সন্তানদের কর্মসূত্রে দূরে চলে যাওয়া, একক পরিবারের বিস্তার আর দীর্ঘায়িত আয়ু— সব মিলিয়ে বদলে যাচ্ছে বার্ধক্যের চেনা ছবি। ‘বৃদ্ধাশ্রম’ আর অসহায় জীবনের শেষ ঠিকানা নয়, বরং হয়ে উঠেছে মর্যাদা, স্বাধীনতা ও নতুন করে বাঁচার এক বিকল্প ঠিকানা। লিখছেন চিন্ময় বসু।
‘আমাদের পাড়া তো প্রায় বৃদ্ধাশ্রম হয়ে গিয়েছে!’ কথাটা প্রায়ই শোনা যায় এখন। অনেক পাড়ার ক্ষেত্রেই অমূলক নয় এই ধারণা। বয়স্ক মানুষের সংখ্যা সত্যিই বেড়ে চলেছে। ভারত সরকারের পরিসংখ্যান বিষয়ক মন্ত্রালয়ের ২০২১ সালের প্রকাশিত নথি (এলডার্লি ইন ইন্ডিয়া) অনুসারে, ২০১১ সালের জনগণনায় ষাটোর্ধ্ব সংখ্যা ছিল ১০ কোটির বেশি। ২০৩১ সালে হবে ২০ কোটির কাছাকাছি। অর্থাৎ ২০ বছরে দ্বিগুণ। ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’-র প্রকাশিত হিসাব অনুসারে, ভারতের মানুষের গড় আয়ু অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৯১ সালে ছিল ৫৯। ২০২১ সালে হয়েছে ৬৯-এর কাছাকাছি।
১৯৯০ সাল থেকে ইলেকট্রনিক্স ও টেলিযোগাযোগের ব্যাপক ও দ্রুত বিকাশ, আধুনিক ইন্টারনেটের আবির্ভাব, অ্যানালগ থেকে ডিজিটাল প্রযুক্তির রূপান্তর অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে। আমাদের দেশেও পুরনো ধারণাকে সরিয়ে উদার অর্থনীতি গ্রহণ করা হয়। বিশ্বায়ন বা ‘গ্লোবালাইজেশন’-এর ঢেউয়ের প্রভাব পৌঁছায় মানুষের ঘরে ঘরে। কিন্তু উন্নতির দৌড়ে পিছিয়ে পড়তে থাকে গ্রামগুলি। ফলে গ্রাম ও ছোট শহর থেকে বহু মানুষ বড় শহরে আসতে থাকে, বিশেষত অল্পবয়সিরা। শহরের জনঘনত্ব বৃদ্ধি চাপ সৃষ্টি করে বাসস্থানের উপরে। অন্যদিকে, নারীপিছু গড়সন্তান সংখ্যা দ্রুত কমতে থাকে। যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবারের সৃষ্টি হয়, যাকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি’। অল্প পরিসরে থাকার বাধ্যবাধকতায় অনেক পরিবারই ভাগ হয়ে পড়ে।
তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতিতে পাশ্চাত্যের দেশগুলিতে ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রযুক্তি এবং কারিগরিবিদ্যায় দক্ষতাসম্পন্ন মানুষের প্রয়োজন বাড়তে থাকে।
তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতিতে পাশ্চাত্যের দেশগুলিতে ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রযুক্তি এবং কারিগরিবিদ্যায় দক্ষতাসম্পন্ন মানুষের প্রয়োজন বাড়তে থাকে। নিজেদের দেশে সংখ্যা অতুলান এবং তাদের মাইনেও বেশি। এই দেশগুলি তাই ভিসা নিয়ম শিথিল করে ভারত ও অন্যান্য উন্নতিশীল দেশ থেকে অল্পবয়সিদের নিয়োগ করে। ভারতেরও বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ, গুরুগ্রাম, পুনে ইত্যাদি শহরে আমেরিকার সিলিকন ভ্যালির ধঁাচায় গড়ে ওঠে তথ্যপ্রযুক্তি কেন্দ্র বা ‘হাব’। দুর্ভাগ্যবশত এ রাজ্যে তেমন শিল্প হাব গড়ে না ওঠায় কলকাতা পিছিয়ে পড়ে, বাংলার ছেলেমেয়েরা চাকরির সন্ধানে অন্য রাজ্যে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হয়। ৩০-৪০ বছর আগে যঁারা নতুন সংসার পেতেছিলেন, সেই বাবা-মা’রা তত দিনে যৌবন পেরিয়ে প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছে গিয়েছেন। তারপর আরও এক-দেড় দশকের মধ্যে অনেকেই বার্ধক্যের দোরগোড়ায়। এদিকে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গী হয় নানা রোগ। রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধি, উচ্চ রক্তচাপ, চোখে ছানি বা মহিলাদের অস্টিওপোরোসিস যার আর-এক নাম বাত–
