আজ বিশ্ব মান দিবস। এ উপলক্ষে ‘আমাদের সময়’-এর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) মহাপরিচালক কাজী ইমদাদুল হক বলেছেন, আন্তর্জাতিক মান সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে বাংলদেশের প্রতিনিধিত্ব করে বিএসটিআই। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আল আমিন
আমাদের সময় : বিশ্ব মান দিবসে এবারের প্রতিপাদ্য ‘সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি’। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দিবসটির গুরুত্ব ও মূল বার্তা কী?
কাজী ইমদাদুল হক : আন্তর্জাতিক মান সংস্থা আইএসও, আন্তর্জাতিক ইলেকট্রোটেকনিক্যাল কমিশন (আইইসি) এবং খাদ্যবিষয়ক কোডেক্স অ্যালিমেন্টারিয়াস কমিশনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা পণ্যের মান নির্ধারণে কাজ করছে। বিএসটিআই এসব আন্তর্জাতিক মান সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে। বিশ্ব মান দিবসের প্রতিপাদ্য প্রতিবছর পরিবর্তিত হয়। এবার জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি সংকট ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি ও পণ্যের মান নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশেও সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে মানদণ্ড অনুসরণ করা গেলে জ্বালানির অপচয় কমবে, পরিবেশ সুরক্ষিত হবে এবং টেকসই উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
আমাদের সময় : বিএসটিআই নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। এরপরও বাজারে ভেজাল,
নকল ও নিম্নমানের পণ্য পাওয়া যাচ্ছে। মান নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে দুর্বলতা কোথায়?
কাজী ইমদাদুল হক : বাংলাদেশের বাজার অনেক বড়। বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে ইলেকট্রনিকস, নির্মাণসামগ্রী, প্রসাধনী ও বস্ত্রসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্যের মান নিশ্চিত করতে হয়। কিন্তু আমাদের জনবল ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা সীমিত। বিএসটিআইয়ে মোট জনবল প্রায় ৬০০। দেশের ৬৪ জেলার সব জায়গায় আমাদের সমান সক্ষমতার কার্যালয়ও নেই। কোথাও ১০ জন, কোথাও ১৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। অথচ আমাদের কাজের পরিধি অনেক বিস্তৃত। এ কারণে জনবল, যানবাহন ও পরীক্ষাগার সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি একটি গোয়েন্দা বা ইন্টেলিজেন্স সেল গঠন করা প্রয়োজন। এতে অবৈধ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের তথ্য দ্রুত সংগ্রহ করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
আমাদের সময় : গত এক বছরে নিম্নমানের পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতের দায়ে কতটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযান, জরিমানা বা মামলা করা হয়েছে? এসব অভিযানের বাস্তব ফল কী?
কাজী ইমদাদুল হক : চলতি বছরে প্রায় তিন হাজার মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। ৯২৪টি মামলা হয়েছে। ওজন ও পরিমাপসংক্রান্ত অনিয়মের ঘটনায় ১৫৭৭টি মামলা হয়েছে। নকল পণ্য উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত ৩৩টি কারখানা সিলগালা করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমরা শুধু পণ্যের মান যাচাই করি না; ওজন ও পরিমাপের বিষয়টিও তদারকি করি।
আমাদের সময় : অনেক উদ্যোক্তার অভিযোগ, বিএসটিআইয়ের মান সনদ পেতে দীর্ঘ সময় লাগে। এ সমস্যা সমাধানে কী পদক্ষেপ নিয়েছেন?
কাজী ইমদাদুল হক : উদ্যোক্তাদের এই অভিযোগ আগে ছিল। তবে আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর সনদ প্রদানের প্রক্রিয়া দ্রুত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছি। এখন অনলাইনে আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। পণ্যের নমুনা সংগ্রহের জন্য আমাদের কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট কারখানায় যান। নমুনা পরীক্ষার ফলাফল এবং উৎপাদন স্থলের পরিবেশ যাচাইয়ের ভিত্তিতে সনদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সব পণ্যের পরীক্ষা একই সময়ে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। কোনো পণ্যের কয়েকটি পরীক্ষা দ্রুত করা যায়, আবার কোনো পণ্যের ক্ষেত্রে একাধিক প্যারামিটার পরীক্ষা করতে হয়। কিছু পরীক্ষা সম্পন্ন করতে দুই থেকে তিন দিন বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে। আবার কারখানায় পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি, অগ্নিনিরাপত্তার অভাব কিংবা অন্যান্য ত্রুটি থাকলে সেগুলো সংশোধনের জন্য উদ্যোক্তাকে সময় দেওয়া হয়। এতে সনদ পেতে কিছুটা দেরি হতে পারে।
আমাদের সময় : একই প্রতিষ্ঠান বারবার নিম্নমানের পণ্য উৎপাদন করলে তাদের বিরুদ্ধে কি আলাদা কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়?
