মানুষের পরিচয় কি কেবল তার পেশায়, প্রতিষ্ঠায় কিংবা সামাজিক অবস্থানে? না কি সেই পরিচয়ের আড়ালে থেকে যায় আরও একটি মানুষ, যিনি নিভৃতে শব্দের সঙ্গে কথা বলেন, সময়ের সঙ্গে বোঝাপড়া করেন, আর জীবনের আপাতসাধারণ অভিজ্ঞতা থেকে খুঁজে নেন অসাধারণ সব অনুভব? সাহিত্য ও জীবনের এই পারস্পরিক সম্পর্ক যাদের নিরন্তর ভাবায়, তারা অনেক সময়ই একটি পরিচয়ের গণ্ডিতে নিজেদের আটকে রাখতে পারেন না। তাদের জীবন হয়ে ওঠে বহুমুখী অন্বেষণের ক্ষেত্র।
বাংলাদেশের কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট, সাংবাদিক ও জনসংযোগ পেশাজীবী প্রদীপ্ত মোবারক তেমনই এক মানুষ। তার পরিচয়ের পরিসর বিস্তৃত। এক দিকে কবিতার ব্যক্তিগত ভুবন, অন্য দিকে সমাজ, সংস্কৃতি ও সমকাল নিয়ে বিশ্লেষণী গদ্য। তারই পাশাপাশি সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগের মতো দায়িত্বপূর্ণ পেশা। আপাতদৃষ্টিতে পৃথক এই ক্ষেত্রগুলিকে একটি অদৃশ্য সূত্রে বেঁধে রেখেছে ভাষার প্রতি তাঁর অনুরাগ এবং মানুষকে জানার আগ্রহ।
নদীর দেশ থেকে শব্দের জগতে
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে মেঘনা-বিধৌত দ্বীপজেলা ভোলা। সেই জেলার সদর উপজেলার আলীনগর ইউনিয়নের মৌটুপী গ্রামে জন্ম প্রদীপ্ত মোবারকের। নদী, জল, প্রকৃতি আর গ্রামীণ জনজীবনের সহজাত ছন্দে বেড়ে ওঠা তার শৈশব। একজন কবির বেড়ে ওঠার পরিসর তাঁর সৃষ্টিশীলতার উপর কতখানি প্রভাব ফেলে, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবু অস্বীকার করার উপায় নেই, শৈশবের প্রকৃতি ও পরিবেশ মানুষের অনুভূতিজগতে গভীর ছাপ রেখে যায়। নদীর বিস্তার, বর্ষার বিষণ্ণতা, নিসর্গের পরিবর্তনশীল রূপ কিংবা প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রাম, এই সবই কোনও না কোনও ভাবে কবির অন্তর্জগতের উপাদান হয়ে উঠতে পারে। প্রদীপ্তর কবিতায় প্রকৃতি, স্মৃতি, নিঃসঙ্গতা ও বিষণ্ণতার যে অনুষঙ্গ ফিরে ফিরে আসে, তার সঙ্গে শৈশবের এই ভূগোলের একটি আত্মিক সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া অসম্ভব নয়।
তার পারিবারিক পরিমণ্ডলেও ছিল শিক্ষা, মানবিকতা ও দেশপ্রেমের উত্তরাধিকার। মাতামহ বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. মো. আবুল কাশেম ছিলেন শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক। মা আমেনা পারভিনের স্নেহচ্ছায়া এবং পরিবারের মূল্যবোধসমৃদ্ধ পরিবেশ তাঁর বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। এই পারিবারিক পরিমণ্ডল থেকে পাওয়া দেশপ্রেম, মানবিকতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার বোধ পরবর্তী সময়ে তাঁর সাহিত্যভাবনার সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে সাহিত্যের আত্মীয়তা
আলীনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তার শিক্ষাজীবনের সূচনা। তার পরে আলীনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ঢাকা কলেজ। উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে। সেখান থেকেই স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বাংলা সাহিত্য নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা তার সাহিত্যচর্চাকে দিয়েছে একটি সুসংহত ভিত্তি। তবে পাঠ্যক্রমের সীমায় আবদ্ধ থাকেনি তার অনুসন্ধান। কবিতার ভাষা, ছন্দ ও গঠনশৈলী সম্পর্কে আগ্রহ তাকে নিয়ে যায় কলকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত। সেখানে বাংলা কবিতার ছন্দ নিয়ে গবেষণাকর্মে যুক্ত হন তিনি। কবিতার ছন্দ কেবলমাত্র ধ্বনির বিন্যাস নয়। তার মধ্যে থাকে ভাষার নিজস্ব গতি, উচ্চারণের সংগীত এবং ভাবের অন্তর্নিহিত অনুরণন। বাংলা কবিতার দীর্ঘ বিবর্তনের সঙ্গে এই ছন্দচেতনার সম্পর্ক নিবিড়। সেই জটিল বিষয়কে গবেষণার ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেওয়ার মধ্য দিয়ে প্রদীপ্তর সাহিত্যিক অনুসন্ধিৎসার পরিচয় পাওয়া যায়। এখানে তার একটি বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করার মতো। তিনি কেবল কবিতা রচনায় আগ্রহী নন, কবিতার নির্মাণপ্রক্রিয়াটিকেও বুঝতে চান। অনুভূতির পাশাপাশি শিল্পের প্রকরণ সম্পর্কে এই সচেতনতা তার সাহিত্যচর্চার একটি উল্লেখযোগ্য দিক।
কবিতায় বিষণ্ণতা, স্মৃতি ও আত্মঅন্বেষণ
প্রদীপ্ত মোবারকের কবিতার প্রধান অনুষঙ্গগুলির মধ্যে রয়েছে প্রেম, বিরহ, স্মৃতি, নিঃসঙ্গতা, অস্তিত্বের প্রশ্ন এবং মানুষের অন্তর্গত টানাপড়েন। তার ‘বিষণ্ন সুন্দর’, ‘শূন্যতার সৌন্দর্য’, ‘পরিযায়ী’, ‘ভেজা শীতসন্ধ্যা’, ‘পোড়া কাগজ’, ‘আদিম অভ্যাস’, ‘আঘাত’, ‘আবরণ’, ‘আমি অশ্লীল’ ও ‘মৃত্যু’ শীর্ষক কবিতাগুলির দিকে তাকালে এই বিষয়বৈচিত্র্যের আভাস মেলে। কবিতার নামকরণেও লক্ষ করা যায় এক ধরনের মানসিক আবহ। ‘শূন্যতার সৌন্দর্য’ কিংবা ‘বিষণ্ন সুন্দর’-এর মতো নামের মধ্যেই রয়েছে বিপরীত অনুভূতিকে পাশাপাশি বসিয়ে দেখার প্রবণতা। বিষণ্ণতার ভিতরেও সৌন্দর্যের সন্ধান, শূন্যতার মধ্যেও উপস্থিতির অনুভব, এই দ্বন্দ্বগুলি তার কাব্যভাবনার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ‘আবরণ’ কবিতায় স্মৃতি, বৃষ্টি ও ধূসর দুপুরের চিত্রকল্পের মধ্য দিয়ে মানুষের অন্তর্লোকের এক বিষণ্ণ পরিসর নির্মাণের চেষ্টা রয়েছে। অন্য দিকে, ‘আঘাত’ কবিতায় বিচ্ছেদ ও অনুপস্থিতির বেদনা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সীমানা ছাড়িয়ে বৃহত্তর মানবিক অনুভূতির দিকে এগোয়।
তার কবিতায় প্রকৃতি নিছক দৃশ্যপট নয়। বরং প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদান হয়ে ওঠে মনের অবস্থার প্রতিরূপ। বৃষ্টি, শীতসন্ধ্যা, ধূসরতা কিংবা পোড়া কাগজের মতো চিত্রকল্পে মিশে যায় স্মৃতি ও মনস্তত্ত্ব। আধুনিক বাংলা কবিতায় নিঃসঙ্গতা ও অস্তিত্বের অনিশ্চয়তা নতুন বিষয় নয়। জীবনানন্দ-পরবর্তী বাংলা কবিতার নানা ধারায় এই অনুভবের বিচিত্র প্রকাশ ঘটেছে। প্রদীপ্তর কাব্যচর্চাকেও সেই বৃহত্তর আধুনিক সংবেদনশীলতার প্রেক্ষাপটে বিচার করা যেতে পারে। যদিও তার কবিস্বরের স্বাতন্ত্র্য নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজন