২০০৪ সালের ২৫ অক্টোবর নয়া দিগন্তের প্রথম সংখ্যায় ‘বাংলার দিগন্ত’ বিভাগে ‘অপরাধ দমনে হিমশিম খাচ্ছে সিএমপি’ শিরোনামে গুরত্বপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়, চট্টগ্রামে জনসংখ্যা অনেক বাড়লেও সেই তুলনায় পুলিশ বাড়েনি, উপরন্তু পুলিশের বহু পদ খালি পড়ে আছে। ফলে অল্পসংখ্যক পুলিশকে অনেক বেশি কাজের চাপ সামলাতে হচ্ছে, যা শহরের অপরাধ দমনকে কঠিন করে তুলছে এবং সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলছে।
আজ নয়া দিগন্তের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রতিবেদনটি পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো—
অপরাধ দমনে হিমশিম খাচ্ছে সিএমপি
চট্টগ্রাম ব্যুরো থেকে শামসুল ইসলাম
গত আঠার বছরে চট্টগ্রাম মহানগরীতে মানুষ বেড়েছে ২২ লাখ আর পুলিশ বেড়েছে মাত্র এক হাজার। চল্লিশ লাখ জনঅধ্যুষিত মহানগরীতে ৯৫০ জনের জন্য বর্তমানে পুলিশ নিয়োজিত আছে মাত্র ১ জন। এই মারাত্মক জনবল সংকটের কারণে নগরীর ক্রমবর্ধমান অপরাধ দমনে হিমশিম খাচ্ছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। জনবল সংকটের কথা স্বীকার করে সিএমপি কমিশনার আমজাদ হোসেন বললেন, ‘সীমিত সম্পদ ও জনবল নিয়েই আমরা নগরবাসীর জানমালের নিরাপত্তা বিধান, অপরাধ দমন ও সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য দিন-রাত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
সিএমপি থেকে প্রাপ্ত এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৮৬ সালে মহানগরীর পরিধি ছিল ১২৮ বর্গমাইল আর জনসংখ্যা ছিল ১৮ লাখ। তখন সিএমপিতে থানার সংখ্যা ছিল ৬টি আর পুলিশের সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ১৭৬ জন। বর্তমানে মহানগরীর পরিধি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫১ বর্গমাইল, থানা হয়েছে ১২টি আর জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪০ লাখের বেশি। আর এ বিপুলসংখ্যক নগরবাসীর জন্য বর্তমানে নিয়োজিত পুলিশের সংখ্যা ৪ হাজার ২০০ জন। অর্থাৎ এখানে পুলিশ-মানুষের অনুপাতিক হার ১:৯৫০। দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী ও দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরীর জন্য পুলিশের এ জনবল কতটা যুগোপযোগী খুব স্বাভাবিকভাবেই এ প্রশ্ন চলে আসে। সিএমপি’র একটি সূত্র জানায়, সেপ্টেম্বর ’০৪-এর রেকর্ড অনুসারে সিএমপি’র কমিশনার থেকে শুরু করে কনস্টেবল পর্যন্ত মোট মঞ্জুরিকৃত জনবলের সংখ্যা ৪ হাজার ৫৬৯ জন হলেও ৯১ জন অফিসারসহ প্রায় সাড়ে ৩০০ পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পড়ে আছে। বর্তমান পুলিশ কমিশনার পালন করছেন ওই পদের চলতি দায়িত্ব। অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনারের পদ শূন্য। পাঁচটি উপ-পুলিশ কমিশনার পদের বিপরীতে আছেন মাত্র দু’জন। এদের মধ্যে উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর) পালন করছেন উপ-পুলিশ কমিশনার (সদর)-এর এবং উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক)-এর অতিরিক্ত দায়িত্ব। উপ-পুলিশ কমিশনার (আরসিডি)-এর অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (নগর বিশেষ শাখা)। সহকারী পুলিশ কমিশনারের পদ খালি আছে ১০টি। সহকারী পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা শাখা) একাই পালন করছেন গোয়েন্দা, জনসংযোগ, সরবরাহ ও সদর-এর দায়িত্ব। এ ছাড়া ইন্সপেক্টরের ১৭টি, সাব-ইন্সপেক্টরের ৪৭টি, সার্জেন্টের ৩টি, এএসআই’র ১৭টি, হেড কনস্টেবল (সশস্ত্র) ৪০টি, নায়েকের ২২টি ও কনস্টেবলের ২১৮টি পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে অনেক পদে শূন্যাবস্থা দীর্ঘদিন ধরে। তা ছাড়া র্যাবসহ বিভিন্ন স্থানে বদলি, অবসর ও বরখাস্তজনিত কারণে শূন্য হয়ে পড়া পদগুলোর বিপরীতে নতুন কোনো লোক পোস্টিং দেয়া হয়নি। সম্প্রতি নগরীর বিভিন্ন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার রদবদলের সময় নগর গোয়েন্দা পুলিশের ৩ জন ইন্সপেক্টরকে ৩টি থানায় বদলি করা হয়। কিন্তু তাদের জায়গায় নতুন কাউকে না দেওয়ায় সেখানকার কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
সূত্র জানায়, বিভিন্ন থানার পুলিশকে স্ব স্ব এলাকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ছাড়াও সংশ্লিষ্ট এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর শান্তি রক্ষা, সুষ্ঠুভাবে বিভিন্ন পরীক্ষা গ্রহণ, ভিআইপিদের প্রটোকল, গানের আসর, বিয়ের অনুষ্ঠান, খেলার মাঠ—সবদিকেই দৌড়াতে হয়। একই সঙ্গে নির্ধারিত ডিউটির পাশাপাশি মামলার তদন্ত রিপোর্ট তৈরি, আদালতে সাক্ষ্যদান, আসামি গ্রেপ্তার ও অপরাধ দমনের কাজ চালিয়ে যেতে হয়। আর এই অতিরিক্ত চাপ ও জনবল স্বল্পতার কারণে এদের মধ্যে দেখা দেয় দায়িত্ব এড়ানোর প্রবণতা। ফলে হয়রানির শিকার হতে হয় সাধারণ মানুষকে।
