দান বা পরস্পর সহযোগিতা মানবসভ্যতার এক অনন্য প্রতীক। মানুষ ছাড়া অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে পরিবার বাদে অন্য প্রাণীকে সহযোগিতা ও সহমর্মিতার দৃশ্য প্রায় শূন্য।
মানুষই একমাত্র প্রাণী, যে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও জাতির গণ্ডি পেরিয়ে মানবতার পাশে এসে দাঁড়ায়।
দান: মহান আল্লাহর গুণ
পৃথিবীবাসীর ওপর আল্লাহর দান অবারিত। তাঁর অশেষ কৃপায় আমরা সর্বদা সিক্ত। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ এ কথা উল্লেখ করেছেন। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৮)
আল্লাহ হলেন ‘মহানদাতা’, যার আরবি হলো ‘আল-ওয়াহ্হাব’। এটি তাঁর ৯৯টি সুন্দর নাম বা ‘আসমাউল হুসনা’-র অন্যতম।
তাই দান করা দুনিয়ার সব শ্রেষ্ঠ মনীষীর বৈশিষ্ট্য ছিল। নবী-রাসুল থেকে শুরু করে সর্বকালের সর্বোত্তম ব্যক্তিদের এটি অন্যতম প্রধান গুণ। তাঁরা প্রভূত কল্যাণ ও জ্ঞানদানসহ সব প্রকার দানে প্রফুল্লচিত্তে ও হাসিমুখে অংশ নিতেন এবং অকাতরে কল্যাণ বিলিয়ে দিতেন।
ইসলাম মানুষকে নানাভাবে দান করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। দানের বহু ফজিলত কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। ইসলাম দানের নানা প্রকরণ নির্ধারণ করেছে এবং মানুষকে মুক্তহস্তে দান করতে নির্দেশ দিয়েছে।
দানের প্রকারভেদ
ইসলামে দান মূলত দুই ভাগে বিভক্ত:
১. ফরজ দান: এটি আবার দুই ধরনের। একটি হলো জাকাত। অর্থাৎ নির্ধারিত সম্পদের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ নির্দিষ্ট খাতে প্রদান করা; যেমন—সোনা, রুপা, নগদ অর্থ, ব্যবসায়ী পণ্য ইত্যাদি।
আরেকটি হলো, সদকাতুল ফিতর। ঈদুল ফিতরের নামাজের আগে প্রতিটি মুসলিমের ওপর নির্ধারিত অপরিহার্য দান।
২. নফল দান: একইভাবে নফল দানও দুই ধরনের। একটি হলো, সাধারণ দান। অর্থাৎ অভাবী, দরিদ্র ও এতিমদের দেখভাল এবং তাদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান বা অন্য কোনো প্রয়োজন পূরণে অর্থ প্রদান।
আরেকটি হলো, সদকায়ে জারিয়া। অব্যাহত সওয়াব লাভের দান। অর্থাৎ এমন কোনো দান, যার প্রতিদান পাওয়ার ধারা পরবর্তী সময়েও অব্যাহত থাকে।
যেমন মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ, স্থায়ী জনকল্যাণমূলক কাজ (যেমন সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা, হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে তোলা), গাছ রোপণ এবং জ্ঞান বিতরণের জন্য কোরআন, কিতাব ও উপকারী বইপত্র দান করা।
এ ছাড়া হাদিয়া, ওসিয়ত, হেবা ও ওয়াক্ফ—এগুলোও দানের বিভিন্ন রূপ, যা মানুষকে দানে উৎসাহিত করে। ইসলামে দানকে এত বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কারণ হলো, এর সঙ্গে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের অসীম কল্যাণ জড়িয়ে রয়েছে।
সর্বোপরি ইসলাম দান-সদকার তাৎপর্য ও প্রয়োজনীয়তা জোরালোভাবে তুলে ধরার পাশাপাশি এর সুনির্দিষ্ট সীমারেখাও নির্ধারণ করে দিয়েছে।
কতটা দান করা যাবে
বিদায় হজের সময় সাহাবি সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) এমন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন যে মনে হচ্ছিল তিনি মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছে গেছেন। তখন তিনি বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আমার শারীরিক অবস্থা তো আপনি দেখছেনই। আমি একজন সম্পদশালী ব্যক্তি। আমি কি আমার সম্পদের দুই-তৃতীয়াংশ সদকা করে দেব?’