আরও নিবিড় পাঠ ও সামগ্রিক মূল্যায়ন। বাংলাদেশের প্রথমআলো, ইত্তেফাক, দৈনিক আমাদের সময়, সমকাল, কালের কণ্ঠ, যুগান্তর, আজকের পত্রিকা, বাংলাদেশ প্রতিদিন, দেশ রূপান্তর, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমক, বাংলানিউজ, ঢাকাপোস্ট, বাংলা ট্রিবিউন-সহ বিভিন্ন সংবাদপত্রের সাহিত্যপাতায় তাঁর কবিতা, প্রবন্ধ ও সমসাময়িক কলাম প্রকাশিত হয়েছে। এই প্রকাশনা-পরিসর তার সাহিত্যচর্চাকে ব্যক্তিগত পরিসর থেকে বৃহত্তর পাঠকসমাজের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।
কবিতার বাইরে সমাজপাঠ
শুধু কবিতা নয়, প্রবন্ধ ও কলাম রচনাতেও প্রদীপ্ত মোবারক সমান আগ্রহী। বরং তার সাহিত্যিক পরিচয়ের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল অনুভূতিনির্ভর কবিতা এবং যুক্তিনির্ভর প্রবন্ধের সমান্তরাল চর্চা।
‘অস্তিত্ব সংকটে মাতৃভাষা বাংলা’, ‘বৈচিত্র্যময় নজরুল’, ‘ভাষা আন্দোলন ও বাংলা সাহিত্য’, ‘শৈল্পিক সৌন্দর্য ও মানবতাবাদে লালন ফকির’ এবং ‘বাংলা সাহিত্যে নারী কলম ও কাগজের মতোই অনিবার্য’ এই প্রবন্ধগুলির বিষয় নির্বাচনেই তাঁর আগ্রহের ব্যাপ্তি স্পষ্ট। ভাষা, ইতিহাস, সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, মানবতাবাদ এবং সাহিত্যে নারীর ভূমিকা, এমন নানা প্রসঙ্গ তার প্রবন্ধচর্চায় জায়গা পেয়েছে। বিশেষত বাংলা ভাষার অস্তিত্ব ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের প্রশ্ন তার কাছে গুরুত্ব পেয়েছে। ভাষা যে কেবল ভাবপ্রকাশের মাধ্যম নয়, একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির ধারক, এই উপলব্ধিই তার ভাষাবিষয়ক চিন্তার কেন্দ্রে রয়েছে। নজরুল কিংবা লালনকে নিয়ে তার লেখালেখির মধ্যেও লক্ষ্য করা যায় বাঙালির বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের প্রতি আগ্রহ। ধর্ম, সমাজ, মানবিকতা ও শিল্পের পারস্পরিক সম্পর্ককে বোঝার প্রয়াস রয়েছে এই বিষয় নির্বাচনে। বাংলা সাহিত্যে নারীর অবদান নিয়ে তার প্রবন্ধও একই ভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি সামাজিক ও সাহিত্যিক আলোচনার সূত্রপাত করে। সাহিত্য-ইতিহাসের যে পরিসর দীর্ঘদিন পুরুষকেন্দ্রিক মূল্যায়নের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে, সেখানে নারীর সৃজনশীল উপস্থিতিকে গুরুত্ব দেওয়া সমকালীন সাহিত্যসমালোচনার একটি প্রয়োজনীয় দিক। প্রদীপ্তর প্রবন্ধচর্চাকে এই বৃহত্তর চিন্তাপ্রবাহের সঙ্গেও মিলিয়ে দেখা যায়।
সমকাল যখন কলমের বিষয়
একজন লেখকের সমাজসচেতনতা অনেক সময় তার বিষয় নির্বাচনের মধ্য দিয়েই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রদীপ্ত মোবারকের সাম্প্রতিক কলামগুলির ক্ষেত্রেও বিষয়টি প্রযোজ্য। প্রথম আলোয় প্রকাশিত ‘আর নয় অনলাইন–নির্ভরতা, শ্রেণিকক্ষই শিক্ষার সত্যিকারের ভিত্তি’ প্রবন্ধে তিনি শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক ও মানবিক পরিবেশের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার সুবিধার পাশাপাশি প্রত্যক্ষ শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তা যে অস্বীকার করা যায় না, সেই প্রশ্নকে সামনে এনেছেন তিনি। আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত ‘সরলতার মহিমা ও সমাজের ভ্রান্ত ব্যাখ্যা’ কলামে উঠে এসেছে মানুষের সরলতা, আত্মমর্যাদা এবং সামাজিক মূল্যায়নের জটিল সম্পর্ক।
