ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ করেছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা ঠেকাতে নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতার বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবিতে গত শনিবার তেল আবিবে এ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।
গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর ইসরায়েলে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া প্রথম সাধারণ নির্বাচনের তিন দিন আগে তেল আবিবের ‘হোস্টেজ স্কয়ার’ বা বন্দিদের চত্বরে বিক্ষোভকারীরা সমবেত হন। ‘অক্টোবর কাউন্সিল’ নামের একটি গোষ্ঠী এ সমাবেশের আয়োজন করে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় অপহৃত ব্যক্তিদের পরিবার নিয়ে গঠিত এই সংগঠনটি হামলা প্রতিরোধে সরকারের ব্যর্থতার জন্য জবাবদিহি দাবি করছে।
সমাবেশের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে অক্টোবর কাউন্সিল জানায়, নির্বাচনের তিন দিন আগে তারা তিন বছরের সংগ্রামের চূড়ান্ত পর্যায়ের আয়োজন করছে। তাদের লক্ষ্য সত্য উন্মোচন, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং একটি রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠন।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির অন্যান্য স্থানেও সরকারবিরোধী বিক্ষোভের জন্য মানুষ জড়ো হন।
তেল আবিবের সমাবেশে বিরোধী দলগুলোর শীর্ষ নেতারা অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ইয়াশার দলের গাডি আইজেনকোট, যিনি নেতানিয়াহুর প্রধান মধ্য-ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পরিচিত। দ্য টাইমস অব ইসরায়েলের তথ্য অনুযায়ী, সমাবেশে আইজেনকোটকে স্বাগত জানিয়ে বিক্ষোভকারীরা ‘কে আসছেন? পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী!’ স্লোগান দেন। ডেমোক্র্যাটস দলের নেতা ইয়াইর গোলানও সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন।
ইসরায়েলি নাগরিক ও আইনজীবী ড্যান আদিন এক্সে দেওয়া পোস্টে বিক্ষোভে বিপুল মানুষের উপস্থিতির কথা জানান। তিনি লেখেন, ডেমোক্র্যাটস দলের মিছিলে রবিন স্কয়ার থেকে হোস্টেজ স্কয়ার পর্যন্ত মানুষের ঢল নেমেছে। তাঁর ভাষায়, এই সমাবেশ পরিবর্তন, আশা ও বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।
মঙ্গলবারের নির্বাচন সামনে রেখে প্রকাশিত জনমত জরিপগুলোতে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ২০২২ সালের শেষ দিক থেকে ক্ষমতায় থাকা নেতানিয়াহুর ডানপন্থি জোট এবং আইজেনকোটের জোট প্রায় সমানে সমান অবস্থানে রয়েছে। কোনো জোটই ইসরায়েলের পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের ক্ষেত্রেও নির্বাচনটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, আইজেনকোট প্রধানমন্ত্রী হলে তেহরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরুর বিষয়ে তুলনামূলক কম আগ্রহী হতে পারেন। তবে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতাসহ পররাষ্ট্রনীতির বেশ কিছু বিষয়ে ইসরায়েলের প্রধান রাজনৈতিক দল ও নেতাদের মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে।
বিক্ষোভের আগে অক্টোবর কাউন্সিল আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সতর্ক করে জানায়, সরকারপন্থি কিছু পক্ষ সমাবেশে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড চালাতে পারে। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে সংগঠনটি জানায়, এ বিষয়ে তারা পুলিশ কমিশনারের কাছে জরুরি চিঠি পাঠিয়েছে। ক্ষমতাসীন জোটের সঙ্গে যুক্ত কিছু পক্ষ ওই রাতের সমাবেশে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
অক্টোবর কাউন্সিলের মূল দাবি, ৭ অক্টোবরের হামলা প্রতিরোধে ব্যর্থতার জন্য দায়ী ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
তবে নেতানিয়াহুর জোট সরকার একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। এর পরিবর্তে সরকার একটি রাজনৈতিক কমিশন গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, কমিশনের অর্ধেক সদস্য নিয়োগ করবে সরকার এবং বাকি অর্ধেক নিয়োগ করবেন বিরোধী দলের আইনপ্রণেতারা। বিরোধী নেতারা জানিয়েছেন, রাজনীতিবিদদের মাধ্যমে গঠিত এমন কমিশন তারা বয়কট করবেন।
ইরানে নতুন হামলার প্রস্তুতি ইসরায়েলের?
ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনার পরিবর্তে দেশটির বিরুদ্ধে নতুন করে পূর্ণমাত্রার সামরিক হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল- সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বলে মনে করছেন এক বিশ্লেষক। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ইসরায়েল সফর এবং অঞ্চলটির কিছু কূটনৈতিক স্থাপনা ও সামরিক ঘাঁটি থেকে লোকজন সরিয়ে নেওয়ার খবর নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা বাড়িয়েছে।
কাতারের দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরি আল-জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। তার মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে আরেক দফা সামরিক অভিযান চালানোর দিকে এগোচ্ছে।
দোহা থেকে আল-জাজিরাকে এলমাসরি বলেন, ‘অনেক সংকেত ও শক্তি প্রদর্শন দেখা যাচ্ছে, যা থেকে মনে হচ্ছে, আমরা আরেক দফা লড়াইয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।’ তার ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সম্প্রতি ইসরায়েল সফর করেছেন। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে তৃতীয় একটি বিমানবাহী রণতরি পাঠাচ্ছে ওয়াশিংটন। পাশাপাশি অঞ্চলটির কিছু কূটনৈতিক স্থাপনা ও সামরিক ঘাঁটি থেকে মার্কিন কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার খবরও পাওয়া যাচ্ছে।
এলমাসরি বলেন, ‘এসব ঘটনাই ইঙ্গিত দেয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল শিগগিরই- হয়তো খুব শিগগিরই- ইরানের ওপর আরেক দফা হামলার পরিকল্পনা করছে।’ তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল নতুন হামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে কি না, সে বিষয়ে কোনও নিশ্চিত তথ্য তিনি উপস্থাপন করেননি। তার বক্তব্য মূলত সাম্প্রতিক সামরিক ও কূটনৈতিক তৎপরতার ভিত্তিতে করা মূল্যায়ন।
নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে তা আগের সংঘাতের চেয়েও বিপজ্জনক ও ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন এলমাসরি।তিনি বলেন, ‘আশঙ্কার একটি দিক হলো, এবারের লড়াই আগের দফার চেয়েও বেশি বিপজ্জনক ও ভয়াবহ হতে পারে।’