নবীজি বললেন, ‘না।’ তিনি বললেন, ‘তাহলে কি অর্ধেক সম্পদ দান করব?’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘না।’ তিনি আবার বললেন, ‘তবে কি এক-তৃতীয়াংশ দান করতে পারি?’ নবীজি বললেন, ‘হ্যাঁ, তবে এক-তৃতীয়াংশও অনেক।
তারপর বললেন, তোমার উত্তরাধিকারীদের পরনির্ভরশীল বা মানুষের দুয়ারে হাত পাততে হয়—এমন অবস্থায় রেখে যাওয়ার চেয়ে তাদের সচ্ছল রেখে যাওয়া অনেক উত্তম।’ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তুমি যা খরচ করো, তার প্রতিদান পাবে; এমনকি তোমার স্ত্রীর মুখে যে গ্রাস তুলে দাও, তার বিনিময়েও সদকার সওয়াব পাবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬২৮)
হাদিসের ভাষা সুস্পষ্ট। নিজের সম্পূর্ণ সম্পদ দান না করে বরং তার অংশবিশেষ দান করা উচিত, যা মোট সম্পদের এক-তৃতীয়াংশের কম হবে এবং এর বেশি হতে পারবে না।
সাধারণত সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশের অসিয়ত করা জায়েজ, এর চেয়ে বেশি করা সর্বসম্মতিক্রমে নিষিদ্ধ। তবে যদি ওয়ারিশরা এর চেয়ে বেশি অসিয়ত করার অনুমতি প্রদান করে এবং তারা সবাই সাবালক ও বিবেকবান হয়, তবে তা জায়েজ হতে পারে।
ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন, লোকজন যদি এক-তৃতীয়াংশের বদলে তা এক-চতুর্থাংশে কমিয়ে আনত, তবে তা বেশি ভালো হতো। কারণ, রাসুল (সা.) বলেছেন যে এক-তৃতীয়াংশ অসিয়ত করা যায়, তবে তা-ও অনেক বেশি।
হানাফি মাজহাব মতে, ওয়ারিশরা ধনী হলে এক-তৃতীয়াংশ ওসিয়ত না করে এর চেয়ে কিছু কম করা উচিত। আর ওয়ারিশরা দরিদ্র হলে ওসিয়ত না করাই শ্রেয়।
ওসিয়তকারীর যদি কোনো ওয়ারিশ বিদ্যমান না থাকে, তবে এক-তৃতীয়াংশের বেশি ওসিয়ত করা জায়েজ; পরিমাণে তা যত বেশিই হোক না কেন। এটি হানাফি মাজহাবের নির্বাচিত মত।
শাফিয়ি ও মালিকি মাজহাব মতে, এক-তৃতীয়াংশের বেশি ওসিয়ত কার্যকর হবে না এবং অতিরিক্ত অংশ ইসলামি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিতে হবে। (মুহাম্মদ তাকি ওসমানি, তাকমিলাতু ফাতহিল মুলহিম, ২/৬৪, মাকতাবাতুদ দারুল উলুম, করাচি, ২০০৬)
আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিজের পরিবার-পরিজনের পেছনে খরচ করলেও সওয়াব লাভ হয়; এমনকি স্ত্রীর মুখে তুলে দেওয়া খাবারের লোকমার বিনিময়েও প্রতিদান রয়েছে।
শেষ কথা
সাহাবি সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাসের ধারণা ছিল শুধু সদকা করলেই সওয়াব পাওয়া যায়, ওয়ারিশদের সম্পদ দিলে কোনো সওয়াব মিলবে না। তাঁর এই ভুল ধারণা নিরসন করার জন্যই রাসুল (সা.) নির্দেশ দিলেন যে সন্তানাদিকে পরনির্ভরশীল করে রেখে যাওয়ার চেয়ে তাদের সচ্ছল রেখে যাওয়া শ্রেয়।
আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিজের পরিবার-পরিজনের পেছনে খরচ করলেও সওয়াব লাভ হয়; এমনকি স্ত্রীর মুখে তুলে দেওয়া খাবারের লোকমার বিনিময়েও প্রতিদান রয়েছে।
স্ত্রীর ভরণপোষণ প্রদান আল্লাহর পক্ষ থেকে ফরজ—এই নিয়ত করে যখন খরচ করা হবে, তখন তা ইবাদতে পরিণত হবে। এই হাদিস থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে মৌলিকভাবে ইবাদত নয়, এমন কাজও সঠিক নিয়তের কারণে ইবাদতে রূপান্তরিত হতে পারে।
আব্দুর রহমান: আলেম ও শিক্ষক, জামিয়া হামিদিয়া দারুল উলুম মাদ্রাসা, গাজীপুর
