কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির শীর্ষ দুই পদে দুই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ ছয় সরকারি চাকরিজীবীকে রাখার অভিযোগ উঠেছে; বিতর্কের মুখে আহ্বায়ক শামসুজ্জামান হাসু চাকরি ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন, আর ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির শীর্ষ দুই পদে দায়িত্ব পেয়েছেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুই প্রধান শিক্ষক। এ ছাড়া কমিটিতে আরও চার সরকারি চাকরিজীবীকে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর বিধি ২৫(১) অনুযায়ী, সরকারি কর্মচারীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের বিধিনিষেধ থাকায় বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় বিএনপি ও বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
কমিটির আহ্বায়ক শামসুজ্জামান হাসু জানিয়েছেন, তিনি ও সদস্যসচিব আব্দুল মান্নান মুকুল সরকারি চাকরি ছেড়ে দেবেন। তবে সদস্যসচিব তাৎক্ষণিকভাবে চাকরি ছাড়ার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানাননি।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাতে কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও সদস্যসচিব স্বাক্ষরিত দলীয় প্যাডে ফুলবাড়ী উপজেলা বিএনপির ২০ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়।
কমিটিতে আহ্বায়ক করা হয়েছে ফুলবাড়ী উপজেলার রোশন শিমুলবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শামসুজ্জামান হাসুকে। সদস্যসচিব হয়েছেন একই উপজেলার পূর্ব কুরুষা ফিরুষা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মান্নান মুকুল।
এ ছাড়া কমিটির সদস্য হিসেবে রয়েছেন পশ্চিম কবির মামুদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আবুল হোসেন, যতীন্দ্র নারায়ণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান মুকুল, সরকারি সাইফুর রহমান কলেজের শরীরচর্চা শিক্ষক শাহিনুর রহমান এবং অগ্রণী ব্যাংকের ফুলবাড়ী শাখার সিনিয়র অফিসার তহিদুল হক।
সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর বিধি ২৫(১) অনুযায়ী, সরকারি কর্মচারীরা কোনো রাজনৈতিক দল বা এর অঙ্গসংগঠনের সদস্য হতে কিংবা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে বা সহযোগিতা করতে পারেন না। এ বিধি লঙ্ঘন অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হওয়ার বিধান রয়েছে।
কমিটিতে সরকারি চাকরিজীবীদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যেও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, দলীয় গঠনতন্ত্র ও সরকারি চাকরিবিধি উপেক্ষা করে ছয় সরকারি কর্মচারীকে কমিটিতে স্থান দেওয়া হয়েছে।
কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুর রহমান বলেন, দুই বছর পর কমিটি ঘোষণা করা হলেও এতে আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবসহ ছয় সরকারি চাকরিজীবীকে রাখা হয়েছে, যা দলীয় গঠনতন্ত্র ও সরকারি চাকরিবিধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাঁর দাবি, ওই ব্যক্তিদের দুঃসময়ে রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা ছিল না। এ কমিটি নেতাকর্মীরা প্রত্যাখ্যান করেছেন। বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে অভিযোগ দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে বলেও জানান তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক শামসুজ্জামান হাসু বলেন, ‘আমি ও আমার সদস্যসচিব চাকরি ছেড়ে দেবো। আপনারা চিন্তা করবেন না। আগামীকাল চাকরিতে ইস্তফা দেওয়ার কাগজ পেয়ে যাবেন।’
ফুলবাড়ী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল লতিফ বলেন, সরকারি শিক্ষকদের রাজনৈতিক দলে যুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই। বিষয়টি তিনি শুনেছেন, তবে এখনো কোনো কাগজপত্র পাননি। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।
অন্যদিকে, কমিটিতে সদস্য পদ পাওয়া অগ্রণী ব্যাংকের কর্মকর্তা তহিদুল হক দলীয় পদে থাকার বিষয়টি স্বীকার করলেও বিস্তারিত বলতে চাননি। অগ্রণী ব্যাংকের কুড়িগ্রাম অঞ্চলের প্রধান আহসান হাবিব সরকার বলেন, প্রবিধান অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীরা রাজনৈতিক দল বা ব্যবসা-বাণিজ্যে যুক্ত থাকতে পারেন না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে উপজেলা কমিটির সদস্যসচিব আব্দুল মান্নান মুকুল তাৎক্ষণিকভাবে চাকরি ছাড়ার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানাননি। বিষয়টি নিয়ে পরে কথা বলবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
এ বিষয়ে জেলা বিএনপির এক নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী সরকারি চাকরিজীবীদের দলীয় পদ পাওয়ার সুযোগ নেই। কেউ অভিযুক্ত হলে বা অভিযোগ করা হলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, ‘আমি কোনো স্বাক্ষর করিনি।’ এরপর তিনি ফোন কেটে দেন।
জেলা বিএনপির সদস্যসচিব ও জেলা পরিষদ প্রশাসক সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদকে ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা স্বপন কুমার মুঠোফোনে বলেন, এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে দুজন চাকরি ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেছেন। অন্যরা কী করবেন, তা তদন্ত শেষে বলা যাবে।
