খুব ভোরে আকাশ তখনো অদ্ভুত ভাবে নীরব। পাখিরা ডাকেনি। ভালো করে আলোও ফোটেনি। তখনো একটি তারা আকাশে জ্বলে আছে, বহু আলোকবর্ষ দূরে এই পৃথিবী থেকে তাকে দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ বয়ে যাওয়া সামান্য হাওয়ায় ধাক্কা লেগে গাছের পাতা থেকে খসে পড়ল কোনো গাছের তলায়, নাকি পাতার মতোই কয়েক ফোঁটা শিশির?
নাকি কমলা আর সাদা রঙ মেশানো কয়েকটা শিউলি ফুল ঝরিয়ে দিলো গাছটা? কেউ হয়তো ঘুম ভেঙে উঠে ভীষণ আনমনে ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। হয়তো তার মনে হলো, বাইরেটা এখন সুসময় হয়ে আছে। চারপাশে প্রত্যুষের আবছা মশারির মতো আবরণ যে তখনো কাটেনি তা তার আর মনেই থাকল না।
কেমন এক ঘোরমাখা সময়ের রাস্তা তাকে পৌঁছে দিলো স্মৃতিবিদ্ধ সময়ে। সে স্পষ্ট দেখতে পায়, তখনো বাইরেটা ছায়া ছায়া হয়ে আছে। হেমন্তে রাতের আকাশ থেকে নিঃশব্দে নেমে আসা কুয়াশার হালকা চাদর তখনো জড়িয়ে রেখেছে সত্তরের দশকে রাজধানীর কোনো এক পাড়ার গলিগুলো।
শীত আসেনি। কিন্তু সাদাকালো ছায়াছবির মতো চেনা দৃশ্য ফুটে উঠছে চারপাশে। ততক্ষণে পাড়ার মন্দিরের দেয়াল ঘেঁষা পরেশদার ছোট্ট মুদির দোকান ধূপের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেছে। কয়েকদিন পরেই তো শারদীয় দুর্গাপূজা। হিন্দু ধর্মের কত মানুষ আসবে মন্দিরে। কত কী পশরা সাজিয়ে বসবে পরেশদা!
নারকেল মাখা চিড়ার মোয়া, খই, টিনের তৈরি নতুন খেলনা পিস্তল, বাঁশি, চকলেট। দোকানের সামনে চটের বস্তা পেতে দোকান বসবে। কত কিছু বিক্রি হবে। সামান্যই আয়োজন, কিন্তু কী গভীর আনন্দমাখা এক সময়। ভোরের নীরবতায় আচ্ছন্ন হয়ে সে পথ হাঁটে স্মৃতির ভেতরে।
আমরা চিরকালই অবর্ণনীয় দুঃখ আর অনির্বচনীয় আনন্দের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকি। চাই, সেই অনির্বচনীয় আনন্দের দিনগুলো আমাদের অভিযোগ আর অভাবের লম্বা ফর্দকে হারিয়ে ফেলুক মানুষের ভিড়ের মধ্যে। উৎসব আর আনন্দের ভেতর দিয়ে আমরা পৌঁছাতে চাই এমন এক বন্ধনের মধ্যে যার ডাকনাম হৃদয়।
শারদীয় দুর্গাপূজা আসলে একটি ঋতুভিত্তিক উৎসব যার সূচনা ঘটে শরৎকালে। কিন্তু এই উৎসবের আমেজ আর আনন্দ হেমন্তকাল পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকে। এই সময়ে বাংলাদেশের কৃষকের ঘরে ধান ওঠার সময়। আমন ধানের ঘ্রাণ তাদের ভাতের স্বপ্নকে পল্লবিত করে এই সময়েই।
বিশ্বাস করতে চাই, সেই হৃদয়ের অনেক জোর। সে বেঁধে রাখতে জানে ধর্মমত নির্বিশেষে সব মানুষকে। দুর্দিন থেকে মানুষকে সুদিনে পৌঁছে দেওয়ার মন্ত্রটা একমাত্র হৃদয়ের অধিকারেই থাকে। লিখতে বসে মনে হলো, আসলে সুদিন-ই মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় উৎসব।
আমাদের কাছে সেই সুদিনগুলো বর্ণময় হয়ে আসে, উৎসব হয়ে আসে। সুসময়ের জন্য মানুষের মনে অপেক্ষা জমা থাকে, দূরবর্তী কোনো এক সময়ের অংশ হয়ে ওঠার জন্য মনে অজানা আনন্দের অনুভূতি গুনগুন করে।
আসলে প্রকৃতি দূরবর্তী সুদিনের সেই ধারণকে আমাদের মনের মধ্যে একটি পূর্ণ ছবি তৈরি করতে সাহায্য করে। সে ছবির নানা ব্যাখ্যা দিতে পারেন অনেকেই। সুদিন কারও কাছে হয়তো নিরুপদ্রবে ফেনা ওঠা দু’মুঠো ভাত খেতে পাওয়ার ধারণা। আবার কারও কাছে ভাতের থালার পাশে জুড়ে থাকা জীবনের আরেকটু বাড়তি কিছু। ভাতের থালার পাশে এই বাড়তি কিছুর স্বপ্নই চিরকালের বাঙালিকে উৎসবের দরজায় নিয়ে দাঁড় করায়।
