শিল্পকলা, সংস্কৃতি এবং ইতিহাস জানার অন্যতম সেরা মাধ্যম হলো জাদুঘর বা মিউজিয়াম। বিশ্ব পর্যটনে সম্প্রতি যুক্ত হওয়া দুটি মিউজিয়াম তাদের সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী ধারণার কারণে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জানেন কি কোন দুটি জাদুঘর এবং কী আছে তাতে। দুটি জাদুঘরের মধ্যে একটি মানুষকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় শত শত বছরের পুরোনো সামুদ্রিক বাণিজ্যের রোমাঞ্চকর ইতিহাসে। আর অন্যটি পপ কালচার ও চলচ্চিত্রের কল্পনাকে নিয়ে যায় আধুনিকতার চূড়ায়। ফিলিপাইনের ম্যানিলায় মুসেও দেল গালিওন জাদুঘরটি ঐতিহাসিক গালিওন জাহাজ ও ফিলিপাইনের নাবিকদের সাহসিকতার গল্প জীবন্ত করে তুলেছে। ইন্টারঅ্যাকটিভ প্রদর্শনী ও বিশালাকার জাহাজের রেপ্লিকার মাধ্যমে সেখানে যেন প্রাণ পেয়েছে যন্ত্রগুলো। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে নির্মিত ১.৫ বিলিয়ন ডলারের ফিউচারিস্টিক লুকাস মিউজিয়াম অব ন্যারেটিভ আর্ট। সেখানে স্টার ওয়ার্স ও কমিকস থেকে শুরু করে ভ্যান গঘ বা ফ্রিদা কাহলোর শিল্পকর্মের এক অভাবনীয় মেলবন্ধন ঘটিয়ে পপ আর্টকে দিয়েছে অনন্য উচ্চতা।
একটি জাদুঘর বাণিজ্য ও সমুদ্রজয়ের ৪০০ বছরের পুরোনো ইতিহাসকে জীবন্ত করেছে ফাইবারগ্লাস জাহাজ ও ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে। অন্যটি মানুষের কল্পনা, চলচ্চিত্র ও পপ আর্টকে নতুন মর্যাদায় বসাতে ১.৫ বিলিয়ন ডলারে নির্মিত আধুনিক স্থাপত্যের এক বিস্ময়কর সৃষ্টি।
মুসেও দেল গালিওন
গ্লোবাল মার্চেন্ট শিপিং বা বাণিজ্যিক জাহাজে ফিলিপাইনের নাবিকদের অবদান অপরিসীম। সেখানে বিশ্বের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ক্রু ফিলিপাইনের। স্প্যানিশ আমল থেকে ম্যানিলা-আকাপুলকো (মেক্সিকো) রুটে যে প্রাচীন সামুদ্রিক বাণিজ্য চালু ছিল, তা স্মরণ করতে জাদুঘরটি স্থাপন করা হয়েছে। ফিলিপাইনের ম্যানিলায় বিখ্যাত ‘মল অব এশিয়া’ কমপ্লেক্সের ভেতরে শান্ত পরিবেশে এটি অবস্থিত। জাদুঘরের ভেতরে ১৬০৩ থেকে ১৬১৮ সালের দিকে প্রশান্ত মহাসাগরে চলাচলকারী ‘এস্পিরিতু সান্তো’ জাহাজের ১০০ ফুট উঁচু ও ১৩০ ফুট দীর্ঘ একটি বিশালাকার পূর্ণাঙ্গ ফাইবারগ্লাস রেপ্লিকা তৈরি করা হয়েছে। জাহাজের ওপরে তৈরি করা হয়েছে তারায় ভরা ছাদ এবং চারপাশে উচ্চমানের এলইডি স্ক্রিন, যা তখনকার নাবিকদের রাতের প্রশান্ত মহাসাগরের অভিজ্ঞতা দেয়। এখানে স্পর্শ এবং ঘ্রাণ নেওয়ার সুবিধা রয়েছে। ছয়টি ভিন্ন মসলার বয়াম থেকে এশিয়ার মসলার ঘ্রাণ নেওয়া যায়। স্পর্শকাতর টাচস্ক্রিনের মাধ্যমে প্রাচীনকালের নক্ষত্র ও সূর্য দেখে দিক নির্ণয়ের কৌশল জানা যায়। এখানে ম্যানিলার কাভিতে শিপইয়ার্ডের কাঠের তৈরি মূল জাহাজের নির্মাণশৈলী এবং ফিলিপিনো নাবিকদের আত্মত্যাগের বিবরণ প্রদর্শিত হয়েছে। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাবিকদের জন্য বার্তা দেওয়ার বিশেষ বুলেটিন বোর্ড রয়েছে।

লুকাস মিউজিয়াম অব ন্যারেটিভ আর্ট
বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা জর্জ লুকাস এবং তাঁর উদ্যোক্তা স্ত্রী মেলোডি হবসন এই জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা। এটি তৈরিতে খরচ হয়েছে ১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অর্থায়নে নির্মিত। এটি নির্মাণ করতে প্রায় ২০ বছর লেগেছে। এ বছরের ২০ সেপ্টেম্বর চোখধাঁধানো গালার মাধ্যমে এর উদ্বোধন হয়। ২২ সেপ্টেম্বর এটি জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। জাদুঘরটি দক্ষিণ লস অ্যাঞ্জেলেসের এক্সপোজিশন পার্কের ৩৮০০ সাউথ ভারমন্ট অ্যাভিনিউতে অবস্থিত। চীনা স্থপতি মা ইয়ানসোং এর নকশা করেছেন। এটি দেখতে একটি ফিউচারিস্টিক স্পেসশিপ বা মহাকাশযানের মতো। পাঁচতলা এই ভবনের ক্ষেত্রফল ২৭ হাজার ৮০০ বর্গমিটার, যার ৯ হাজার ৩০০ বর্গমিটার এলাকা কেবল প্রদর্শনীর (গ্যালারি) জন্য বরাদ্দ। এর চারপাশের পুরোনো পার্কিং লটকে রূপান্তর করে ২০০টির বেশি গাছ ও সবুজ পার্ক বানানো হয়েছে।

কী আছে লুকাস মিউজিয়াম অব ন্যারেটিভ আর্টের সংগ্রহে
জাদুঘরটিতে প্রায় ৪০ হাজার শিল্পকর্মের এক বিশাল ও দুর্লভ সংগ্রহ রয়েছে। শিল্পকর্মগুলোকে নির্দিষ্ট সময়ের ভিত্তিতে ভাগ না করে পাঁচটি বড় থিমভিত্তিক অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। কমিকস, শিশুদের গল্প, ফ্যান্টাসি, ইতিহাস এবং কমিউনিটি। ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ, ফ্রিদা কাহলো (স্বপ্রতিকৃতি), নরম্যান রকওয়েল, চার্লস হোয়াইট, জুডিথ এফ বাকাস এবং দিয়েগো রিভেরার বিখ্যাত চিত্রকর্ম ও ম্যুরালের দেখা মিলবে এখানে। কমিকস ও ইলাস্ট্রেশনের মধ্যে আছে রবার্ট ক্রাম্ব, জ্যাক কার্বি এবং এনসি ওয়ায়েথের আসল অঙ্কিত কমিক প্যানেল ও ইলাস্ট্রেশন। এখানে আছে জর্জ লুকাসের সিনেমা জগৎ। ‘স্টার ওয়ার্স’ এবং ‘ইন্ডিয়ানা জোন্স’ চলচ্চিত্রের ব্যবহৃত প্রপস ও পোশাক। প্রথম ছয়টি স্টার ওয়ার্স মুভির ওপর বিশেষ গ্যালারি ‘স্টার ওয়ার্স ইন মোশান’ রয়েছে, যেখানে লুক স্কাইওয়াকারের ল্যান্ডস্পিডারও প্রদর্শিত হয়।
সূত্র: সিএনএন, নর্থ ইস্ট টাইমস, শোবিজ ডেইলি
