জীবিকার জন্য তিনি কুলিগিরি করেছেন, হয়েছেন বাসের কন্ডাক্টর; আজ তিনি চারশ কোটি রূপির মালিক। ভারতের তামিল সিনেমার মহাতারকা তিনি।
তাকে স্বজাতিরা বলেন ‘থালাইভা’, যার অর্থ গুরু। তিনি রজনীকান্ত।
তবুও জীবনের সংগ্রাম পর্বের কথা স্মৃতি থেকে ম্লান হয়ে যাক, তা তিনি চান না।
বৃহস্পতিবার মুক্তি পেতে চলেছে, নেলসন দিলীপকুমার পরিচালিত রজনীকান্ত অভিনীত সিনেমা ‘জেলার ২’। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, সিনেমার মুক্তির আগে এক বিশেষ ‘সুপার শো’-এর আয়োজন করেছিলেন নির্মাতারা।
সেই অনুষ্ঠানে সিনেমার কলাকুশলীদের সঙ্গে নানা বিষয়ে কথা বলেন রজনীকান্ত ও নেলসন। সেখানেই অভিনেতার বিনয়ী স্বভাবের রহস্য জানতে চান পরিচালক। উত্তরে রজনীকান্ত জানান, আজও তার বাস কন্ডাক্টরের চাকরির কথা মনে পড়ে।
অনুষ্ঠানে রজনীকান্তকে প্রশ্ন করেন পরিচালক, তার এই বিনয় কি সহজাত, নাকি অন্যদের কথা ভেবে নিজেকে সেভাবে ধরে রাখেন তিনি।
রজনীকান্ত বলেন, “দেখুন, আমি তারকা হলেও অভিনয়টা করতে খুব ভালবাসি। কিন্তু তার চেয়েও বেশি ভালো লাগত, কন্ডাক্টরের কাজ করতে। পাঁচ বছর বাস কন্ডাক্টরের চাকরি করেছি। আজও সেই কাজের কথা মনে পড়ে। সত্যিই ভীষণ মনে পড়ে। নিজেকে কখনও তারকা বলে ভাবতে পারিনি।”
তিনি আরও বলেন, “এই তারকাখ্যাতি, যশ, প্রতিপত্তি- সবই ঠিক আছে। কিন্তু সত্যি বলতে, নিজেকে কন্ডাক্টর হিসেবে ভাবতেই বেশি ভালো লাগে। সেই কারণে প্রায়ই বেঙ্গালুরু যাই। কন্ডাক্টরদের নানা ধরনের মানুষের সঙ্গে মিশতে হয়। আমিও নিজেকে বাস কন্ডাক্টর হিসেবেই দেখি। তাই আমার মত একজন বাস কন্ডাক্টর আপনার মত বড় ব্যক্তিত্বের সামনে আর কী ভাবেই বা আচরণ করবে?”
রজনীকান্তের কথা শুনে হেসে ফেলেন নেলসন। সিনেমার কলাকুশলীরা হাততালি দিয়ে তাকে উৎসাহ দেন।
নেলসন বলেন, “স্যার, আমি জানতাম আপনি এমনই কিছু একটা বলবেন।”
রজনীকান্তের জন্ম মারাঠি পরিবারে ১৯৫০ সালের ১২ ডিসেম্বর। বাবা রামোজি রাও গায়কোয়াড় ছিলেন পুলিশ কন্সটেবল আর মা জীজাবাঈ ছিলেন গৃহিনী। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে রজনীকান্ত ছিলেন সবার ছোট।
পারিবারিক অস্বচ্ছলতার কারণে কুলি, দিনমজুর, অফিস বয় ও বাস কন্ডাক্টরের মত কাজও করতে হয়েছে রজনীকান্তকে। তবে তার বাসে টিকেট ও খুচরা ফেরত দেওয়ার ভঙ্গি এতই জনপ্রিয় ছিল যে যাত্রীরা তার জন্য বাসের ভেতরে অপেক্ষা করতেন।
পাশাপাশি পাড়ার নাটকেও রজনীকান্ত চালিয়ে যেতেন শখের অভিনয়। পরবর্তীতে এক বন্ধুর সহায়তায় মাদ্রাজ ফিল্ম স্কুলে অভিনয়ের উপর প্রশিক্ষণ নেন রজনীকান্ত। সেখান থেকেই নজরে পড়েন সে সময়ের খ্যাতিমান পরিচালক কে. বালাচরণের। বালাচন্দর তাকে নতুন নাম দেন-রজনীকান্ত।
১৯৭৫ সালে কে. বালাচরণের ‘অপূর্ব রাগাঙ্গল’ সিনেমার মাধ্যমে তামিল সিনেমায় অভিষেক ঘটে ‘থালাইভা’ খ্যাত রজনীকান্তের। প্রথম সিনেমাতেই রজনীকান্তকে লুফে নেন দর্শকরা। প্রথম দিকে খ্যাতিমান অভিনেতা কমল হাসানের সঙ্গী হিসেবেই সিনেমাতে দেখা গেছে তাকে।
অত্যাচারিত কৃষক, দিনমজুর ও কুলিসহ বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি শক্ত জায়গা করে নিয়েছেন দর্শকের মনে। কে বালাচন্দর বলেছিলেন, রজনীকান্ত তার সংলাপ বলার ধারা দিয়ে নিজেকে প্রচলিত নিয়মের বাইরে নিয়ে যেতে পেরেছেন। তীক্ষ্ণ ভঙ্গিতে ছোট ছোট সংলাপ আর ক্যামেরার কাছে কথা বলার স্টাইল তাকে অনন্য করেছে।
পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে তামিল, হিন্দি ও তেলেগু মিলিয়ে ১৭৫টির বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন রজনীকান্ত। এক সময় এই অভিনেতার সিনেমা মুক্তির দিনে দক্ষিণে রাজ্যে রাজ্যে ছুটি ঘোষণা করা হত।
রজনীকান্ত তার পর্দার রূপকে বাস্তবে টেনে আনেন না। তিনি জনসমক্ষে হাজির হন মেকআপ ছাড়া। তখন তার মাথায় পরচুলা থাকে না, পরনে থাকে সাধারণ পোশাক।
ভারতীয় সিনেমায় অসামান্য অবদানের জন্য ভারত সরকার ২০০০ সালে পদ্মভূষণ, ২০১৬ সালে পদ্মবিভূষণ এবং ২০১৯ সালে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে ভূষিত করেছে তাকে।
রাজনীকান্ত দক্ষিণের 'থালাইভা' হলেন যেভাবে