এসব তো অনেকেরই নিত্যসঙ্গী হয়ে ওঠে।
সাতের দশক থেকে গত অর্ধশতাব্দীতে অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে তাল রেখে চিকিৎসাশাস্ত্রের ও চিকিৎসাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত বয়স্ক মানুষদের বিশাল বাজার ধরতে নানা ধরনের নতুন স্বাস্থ্য বা চিকিৎসা সংক্রান্ত যোজনা এবং সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যবীমা চালু হয়েছে।
দিনে দিনে সমাজে মহিলাদের যেসব বাধা ছিল, তাও একে একে ভেঙে গিয়েছে ও যাচ্ছে। শিক্ষিত মেয়েরা অফিসে, শিক্ষানুষ্ঠানে, হাসপাতালে, পারিবারিক ব্যবসায় কাজ করছে। অল্প পড়াশোনা জানা বা না জানা মহিলারাও কর্মক্ষেত্রে আজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে আছে। কাজের মাসি বা রান্নার দিদি অথবা রাতের আয়া এবং বিভিন্ন ধরনের পরিচারিকা আজ যেমন শহরে বসবাসকারী চাকরি করা মহিলাদের বা অবসরপ্রাপ্ত বয়স্ক দম্পতিদের বড় অবলম্বন, তাদের নিজের পরিবারকেও তারা দেয় আর্থিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।
বয়স্ক মানুষরা শিকড়ছেঁড়া হয়ে রাজ্যের বা দেশের বাইরেও যেতে চান না। অনেকেই বৃদ্ধ
বয়সে সন্তানের উপর বোঝা হতেও চান না।
বার্ধক্যেরও বিভিন্ন ধাপ আছে। বছরের পর বছর বিভিন্ন অসুখের কারণে শরীর ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে, সাধারণ নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজ করতেও ভাল লাগে না। অনেকেই তখন চান বেঁচে থাকার নির্ঘণ্টগুলি আপন নিয়মে চলবে; সময়ে খাবার পাওয়া যাবে, শরীর খারাপ হলে ডাক্তার এসে দেখে যাবে, ওষুধ দিয়ে যাবে কেউ। কিছুটা সময় টিভি খুলে চেনা ও পছন্দের চ্যানেলগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে ভাল লাগবে, ফঁাকা রাস্তায় বা মাঠে খোলা হাওয়ায় একটু হঁাটা যাবে, কারও সঙ্গে বসে দুটো মনের কথা বলার সুযোগ থাকবে, নিজের ভাষাতে নিজের বয়সিদের সঙ্গে। প্রত্যেক রাতে বা সপ্তাহে দু’-তিনদিন ফোনে ভিডিও কলে ছেলে বা মেয়ে অথবা নাতি-নাতনিদের সঙ্গে একটু কথা বলে নিজেকে প্রিয়জনদের প্রিয় মনে হয়, মন ভাল লাগে।
বয়স্ক মানুষরা শিকড়ছেঁড়া হয়ে রাজ্যের বা দেশের বাইরেও যেতে চান না। অনেকেই বৃদ্ধ
বয়সে সন্তানের উপর বোঝা হতেও চান না। এই চাহিদা থেকেই প্রবীণদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠছে এক ধরনের প্রতিষ্ঠান– যার নাম দেওয়া হয় ‘বৃদ্ধাশ্রম’। বৃদ্ধাশ্রমের মধ্যে যে ‘আশ্রম’ শব্দটি লুকিয়ে আছে, তার আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ‘তপস্বীদের সাধনার স্থল’। যেন জীবনের তিনটি স্তর পেরিয়ে এসে শেষ ভাগ অর্থাৎ ‘সন্ন্যাস’ নেওয়ার আস্তানা। ‘বৃদ্ধাশ্রম’ শব্দটাতে অনেকেই এই কারণে নেতিবাচক ইঙ্গিত খুঁজে পান। যেন পরিবার থেকে দূরে ঠেলে দেওয়া বয়স্ক মানুষদের বাধ্য হয়ে থাকার জায়গা।