অন্যদিকে ‘মবতন্ত্রের চাপ ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার পরীক্ষা’ নিবন্ধে তিনি আলোচনা করেছেন সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার এবং সামাজিক অসহিষ্ণুতার মতো প্রসঙ্গ। এই বিষয়গুলো বিচ্ছিন্ন হলেও তাদের ভিতরে একটি সাধারণ সূত্র রয়েছে, মানুষের স্বাধীন চিন্তা, সামাজিক মর্যাদা এবং সাংস্কৃতিক অধিকার। প্রদীপ্তর লেখায় সমাজকে দেখার একটি নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। তিনি ঘটনার উপরিতলে সীমাবদ্ধ না থেকে তার সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্য খোঁজার চেষ্টা করেন। কবিতায় যে মানুষটি ব্যক্তির অন্তর্জগৎ নিয়ে ভাবেন, প্রবন্ধে তিনিই বৃহত্তর সমাজের দ্বন্দ্ব ও সংকটকে বোঝার চেষ্টা করেন।ট। সাহিত্যের সঙ্গে সামাজিক দায়বদ্ধতার এই যোগসূত্র তার লেখকসত্ত্বার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
সংবাদকক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ
সাহিত্যের পাশাপাশি প্রদীপ্ত মোবারকের পেশাগত জীবনও ঘটনাবহুল।২০১০ সালের মার্চ মাসে দৈনিক সমকালে রিপোর্টার হিসেবে তার সাংবাদিকতা জীবনের সূচনা। সংবাদপত্রের বার্তাকক্ষে কাজ করার অভিজ্ঞতা যে কোনও লেখকের কাছেই এক বিশেষ শিক্ষার ক্ষেত্র।সেখানে প্রতিদিন মুখোমুখি হতে হয় সমাজের বহুবিধ বাস্তবতার। মানুষের ব্যক্তিগত সংকট, রাষ্ট্র ও সমাজের ঘটনাপ্রবাহ, রাজনৈতিক পরিবর্তন কিংবা সাধারণ মানুষের সুখদুঃখ, সব কিছুই সংবাদকর্মীর পর্যবেক্ষণের অংশ হয়ে ওঠে। প্রদীপ্তর ক্ষেত্রেও সাংবাদিকতার এই অভিজ্ঞতা তার চিন্তাজগৎকে প্রসারিত করেছে। তথ্যনিষ্ঠার সঙ্গে অনুভূতিশীলতার মেলবন্ধন ঘটানোর সুযোগ পেয়েছেন তিনি। তার সাহিত্যিক বিকাশে কবি ও সাংবাদিক নাসির আহমেদের সান্নিধ্যও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সাহিত্য ও সাংবাদিকতার জগতে অভিজ্ঞ একজন মানুষের সাহচর্য নবীন লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।
পরবর্তী সময়ে প্রদীপ্ত পেশাগত বে যুক্ত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কার্যক্রমের সঙ্গে। উত্তরা ইউনিভার্সিটির জনসংযোগ বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের পরে ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে তিনি স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের জনসংযোগ বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগ দেন। জনসংযোগের কাজ আপাতদৃষ্টিতে প্রশাসনিক হলেও তার ভিতরে রয়েছে ভাষা, যোগাযোগ ও মানবসম্পর্কের একটি জটিল পরিসর। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি, গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পর্ক, তথ্যের যথাযথ উপস্থাপন এবং বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ, সব ক্ষেত্রেই প্রয়োজন সংবেদনশীলতা ও বিচক্ষণতা। এই পেশায় ভাষার সঠিক ব্যবহার যেমন জরুরি, তেমনই প্রয়োজন মানুষের মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে ধারণা। ফলে সাহিত্যচর্চা ও সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা তার জনসংযোগ পেশায় বিশেষ সহায়ক হয়ে উঠেছে বলেই মনে হয়।
বহু পরিচয়ের নেপথ্যে একজন মানুষ
প্রদীপ্ত মোবারকের জীবন ও কাজের দিকে তাকালে একটি বিষয় বিশেষ ভাবে চোখে পড়ে। তিনি নিজের সৃজনশীল পরিচয়কে পেশাগত দায়িত্ব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে রাখেননি। বরং কবিতা, প্রবন্ধ, সাংবাদিকতা ও জনসংযোগ, এই চারটি ক্ষেত্র পরস্পরকে কোনও না কোনও ভাবে সমৃদ্ধ করেছে। কবিতা তাকে দিয়েছে ব্যক্তিমানুষের আবেগ ও অনুভূতির কাছে পৌঁছনোর সুযোগ। প্রবন্ধ শিখিয়েছে যুক্তি ও বিশ্লেষণের শৃঙ্খলা। সাংবাদিকতা পরিচয় করিয়েছে বাস্তব জীবনের বহুবিধ অভিজ্ঞতার সঙ্গে। আর জনসংযোগ পেশা তাকে দিয়েছে মানুষের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক নির্মাণের পরিসর। এই বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়েই গড়ে উঠেছে তার নিজস্ব জীবনবোধ। তবে সাহিত্যিক পরিচয়ের মূল্যায়ন শেষ পর্যন্ত পেশাগত সাফল্য দিয়ে হয় না। তার জন্য ফিরে যেতে হয় লেখার কাছে। দেখতে হয়, সেই লেখা কতখানি নিজস্ব, কতখানি শিল্পসম্মত এবং পাঠকের চিন্তাজগতে কতটা আলোড়ন তুলতে সক্ষম। প্রদীপ্ত মোবারকের সাহিত্যসাধনাকেও সেই নিরিখেই বিচার করতে হবে। তার কবিতা ও প্রবন্ধের বিষয়বৈচিত্র্য নিঃসন্দেহে সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু সেই সম্ভাবনার পূর্ণ মূল্যায়ন নির্ভর করবে তার রচনার সামগ্রিক পাঠ, ভাষার স্বকীয়তা এবং সাহিত্যিক নির্মাণের গভীরতার উপর। একজন সাহিত্যসাধকের ক্ষেত্রে এই বিচারই সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক।
শিকড়ের টান, সময়ের সঙ্গে সংলাপ
ভোলার মৌটুপী গ্রামের নদীবেষ্টিত প্রকৃতি থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাঙ্গন, সেখান থেকে কলকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাপরিসর, প্রদীপ্ত মোবারকের শিক্ষাগত ও সৃজনশীল যাত্রায় রয়েছে দুই বাংলার সাহিত্যসংস্কৃতির সঙ্গে সংযোগের সূত্র। এর পাশাপাশি ঢাকার সংবাদপত্রের বার্তাকক্ষ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ বিভাগের দায়িত্ব তাকে যুক্ত রেখেছে সমকালীন সমাজবাস্তবতার সঙ্গে। এই যাত্রাপথে এক দিকে রয়েছে শিকড়ের প্রতি টান, অন্য দিকে বৃহত্তর পৃথিবীকে জানার আকাঙ্ক্ষা।