শারদীয় দুর্গাপূজা আসলে একটি ঋতুভিত্তিক উৎসব যার সূচনা ঘটে শরৎকালে। কিন্তু এই উৎসবের আমেজ আর আনন্দ হেমন্তকাল পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকে। এই সময়ে বাংলাদেশের কৃষকের ঘরে ধান ওঠার সময়। আমন ধানের ঘ্রাণ তাদের ভাতের স্বপ্নকে পল্লবিত করে এই সময়েই।
প্রকৃতিকে সন্তুষ্ট করতেই প্রাচীন পৃথিবীর মানুষ এই সময়ে একটি ধর্মীয় উৎসবের আয়োজন করত। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দুর্গাপূজা কেবলমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে আর আবদ্ধ থাকেনি। নানা ধর্মের, নানা জাতের কৃষিজীবী মানুষের অংশগ্রহণে তা রূপান্তরিত হয় শারদোৎসবে।
এখানেই ধর্মের ঘেরাওয়ের বাইরে এসে দুর্গাপূজা এক ধরনের গণভিত্তি লাভ করে। কত ধরনের মানুষের আর্থ-সামাজিক সংযোগ গড়ে উঠেছে পূজা পালনের নানা উপাচারের সঙ্গে। এই পূজা একদা তৈরি হওয়া আভিজাত্যের মোড়ক থেকে মুক্ত করে সাধারণ মানুষের কেন্দ্রে স্থাপন করেছিল মানুষ নিজেই।
কারণ ধর্মাচরণ বলি অথবা সাংস্কৃতিক চেতনার মুক্তির কথাই বলি সেখানে গণমানুষের চেতনার মধ্যে একান্ত নিজস্ব স্বাধীনতার বোধ তৈরি হয়েছিল। স্বাধীন চেতনা বা অনুভূতির অধিকারী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা আজকে নানা ঘটনাপ্রবাহের অভিঘাতে টালমাটাল আধুনিক পৃথিবীতে মানুষের জীবনকে, বেঁচে থাকার ইচ্ছাকে মুক্তি দিতে পারেনি।
মানুষ তার মানসিক জায়গা থেকে স্বাধীন হতে চেয়েছে ঠিক-ই কিন্তু ধর্ম এবং রাজনীতি তাদের ইচ্ছাপূরণের পথে সবচেয়ে উঁচু দেয়াল তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই দুই শক্তি মিলে মানুষের ধর্মাচরণ, সামাজিক আচরণের সংজ্ঞাকে নির্ধারণ করে দিচ্ছে। ফলে সেই গণভিত্তি ভেঙে গিয়ে হিংসা আর সংঘাত প্রবল হয়ে উঠছে।
আরও পড়ুন
সামাজিক ও পারিবারিক গণ্ডিগুলো মানবিক ভাবনার জায়গাটা হারিয়ে ফেলছে নিজেদের অজান্তেই। কিন্তু আমাদের তো ফিরে তাকাতে হবে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বহু আগে অনুমান করতে পেরেছিলেন, এই বিভেদ আর আমাদের শান্তিহীন জীবনের প্রবাহ আমাদের কোথায় নিয়ে দাঁড় করাবে।
‘উৎসব’ প্রবন্ধে তার চিন্তা অথবা দুশ্চিন্তাকে আমরা অনুধাবন করতে পারি। তিনি লিখছেন, ‘উৎসবের দিনে একলার গৃহ সকলের হয়, একলার ধন সকলের জন্য ব্যয়িত হয়। সেদিন ধনী দরিদ্রকে সম্মান করে, সেদিন পণ্ডিত মূর্খকে আসন দান করে। কারণ আত্মপর ধনী দরিদ্র পণ্ডিতমূর্খ এই জগতে একই প্রেমের দ্বারা বিধৃত হইয়া আছে। ইহাই পরম সত্য—এই সত্যের প্রকৃত উপলব্ধি পরমানন্দ। উৎসবের দিনের অবধারিত মিলন এই উপলব্ধিরই অবসর। যে ব্যক্তি এই অবসর হইতে একেবারেই বঞ্চিত হইল, সে ব্যক্তি উন্মুক্ত উৎসব সম্পদের মাঝখানে আসিয়াও দীনভাবে রিক্তহস্তে ফিরিয়া চলিয়া গেল।’
আমরাও রিক্তহস্তে ফিরে চলেছি। শরৎ আর হেমন্তের ভোরের সেই ছায়াময় অনুভূতি, পরেশদার দোকানে ধূপের মায়াময় সুঘ্রাণ, মন্দিরে বেজে ওঠা কাঁসর ঘণ্টা, ঢাকের আওয়াজ, কাশফুলে দুলে ওঠা সময়ের স্মৃতি, শিউলি ফুল, উৎসবের অন্য আলোয় রাঙানো দিনগুলো এক অদ্ভুত দানবের রক্তবর্ণ চোখের সামনে এখন অসহায়।
পৃথিবী জুড়ে ব্যাপ্ত হচ্ছে সন্ত্রাসের বলয়, উগ্রপন্থার আগুন। সেই আগুনে সময়ের মাঝখানে পুড়ে যাচ্ছে মানুষের ভবিষ্যৎ। সেখানে কোথায় আশার আলো? যে অন্ধকার সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে আজকের পৃথিবীর মানুষের জীবন সেখানে সুড়ঙ্গের শেষ মাথায় সত্যিই কি কোনো আলোর রেখা জেগে নেই?
