১২ আগস্ট ২০২৬।
ব্যক্তিগত কিছু কাজে
অনেক দিন পর প্রিয় জগন্নাথপুরে ফিরেছিলাম।
জন্মমাটিতে পা রাখার
পর থেকেই মনে হচ্ছিল,
অনেক দিন দেখা নেই
এমন মানুষগুলোর সঙ্গে
একবার দেখা করা
দরকার।
ফোনটা হাতে নিয়ে আর দেরি করলাম
না। সরাসরি অমিতকে ফোন দিলাম।
বললাম, দোস্ত, আমি আজ জগন্নাথপুরে!
ওপাশ থেকে অমিতের কণ্ঠে একসঙ্গে বিস্ময়
আর আনন্দ। সত্যি? আজ থাকবি তো?
আমি বললাম, হ্যাঁ, অবশ্যই! চল, আজ
সবাই মিলে দেখা করি। ব্যস, শুরু হয়ে
গেল আয়োজন। সেদিনের আড্ডায় পুরোনো
দিনের কত গল্প যে ফিরে এল, তার হিসাব
নেই। আড্ডার একপর্যায়ে হঠাৎ আমার
মাথায় একটা চিন্তা এল। বললাম, দোস্ত,
চল না সবাই মিলে কোথাও ঘুরে আসি!
কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গেই সবাই রাজি।
গন্তব্য নির্বাচন নিয়ে শুরু হলো
আলোচনা। শেষ পর্যন্ত সব আলোচনা পেরিয়ে যে জায়গাটিকে বেছে নেওয়া হলো,
সেটি সিলেটের প্রকৃতির অন্যতম সুন্দর
ঠিকানা ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর।
২১ আগস্টে সেই কাঙ্ক্ষিত সকাল
অবশেষে এল। ভোর থেকেই সবার মধ্যে
প্রস্তুতির ব্যস্ততা। ফোনে একে অন্যের সঙ্গে
যোগাযোগ চলছে। কে কোথায়, কে কখন
আসবে, কে এখনো ঘুমাচ্ছে, সবকিছুর
খবর নেওয়া হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত যাত্রা শুরু
করলাম।
গাড়ি যত সামনে এগোচ্ছিল, আমাদের
আড্ডাও তত জমে উঠছিল। পুরোনো দিনের
স্মৃতি, হাসি-ঠাট্টা, একে অপরকে নিয়ে
মজা করা, গান-বাজনা, সব মিলিয়ে গাড়ির
ভেতরের পরিবেশ ছিল একেবারে উৎসবের
মতো। সিলেট শহর পেরিয়ে ভোলাগঞ্জের
পথে এগোতেই জানালার বাইরের দৃশ্য
ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগল। প্রকৃতি
আরও কাছে চলে এল। পথের দুপাশের
সবুজ, দূরের পাহাড় আর মেঘের আনাগোনা
আমাদের ভ্রমণের আনন্দ আরও বাড়িয়ে
দিল।
একসময় পৌঁছে গেলাম ভোলাগঞ্জ
নৌকাঘাটে। ঘাট থেকে সাদা পাথর যাওয়ার
জন্য একটি নৌকা ভাড়া করে সবাই উঠে
পড়লাম। ইঞ্জিনের শব্দ, নদীর বাতাস আর
ধলই নদীর ঠাণ্ডা পানি কেটে নৌকা এগিয়ে
চলেছে। চারপাশে পাহাড়। মেঘ। নদী।
পাথর। প্রকৃতি যেন নিজের হাতে একটা
বিশাল ছবি এঁকে রেখেছে। নৌকা যখন
সাদা পাথরের মূল পয়েন্টে পৌঁছাল, তখন
চোখের সামনে যে দৃশ্য, তা সত্যিই মুগ্ধ
করার মতো।
সাদা পাথরের জলকেলি, ঘোরাঘুরিতে
শরীর তখন বেশ ক্লান্ত। কিন্তু বন্ধুদের ভ্রমণে
ক্লান্তি মানে বিশ্রাম নেওয়া নয়। বরং গাড়িতে
বসেই পরবর্তী গন্তব্য নিয়ে আলোচনা শুরু
হয়ে গেল। কে কোথায় যেতে চায়, কোথায়
গেলে ভালো হবে, কত সময় লাগবে, সব
নয়ে আলোচনা। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হলো,
আবঙ্গী (র.) মাজারে যাব। মাজার প্রাঙ্গণে
পৌঁছেই চোখে পড়ল টিলার ওপর উঠে
যাওয়া বিশাল সিঁড়ি। সারা দিন ঘোরাঘুরি
করে শরীর এমনিতেই ক্লান্ত। তার ওপর
সিঁড়ি!
কিন্তু বন্ধুদের সঙ্গে থাকলে ক্লান্তি যেন
একটু কমই মনে হয়। গুনে গুনে আমরা
উঠতে শুরু করলাম। ৩০৪টি সিঁড়ি। একটা,
দুটো, দশটা...। এভাবে ধীরে ধীরে ওপরে
উঠতে থাকলাম। শেষ পর্যন্ত টিলার চূড়ায়
পৌঁছালাম। ওপরে গিয়ে ঠাণ্ডা বাতাস মুখে
লাগতেই মনে হলো, এতক্ষণের সব ক্লান্তি
সার্থক।
সেই একদিনের ভ্রমণই হয়তো
আমাদের জীবনের অনেক বছরের স্মৃতির
পুঁজি হয়ে থাকবে। ২১ আগস্ট ২০২৬ তাই
আমাদের কাছে শুধু ভোলাগঞ্জ ভ্রমণ নয়।
এটি ছিল বন্ধুত্ব, স্মৃতি আর ফিরে পাওয়ার
এক সুন্দর দিন।