উন্নত দেশগুলিতে প্রবীণদের জন্য উদ্দিষ্ট আবাসনে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের চমৎকার ব্যবস্থা রয়েছে। বয়স্ক মানুষদের প্রয়োজনকে ভিত্তি করে বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। অনেক সুস্থ এবং স্বাবলম্বী প্রবীণরা নিজস্ব ফ্ল্যাট বা কটেজে স্বাধীনভাবে থাকেন। যঁারা অসুস্থ নন, তবে প্রতিদিনের কিছু কাজ– যেমন, স্নান করা, পোশাক পরা, ওষুধ খাওয়া বা রান্নার জন্য সামান্য সহায়তার প্রয়োজন বোধ করেন, তাদের জন্য অন্য বন্দোবস্ত। গুরুতর অসুস্থ, শয্যাশায়ী বা এমন প্রবীণদের জন্য লাইসেন্সপ্রাপ্ত নার্স এবং চিকিৎসকরা ২৪ ঘণ্টা তত্ত্বাবধান করেন। অ্যালঝাইমার’স, ডিমেনশিয়া (স্মৃতিভ্রম) বা অন্য কোনও মানসিক অবক্ষয়জনিত রোগে আক্রান্ত প্রবীণদের জন্য তৈরি আবাসনগুলি সুরক্ষিত থাকে যাতে রোগীরা বাইরে হারিয়ে না যান। একই ক্যাম্পাসের ভিতরে অনেক সময়ই সব সুবিধা থাকে। প্রবীণদের বয়স ও শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তঁাদের ক্যাম্পাসের ভিতরে এক বিভাগ থেকে অন্য বিভাগে স্থানান্তর করা হয়।
এখন বৃদ্ধাশ্রমে থাকার অর্থ জীবন থেকে অবসর নিয়ে সব আনন্দ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে ‘হরি দিন তো গেল’ গেয়ে মুক্তির অপেক্ষা করা নয়।
সরকারি প্রকল্পে আমাদের দেশে যে বৃদ্ধাশ্রমগুলি আছে প্রয়োজনের তুলনায়, তা অবশ্যই কিঞ্চিৎকর। এবং তাদের ব্যবস্থাও আশানুরূপ উন্নত মানের নয়। কিন্তু অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানও হালে উচ্চমানের বন্দোবস্ত করছে বয়স্ক মানুষদের জন্য। যঁারা কর্মজীবনে মোটামুটি ভাল উপার্জন করেছেন, অথবা যঁাদের ছেলেমেয়েরা বিদেশে বা দেশে অন্য শহরে আর্থিক সচ্ছলতায় থাকেন তঁারাও বাবা-মা’দের ভাল থাকার জন্য এমন সংস্থার খোঁজে থাকেন। ‘বৃদ্ধাশ্রম’ নাম থেকে তাই কালিমাও দ্রুত মুছে যাচ্ছে। ভারতে সবথেকে বেশি সংখ্যায় বৃদ্ধাশ্রম রয়েছে কেরলমে, যেখানে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা দেশে সর্বাধিক। কেরলমের পরেই আমাদের পশ্চিমবঙ্গের স্থান। এবং এর সংখ্যা বাংলায় দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। কলকাতায় বৃদ্ধাশ্রম প্রায় দুই শতাধিক, রাজ্যের প্রায় অর্ধেক।
এখন বৃদ্ধাশ্রমে থাকার অর্থ জীবন থেকে অবসর নিয়ে সব আনন্দ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে ‘হরি দিন তো গেল’ গেয়ে মুক্তির অপেক্ষা করা নয়। এখন যঁারা সেখানে থাকতে চান, তঁারা বয়সের সঙ্গে সমীচীন জীবন উপভোগ করতে ইচ্ছুক, এবং বিভিন্ন সংস্থা যে আধুনিক ‘আশ্রম’গুলি বানাচ্ছে, সেখানে সবরকমের প্রয়োজনীয় বন্দোবস্ত রাখছে। বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের জন্য এই আশ্রয়স্থলগুলি বিদেশের ধঁাচে হয়ে উঠছে আবাসন। সেখানে দৈনন্দিন জীবনে নানা আনন্দের উপকরণ, উৎসব উদ্যাপনের ব্যবস্থাও থাকে। এখন এমন প্রতিষ্ঠানের চাহিদা এবং সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে।
এই নতুন আবহে আর বৃদ্ধ মানুষদের আশ্রয়স্থলগুলিকে ‘আশ্রম’ আখ্যা দেওয়া অসংগত কেবল নয় অশুদ্ধও বটে। আমাদের দেশেও দেরি নেই, সুন্দর সব নাম নিয়ে নতুন জীবন আরম্ভ করার প্রতিশ্রুতি হয়ে উঠবে বৃদ্ধ বয়সের এসব আবাসন।
(মতামত নিজস্ব)
লেখক প্রাবন্ধিক
[email protected]
