্প সময়েই এর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।
মণ্ডা তৈরি করে গোপাল পাল তা পরিবেশন করেন মুক্তাগাছার প্রভাবশালী জমিদার মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরীর কাছে। মণ্ডার স্বাদে মুগ্ধ হয়ে জমিদার গোপালকে প্রশংসা ও উৎসাহ দেন। জমিদারবাড়িতে আসা অতিথিদের আপ্যায়নে মণ্ডা পরিবেশনের পরামর্শও দেন তিনি। ব্যবসা বাড়াতে জমিদারবাড়ি থেকে গোপালকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছিল বলে পুস্তিকাটিতে উল্লেখ রয়েছে।
এরপর থেকে মণ্ডার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে আরও দূরে। পুস্তিকাটিতে বলা হয়েছে, বিভিন্ন সময়ে উপমহাদেশের বহু বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এই দোকানে এসেছেন।
তাদের মধ্যে রয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, আইনজীবী কামাল হোসেন, শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান, চিকিৎসক বিধান চন্দ্র রায়, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, সমাজসেবী রণদা প্রসাদ সাহাসহ আরও অনেকে।
চলচ্চিত্র অঙ্গনের বহু পরিচিত মুখও এসেছেন এই দোকানে। তাদের মধ্যে রয়েছেন নায়করাজ রাজ্জাক, কবরী, শাবানা, প্রবীর মিত্র, সোহেল রানা, টেলি সামাদ, বুলবুল আহমেদ ও আনোয়ার হোসেন।
এ ছাড়া, মঞ্চ ও সংস্কৃতি অঙ্গনের ব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ, অমল বোস, আবুল খায়ের, পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সংগীতশিল্পী রথীন্দ্রনাথ রায়ও এই দোকানে এসেছেন বলে পুস্তিকাটিতে উল্লেখ রয়েছে।
পাকিস্তান, ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইংল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের পর্যটকেরাও এই দোকানে এসে মণ্ডার স্বাদ নিয়েছেন। তাদের অনেকে মন্তব্য বইয়ে মণ্ডার প্রশংসা করেছেন।
ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ঢাকা সফরে এলে তাদেরও মুক্তাগাছার মণ্ডা দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়েছিল বলে জানা যায়।
মুক্তাগাছার মণ্ডার সুনাম বিদেশি ভ্রমণ বিষয়ক বইয়েও উঠে এসেছে। অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রকাশিত লোনলি প্ল্যানেটের ১৯৯৬ সালের ‘বাংলাদেশ: এ লোনলি প্ল্যানেট ট্রাভেল সার্ভাইভাল কিট’ বইয়ে লেখক অ্যালেক্স নিউটন, বেটসি ওয়াগেনহাউজার ও জন মারে মুক্তাগাছার মণ্ডার কথা উল্লেখ করেন।
বইটিতে বলা হয়, মুক্তাগাছার রাজবাড়ি মাঝেমধ্যে পর্যটকদের আকর্ষণ করলেও শহরটি সারা দেশে সবচেয়ে বেশি পরিচিত ‘গোপাল পালের প্রসিদ্ধ মণ্ডা’র জন্য। মণ্ডাটিকে দেশের সেরা বলেও উল্লেখ করা হয় বইটিতে।
দোকানের ব্যবস্থাপক দুলাল দাস বলেন, ‘আমরা আমাদের মণ্ডার ঐতিহ্যবাহী সুনাম ধরে রাখতে চাই। তাই দেশের অন্য কোথাও শাখা খোলার কোনো পরিকল্পনা আমাদের নেই।’
তিনি জানান, বর্তমানে প্রতি কেজি মণ্ডার দাম ৭০০ টাকা। এক কেজিতে থাকে ২০টি মণ্ডা। গত কয়েক বছর ধরে নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত খেজুরের গুড় দিয়ে তৈরি বিশেষ মণ্ডাও বিক্রি করা হচ্ছে। এ মণ্ডার দাম প্রতি কেজি ৮০০ টাকা।
দোকানটির অন্যতম মালিক রবীন্দ্রনাথ পাল বলেন, ‘বর্তমানের প্রতিযোগিতামূলক বাজার আমাদের মণ্ডার ব্যবসায় কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। কারণ আমরা এখনো মণ্ডা তৈরির প্রাচীন পদ্ধতি ও ঐতিহ্য মেনে চলি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটি শুধু আমাদের ব্যবসা নয়; এটি আমাদের হৃদয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শত বছরের ঐতিহ্য ও ইতিহাস। আমরা উৎকৃষ্ট মানের ছানা বাছাই করি এবং স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ বজায় রাখি।’
ময়মনসিংহ আঞ্চলিক প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ কমিটির সদস্যসচিব ইমতিয়াজ আহমেদ তানসেন বলেন, ‘মণ্ডা এই অঞ্চলের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের একটি অংশ। এটি আমাদের গর্বের বিষয়। কারণ দেশের বিভিন্ন স্থান ও বিদেশ থেকেও পর্যটকদের এখনো এই মিষ্টান্ন আকৃষ্ট করে।’
সম্প্রতি আশরাফুন নাহারের নেতৃত্বে ময়মনসিংহ সরকারি আনন্দ মোহন কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী ঐতিহ্যবাহী মণ্ডার দোকানে আসেন। নিজেদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে তারা আনন্দিত বলে জানান।
নাহার বলেন, ‘আমরা আনন্দিত, অভিভূত। আমরা আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের শিকড়ে এসেছি। আমরা চাই, এই ঐতিহ্য আরও শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে থাকুক।’