বাংলা ভাষার সাংস্কৃতিক ভূগোল রাজনৈতিক সীমানায় বিভক্ত হলেও সাহিত্যের আত্মীয়তা সেই সীমারেখা মানে না। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ কিংবা লালনের উত্তরাধিকার দুই বাংলার সাংস্কৃতিক চেতনাতেই সমান ভাবে প্রবহমান। প্রদীপ্তর সাহিত্যপাঠ, গবেষণার আগ্রহ ও বিষয় নির্বাচনের মধ্যেও সেই অভিন্ন উত্তরাধিকারের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়।বিশেষ করে ভাষা ও মানবতাবাদ নিয়ে তাঁর প্রবন্ধচর্চা এই সাংস্কৃতিক সংযোগকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। বাংলা সাহিত্যকে ভালবাসা মানে কেবল তার অতীত গৌরবের স্মৃতিচারণ নয়। তার বর্তমানকে বোঝা, সংকটকে চিহ্নিত করা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে আবিষ্কার করাও সেই ভালবাসারই অংশ। প্রদীপ্ত মোবারকের লেখকজীবনে এই অনুসন্ধানের একটি ধারাবাহিক প্রয়াস রয়েছে।
শব্দের সাধনা যেখানে জীবনেরই সম্প্রসারণ
একজন লেখকের সবচেয়ে বড় পরিচয় শেষ পর্যন্ত তার লেখাতেই। খ্যাতি, পদমর্যাদা কিংবা সামাজিক স্বীকৃতি সময়ের সঙ্গে বদলায়। থেকে যায় শব্দ, চিন্তা এবং সেই শব্দের ভিতর দিয়ে নির্মিত মানবিক অভিজ্ঞতা।প্রদীপ্ত মোবারকের সৃজনশীল যাত্রা এখনও চলমান। তার সামনে রয়েছে আরও নিবিড় সাহিত্যচর্চার সুযোগ, নতুন বিষয় অন্বেষণের পরিসর এবং নিজের কাব্যভাষাকে আরও পরিণত করে তোলার সম্ভাবনা। তার কবিতায় যে বিষণ্ণতা ও আত্মঅনুসন্ধানের প্রবণতা, প্রবন্ধে যে সমাজসচেতনতা এবং পেশাগত জীবনে যে যোগাযোগমুখী ভূমিকা, এই সব কিছুর মধ্যে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যায়। তা হল মানুষকে বোঝার চেষ্টা। কখনও সেই মানুষ প্রেমিক, কখনও নিঃসঙ্গ, কখনও সমাজের নানা অসঙ্গতির মুখোমুখি এক নাগরিক। আবার কখনও সে নিজের ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয় নিয়ে উদ্বিগ্ন।
এই বহুরূপী মানুষের জীবনই তার লেখালেখির অন্যতম অনুপ্রেরণা।
সাহিত্য কেবল সৌন্দর্যসৃষ্টির অনুশীলন নয়, জীবনের সঙ্গে এক নিরন্তর সংলাপও। যে সংলাপে থাকে প্রশ্ন, সংশয়, আনন্দ, বেদনা এবং নতুন করে আবিষ্কারের আকাঙ্ক্ষা। প্রদীপ্ত মোবারকের কবিতা ও গদ্যের মধ্যে সেই সংলাপেরই নানা চিহ্ন ছড়িয়ে রয়েছে। একটি নদী যেমন নিজের উৎসকে সঙ্গে নিয়েই বহুদূর প্রবাহিত হয়, তেমনই একজন সৃষ্টিশীল মানুষও তার শিকড়, স্মৃতি ও অভিজ্ঞতাকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলেন নতুন দিগন্তের দিকে।
ভোলার সেই নদীবেষ্টিত জনপদ থেকে শুরু হওয়া প্রদীপ্ত মোবারকের যাত্রাও তাই কেবল এক ব্যক্তির প্রতিষ্ঠার কাহিনি নয়; এ এক মানুষের নিজেকে নির্মাণের, ভাষাকে আশ্রয় করার এবং শব্দের ভিতর দিয়ে সময়কে চিনে নেওয়ার দীর্ঘ প্রয়াস। সেই প্রয়াস কত দূর পৌঁছবে, তার উত্তর দেবে আগামী দিনের সাহিত্যচর্চা ও পাঠকের বিচার। আপাতত তাঁর এই বহুমুখী পথচলা মনে করিয়ে দেয় একটি সহজ সত্য, সাহিত্য কোনও বিচ্ছিন্ন অলঙ্কার নয়, তা জীবনেরই এক গভীরতর প্রকাশ। আর সেই জীবনকে শব্দে, অনুভবে ও মননে ধরে রাখার সাধনাতেই হয়তো নিহিত রয়েছে প্রদীপ্ত মোবারকের সৃজনশীল পরিচয়ের প্রকৃত তাৎপর্য।
লেখক: শুভ চক্রবর্তী, শিক্ষক, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা।