কাজী ইমদাদুল হক : আমরা ঝুঁকিভিত্তিক তদারকির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। কোনো প্রতিষ্ঠানের পণ্যে একবার অনিয়ম পাওয়া গেলে পরবর্তী সময়ে সেটিকে আরও নজরদারিতে আনা হয়। একই ধরনের অপরাধ বারবার করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আমদানি করা পণ্যের ক্ষেত্রেও পরীক্ষা ও ছাড়পত্রের প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগে নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে একই প্রতিষ্ঠানের পরপর ১০টি চালান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে পরবর্তী চালান পরীক্ষার বাইরে রাখার সুযোগ ছিল। এখন সেই সংখ্যা পাঁচটিতে নামিয়ে আনার নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ চলছে। অর্থাৎ পাঁচটি চালান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে পরবর্তী চালান ছাড়ের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করে পরীক্ষা ছাড়াই বাজারজাতের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া আগে শুক্র ও শনিবার দাপ্তরিক কার্যক্রম বন্ধ থাকত। এখন আমদানি পণ্যের ছাড়পত্র দ্রুত দেওয়ার জন্য ছুটির দিনেও দায়িত্ব পালন করা হচ্ছে। এর ফলে মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের সময় ও ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আমাদের সময় : এবারের প্রতিপাদ্যে সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তায় মান নিয়ন্ত্রণ কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
কাজী ইমদাদুল হক : জ্বালানি নিরাপত্তা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকট থেকে আমরা এর গুরুত্ব বুঝতে পারছি। সৌরবিদ্যুৎ, বায়োগ্যাসসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হলে সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির মান নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিকভাবে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সপ্তম লক্ষ্যটি সাশ্রয়ী ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি নিশ্চিত করার বিষয়ে। বিশ্ব মান দিবসের এবারের প্রতিপাদ্যও সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে নির্ধারণ করা হয়েছে। মানসম্মত সৌর প্যানেল, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও জ্বালানিসংশ্লিষ্ট পণ্য ব্যবহারের মাধ্যমে অপচয় কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।
আমাদের সময় : বিএসটিআইয়ের পরীক্ষাগার ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কতটা আধুনিক? নতুন পরীক্ষাগার স্থাপনের কোনো পরিকল্পনা আছে কি?
কাজী ইমদাদুল হক : বিএসটিআইয়ের পরীক্ষাগারগুলোতে বিশ্বমানের অনেক যন্ত্রপাতি রয়েছে। এসব যন্ত্রপাতির বড় অংশ উন্নত দেশ থেকে সংগ্রহ করা হয়। তবে আমাদের কাজের পরিধি বিবেচনায় আরও যন্ত্রপাতি ও পরীক্ষাগার প্রয়োজন। সব ধরনের পণ্য পরীক্ষার জন্য সব যন্ত্রপাতি দরকার হয় না; আমাদের দেশে যেসব পণ্য উৎপাদিত হয় এবং যেসব পণ্যের পরীক্ষা করতে হয়, সেগুলোর চাহিদা অনুযায়ী সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এ লক্ষ্যে একটি বড় প্রকল্পের কাজ চলছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ১৩ তলা ভবনে ৬৩টি কেমিক্যাল ও ফিজিক্যাল পরীক্ষাগার স্থাপন করা হবে। এ ছাড়া নতুন ১০টি জেলায় পরীক্ষাগার স্থাপনের আরেকটি প্রকল্প নিয়েও কাজ চলছে।
আমাদের সময় : বিশ্ব মান দিবসে সাধারণ ভোক্তা ও উদ্যোক্তাদের প্রতি আপনার বার্তা কী?
কাজী ইমদাদুল হক : ভেজাল ও নিম্নমানের পণ্য প্রতিরোধে ভোক্তাদের সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাজার থেকে প্যাকেটজাত পণ্য কেনার সময় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নাম, পণ্যের লেবেল, মানচিহ্ন এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বিএসটিআইয়ের সনদচিহ্ন দেখে কেনা উচিত। কোনো পণ্যে বিদেশি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলে সেটিকে বিদেশে উৎপাদিত পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়। যেমন বাংলাদেশে তৈরি কোনো এসিতে ‘মেড ইন জাপান’ লেখা হলে সেটি ভোক্তাকে বিভ্রান্ত করতে পারে। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও উৎপাদনের প্রকৃত পরিচয় স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন। সৎ উদ্যোক্তাদের সুরক্ষা দেওয়া এবং নিম্নমানের পণ্য উৎপাদনকারীদের আইনের আওতায় আনা— দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভোক্তা, উদ্যোক্তা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা সম্মিলিতভাবে কাজ করলেই দেশে মানসম্মত পণ্যের বাজার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
