প্রতিষ্ঠার দুই দশক পেরিয়ে গেলেও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) গড়ে ওঠেনি প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের কার্যকর কোনো কেন্দ্রীয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন। বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নেওয়া হলেও রাজনৈতিক বিরোধ, নেতৃত্ব নিয়ে মতপার্থক্য ও সমন্বয়ের অভাবে তা বাস্তব রূপ পায়নি। অথচ প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো, বর্তমান শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার গঠনে সহায়তা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে এ ধরনের সংগঠন।
উচ্চশিক্ষা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশের পর শিক্ষার্থীরা ছড়িয়ে পড়েন দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পেশায়। সময়ের সঙ্গে তাদের কর্মপরিধি বাড়ে, তৈরি হয় নতুন অভিজ্ঞতা ও সম্ভাবনা। তবু প্রিয় ক্যাম্পাসের সঙ্গে থেকে যায় শিকড়ের টান। সাবেক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক ধরে রাখা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন। এর মাধ্যমে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে যোগাযোগ ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের পাশাপাশি বর্তমান শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার গঠন, পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে সহায়তা করা সম্ভব। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা ও সামগ্রিক উন্নয়নেও সম্মিলিতভাবে অবদান রাখার সুযোগ তৈরি হয়।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সময়ে কেন্দ্রীয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা কার্যকর ও স্থায়ী রূপ পায়নি। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় দুটি সভার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ৭১ সদস্যের একটি কমিটি ঘোষণা করা হয়। তবে অভিযোগ ওঠে, কমিটিটি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক কমিটিতে রূপ নেয়। এ নিয়ে সমালোচনার মুখে পরে কমিটিটি বিলুপ্ত করা হয়।
পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তনকে সামনে রেখে অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন গঠনে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়ার চিন্তা করা হলেও রাজনৈতিক বিরোধ ও প্রভাব বিস্তারের জটিলতায় তা বাস্তবায়িত হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
কেন্দ্রীয় সংগঠন না থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি বিভাগে পৃথকভাবে অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন গঠনের উদ্যোগ দেখা গেছে। চলতি বছর প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিভাগীয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের প্রথম কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়। তবে, বিভাগভিত্তিক এসব উদ্যোগের বাইরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব প্রাক্তন শিক্ষার্থীকে এক ছাতার নিচে আনার মতো কেন্দ্রীয় কাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট পর্যালোচনা করে কেন্দ্রীয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের কোনো কার্যকর কাঠামো বা প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট তথ্যভান্ডারের সন্ধান পাওয়া যায়নি। অথচ এখন পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রমের বিভিন্ন তথ্য ওয়েবসাইটে থাকলেও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য কেন্দ্রীয় কোনো প্ল্যাটফর্মের তথ্য দৃশ্যমান নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষার্থীদের মতে, প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা ও পেশাগত দক্ষতা তাদের ক্যারিয়ার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। চাকরির প্রস্তুতি, জীবনবৃত্তান্ত তৈরি, সাক্ষাৎকারের কৌশল, উচ্চশিক্ষা ও পেশা নির্বাচনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের পরামর্শ বর্তমান শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক হতে পারে। পাশাপাশি শক্তিশালী অ্যালামনাই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইন্টার্নশিপ, চাকরি ও পেশাগত যোগাযোগের নতুন সুযোগও তৈরি হতে পারে।
অর্থনীতি বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ হাসান বলেন, “নবীন শিক্ষার্থীদেরকে অ্যালামনাইরা অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ, ক্যারিয়ার গাইডলাইন তৈরিতে সহযোগিতা করতে পারেন। আমাদের একটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন থাকলে বর্তমান শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ বাড়বে। ফলে জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা তাদের অ্যালামনাইদের কাছ থেকে চাকরি, উচ্চশিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, ইন্টার্নশিপ, ক্যারিয়ার ও বাস্তব অভিজ্ঞতার নানা দিক সম্পর্কে জ্ঞান লাভ পারবে।”
প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মতে, আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান উন্নয়নেও অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, নেতৃত্ব নিয়ে মতপার্থক্য এবং প্রশাসনিক জটিলতা দূর করা জরুরি। তাদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দ্রুত প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের তথ্য ভান্ডার তৈরি, সব ব্যাচ ও বিভাগের প্রতিনিধিদের নিয়ে মতবিনিময় এবং স্বচ্ছ গঠনতন্ত্র ও নির্বাচন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করে একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করলে অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনকে কার্যকর করা সম্ভব।
রসায়ন বিভাগের ১১তম আবর্তনের প্রাক্তন শিক্ষার্থী আব্দুল আউয়াল বলেন, “অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্যারিয়ার সহযোগিতা, মেন্টরশিপ ও নেটওয়ার্কিং তৈরির কাজ করতে পারে। সেই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ও সামাজিক কার্যক্রমে সাবেক শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা ও সহযোগিতা কাজে লাগানো সম্ভব। আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ের ক্ষেত্রেও অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ।”
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ১৩তম আবর্তনের প্রাক্তন শিক্ষার্থী বিল্লাল হোসেন স্বাধীন বলেন, “একটি কার্যকর কেন্দ্রীয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন গড়ে উঠলে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে যোগাযোগ ও পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়বে। পাশাপাশি বর্তমান শিক্ষার্থীরা প্রাক্তনদের কাছ থেকে ক্যারিয়ার গাইডলাইন, ইন্টার্নশিপ, চাকরির সুযোগ ও মেন্টরশিপের মতো সুবিধা পেতে পারে। তবে সংগঠন গঠনের ক্ষেত্রে সমন্বয়ের অভাব, নেতৃত্ব নিয়ে মতপার্থক্য ও প্রশাসনিক জটিলতা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।”
“বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে দ্রুত প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের তথ্যভান্ডার তৈরি, সব ব্যাচ ও বিভাগের প্রতিনিধিদের নিয়ে মতবিনিময় এবং স্বচ্ছ গঠনতন্ত্র ও নির্বাচন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করে একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। একইসঙ্গে, প্রাক্তন শিক্ষার্থীদেরও ঐক্যবদ্ধভাবে সহযোগিতা করতে হবে”, যোগ করেন তিনি।
অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন গঠনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সম্প্রসারণ দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কাউছার আহমেদ পাটোয়ারী বলেন, “সাবেক শিক্ষার্থীরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কোলাবোরেশান করে গবেষণা করলে আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে উন্নতি করা সম্ভব। তাই একটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন গঠনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।”
কেন্দ্রীয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন গঠনের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করীম বলেন, “শিক্ষার্থীরা চাইলে স্টুডেন্টস অ্যাফেয়ার্সের পরিচালক উদ্যোগ নিবে। প্রস্তাবটি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেই আসুক। শিক্ষার্থীরা যোগাযোগ করলে আমরা সহযোগিতা করব। আমরা এমন একটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন চাই, যারা বিভাগের কারিকুলামে পরামর্শ দেবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে এবং শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন জায়গায় প্লেসমেন্টে সহযোগিতা করবে।”
তিনি আরো বলেন, “অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন থাকাটা জরুরি। আমাদের র্যাঙ্কিং উন্নয়নের জন্য নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাই এখন একটি শক্তিশালী অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনও প্রয়োজন।”
