সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বাংলাদেশি যুবক নজরুল ইসলামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার বিরামপুর গ্রামে। ছেলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর আগে থেকে না জানানোয় শোকে স্তব্ধ তাঁর বাবা-মা। একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানকে হারানোর বেদনার পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে আইনি সহায়তা ও কনস্যুলার যোগাযোগের সুযোগ ছিল কি না, তা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্বজনেরা।
গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের মক্কায় কথিত অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে নজরুল ইসলামসহ দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে দেশটির কর্তৃপক্ষ। পরিবারের সদস্যরা জানান, গণমাধ্যমের খবর থেকেই তাঁরা নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি জানতে পারেন।
নজরুল ইসলামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামে। চার ভাই-বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। এসএসসি পাস করার পর পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব নিতে ২০২২ সালে সৌদি আরবে যান তিনি। সেখানে মক্কার মসজিদুল হারামে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, সৌদি আরবে যাওয়ার প্রায় সাত মাস পর থেকে নজরুলের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। পরে একদিন ফোন করে তিনি জানান, কারাগারে বন্দি রয়েছেন। তবে কী কারণে তাঁকে আটক করা হয়েছে, সে বিষয়ে পরিবারকে বিস্তারিত জানাননি।
নজরুলের বাবা আবদুল বাছির বলেন, তাঁর ছেলে তিন বছরের বেশি সময় সৌদি আরবে বন্দি ছিলেন। গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) বাংলাদেশ কনস্যুলেট বা পরিবারকে না জানিয়ে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে নজরুল আইনি সহায়তা পেয়েছিলেন কি না এবং এ ঘটনায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের ভূমিকা কী ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে ছেলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চান তিনি।
নজরুলের মা রেহেনা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, এসএসসি পাস করার পর তাঁর ছেলে আর পড়াশোনা করতে চায়নি। পরিবারের হাল ধরতে সৌদি আরবে গিয়েছিল। ছোট তিন সন্তানকে নিয়ে এখন তিনি দিশাহারা। ছেলের সঙ্গে গত রোববার শেষবার কথা হয়েছিল বলে জানান তিনি। তখন ছেলে পরিবারের খোঁজখবর নিয়েছিল। এরপর বুধবার গণমাধ্যমের খবরে ছেলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা জানতে পারেন তাঁরা।
রেহেনা বেগম বলেন, তাঁদের কেউ আগে থেকে কিছু জানাননি। সরকারের কাছে তাঁর আবেদন, ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হোক, যাতে শেষবারের মতো তাঁকে দেখতে পারেন।
এদিকে নজরুলের মৃত্যুর খবর শোনার পর শোক সইতে না পেরে সেদিনই হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তাঁর ফুফু আবেদা বেগম (৬৫)। এ ঘটনায় পুরো গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজন ও এলাকাবাসী শোকাহত পরিবারটির পাশে দাঁড়াতে বাড়িতে ভিড় করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে পরিবারকে জানানো হয়েছিল কি না এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের যথাযথ সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা দাবি করেন তাঁরা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ বলেন, নজরুলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে এখনো সরকারের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। মরদেহ দেশে ফিরলে ভুক্তভোগী পরিবারকে সহায়তা করা হবে।
তবে নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে আইনি প্রক্রিয়া, কনস্যুলার যোগাযোগ ও পরিবারকে অবহিত করার বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
এমএস/