হাল ছাড়তে নেই বলেই তো বিশ্বাসটা টিকে আছে। আশা রয়ে গেছে অন্ধকারে কোথাও আলোর রেখা দেখার। বাঙালির জীবনাচরণের প্রাচীন ধারা অনুসন্ধান করলে চোখে পড়ে, আদ্যন্ত পুরুষ শাসিত সমাজে সব অশুভ ও অসুর শক্তিকে পরাজিত করে শুভ শক্তির জয়ের ভাবনাকে কাজে লাগিয়েছিল মানুষ।
উত্থান ঘটিয়েছিল মাতৃশক্তির। সেই ভাবনাটি সমাজে সব ধরনের বৈষম্য ও হিংসা-বিদ্বেষের বিরুদ্ধে বিপরীত চিন্তা হিসেবে অবস্থান নিয়েছিল। শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্যে দিয়ে সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের মধ্যে তিক্ততা ভুলে একটি সামাজিক সম্প্রতির প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল সাধারণ মানুষের মনে।
দুর্গাপূজা কেবলমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে আর আবদ্ধ থাকেনি। নানা ধর্মের, নানা জাতের কৃষিজীবী মানুষের অংশগ্রহণে তা রূপান্তরিত হয় শারদোৎসবে।
গণভিত্তির জোরেই নিজেকে একটি বৃহদায়তন সামাজিক পরিবারের অংশ হিসেবে দেখার চেষ্টা করেছিল মানুষই। এই শুভ শক্তির উদ্বোধন মানুষ দেখতে চায়। শক্তি প্রয়োগ, সংঘাত আর বিধিনিষেধের বাইরে দাঁড়িয়ে প্রাধান্য দিতে চায় হৃদয়কে।
শঙ্খ ঘোষ কবিতায় লিখেছেন,
‘আমার দুঃখের দিন তথাগত
আমার সুখের দিন ভাসমান।
এমন বৃষ্টির দিন পথে-পথে
আমার মৃত্যুর দিন মনে পড়ে।
আবার সুখের মাঠ জলভরা
আবার দুঃখের ধান ভরে যায়।
এমন বৃষ্টির দিন মনে পড়ে
আমার জন্মের কোনো শেষ নেই।’
তাই তো! ‘আমার জন্মের কোনো শেষ নেই’ এই ছোট্ট একটি লাইন-ই তো জাগিয়ে রাখে আশার আলো। ভাবনাটা শক্তিশালী হয়ে উঠে চৈতন্যকে আঘাত করে। জানিয়ে দেয়, তার জন্মের গ্রহ পৃথিবীর সঙ্গে, ঘাসের সঙ্গে, মাটির সঙ্গে আর সব মানুষের সঙ্গে তার কতদিনের যোগাযোগ।
সবাই মিলেমিশে থাকার ভেতরে কত গল্প, কত ভালোবাসার জন্ম, কত বিচ্ছেদের ব্যথা। আমরা শুধু শূন্য হাতে ফিরে যাই না। সর্বজনীন উৎসব আমাদের আজও জানান দেয়, এমন আনন্দের সময়ে আমরা নিজেদের ঘরকে সবার ঘর করে তুলতে সক্ষম। উৎসবের সময়ে অবধারিত মিলনই ইতিবাচক জীবনের ধারণা।
আর সেই যে মানুষটি প্রত্যুষে ঘর ছাড়া হয় সুদিনের টানে, খোঁজে শিউলি ফুল, রাধামঞ্জুরী, তার একলা স্মৃতিবিদ্ধ প্রাণ ধরে রাখে অসংখ্য সুখের মাঠের জলভরা ছবি। হয়তো সে-ও ভাবে তারও জন্মের কোনো শেষ নেই।
ইরাজ আহমেদ : কবি
