বাঁকানো লাল ঠোঁট, ঘাড়ে কালো দাগ আর চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। দেখতে অনেকটা চেনা সবুজ টিয়ার মতোই। তবে পালকের রং সবুজ নয়, তাতে ছড়িয়ে আছে বেগুনি আভা। রাজধানীর মিরপুরের শাহআলী মাজার এলাকায় প্রতি শুক্রবার বসে পোষা প্রাণীর হাট। ২ অক্টোবর এই হাটে এমন এক জোড়া টিয়ার দাম চাওয়া হয়েছিল ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা।
পাখি দুটির নাম রিংনেক ভায়োলেট। সাধারণ রিংনেকের সঙ্গে চেহারায় তেমন পার্থক্য নেই, তবে পালকের রঙের কারণেই এদের আলাদা কদর। বিশেষ রঙের এই পাখির দাম কেন এত বেশি? এর পেছনে রয়েছে জিনগত বৈচিত্র্য, বাছাই করা প্রজনন, বাজারে সীমিত সরবরাহ ও আমদানির বিধিনিষেধ।
সবুজ থেকে বেগুনি
রিংনেক প্যারাকিটের স্বাভাবিক রং সবুজ। তবে জিনগত বৈচিত্র্যের কারণে এদের পালকে ভিন্ন রং দেখা যায়। সেই বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে বাছাই করা প্রজননের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে নানা রঙের রিংনেক। ভায়োলেট তেমনই একটি ধরন।
পোষা পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন বিশেষজ্ঞ আ ন ম আমিনুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, রিংনেক ভায়োলেট হলো রিংনেক প্যারাকিটের একটি মিউটেশন। বাছাই করা প্রজননের মাধ্যমে লুটিনো, ব্লু ভায়োলেট, অ্যালবিনো, ক্লিয়ারফেস, বাটার কাপসহ নানা রঙের রিংনেক পাওয়া যায়।

আ ন ম আমিনুর রহমান বলেন, রিংনেকের বিভিন্ন রঙের পাখি একসময় পাকিস্তান ও ভারত থেকে বাংলাদেশে এসেছে। এখন দেশেও এসব রঙের পাখির প্রজনন করা হচ্ছে।
রিংনেক প্যারাকিট বছরে সর্বোচ্চ তিনবার পর্যন্ত প্রজনন করতে পারে। প্রতিবার চার থেকে ছয়টি ডিম দেয়। বাচ্চা ফোটার হার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বাছাই করা প্রজননে তৈরি হয় ভিন্ন রং
টিয়া পাখির পালকের রঙের জিনগত কারণ নিয়ে ২০২৫ সালে স্প্রিঙ্গার নেচারের কমিউনিকেশনস বায়োলজি সাময়িকীতে একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়। ‘মাল্টিপল মিউটেশনস ইন পলিকেটাইড সিন্থেস লেড টু ডিসরাপশন অব সিটাকোফুলভিন প্রোডাকশন অ্যাক্রস ডাইভার্স প্যারট স্পিসিজ’ শীর্ষক গবেষণায় বিভিন্ন প্রজাতির টিয়ার পালকে রঙের বৈচিত্র্য তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
গবেষণাটিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন ইসরায়েলের বেন-গুরিয়ন ইউনিভার্সিটির লাইফ সায়েন্সেস বিভাগের শতদ্রু ঘোষ রায় ও উড়ি আবদু এবং চেক প্রজাতন্ত্রের চার্লস ইউনিভার্সিটির ফিলোসফি অ্যান্ড হিস্ট্রোরি অব সায়েন্স বিভাগের ইনড্রিখ ব্রেখা। তাঁদের সঙ্গে সহযোগী হিসেবে আরও আটজন গবেষক আছেন।
গবেষণায় বলা হয়েছে, টিয়ার পালকে হলুদ, লাল ও গোলাপি রং তৈরিতে ‘পিকেএস’ নামের একটি এনজাইম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই এনজাইমের কার্যক্রমে জিনগত পরিবর্তনের প্রভাব পড়লে রং তৈরির প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসতে পারে। এর ফলে পালকের রঙেও ভিন্নতা দেখা দেয়।
বাছাই করা প্রজননের ক্ষেত্রে প্রজননকারীরা সরাসরি পাখির জিনে পরিবর্তন আনেন না। বরং আগে থেকেই বিশেষ রঙের বৈশিষ্ট্য রয়েছে, এমন পাখি বেছে নিয়ে প্রজনন করান। এরপর বাচ্চাদের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্যযুক্ত পাখি বেছে নিয়ে আবার প্রজনন করানো হয়। কয়েক প্রজন্ম ধরে এ প্রক্রিয়া চালিয়ে গেলে নির্দিষ্ট রঙের পাখির একটি প্রজননধারা তৈরি হতে পারে।
সহজভাবে বললে, প্রকৃতিতে পাখির মধ্যে থাকা জিনগত বৈচিত্র্য থেকেই রঙের ভিন্নতা আসে। প্রজননকারীরা সেই বৈশিষ্ট্যের পাখি বেছে নিয়ে বারবার প্রজনন করান। এভাবেই সাধারণ সবুজ রিংনেকের পাশাপাশি নীল, বেগুনি ও অন্য রঙের পাখি পাওয়া যায়। তবে প্রতিবার প্রজননে একই রঙের বাচ্চা পাওয়া নিশ্চিত নয়।
সরবরাহ কম, দাম বেশি
মিরপুরের পোষা প্রাণীর হাটে এক জোড়া রিংনেক ভায়োলেটের দাম চাওয়া হয়েছিল ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা। রাজধানীর কাটাবনের পোষা প্রাণীর বাজারেও এই রঙের পাখির এক জোড়ার দাম দেড় থেকে দুই লাখ টাকা পাওয়া গেছে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, শুধু ভায়োলেট নয়, রিংনেকের আরও কিছু বিরল রঙের পাখির দাম বেশি। ভায়োলেটের মধ্যে ‘অপালাইন’ ধরনের কিছু পাখির এক জোড়ার দাম বাংলাদেশে চার থেকে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
তাঁদের ভাষ্য, প্রজননকারীদের চাহিদা অনুযায়ী রঙের পাখি পাওয়া সব সময় সহজ নয়। একই জোড়া পাখির বাচ্চাদের মধ্যেও রঙের পার্থক্য থাকতে পারে। ফলে কাঙ্ক্ষিত রঙের পাখি কম পাওয়া গেলে দাম বেড়ে যায়। আবার বাজারে একই রঙের পাখির সরবরাহ বাড়লে দাম কমে যায়।
রিংনেক প্যারাকিট বছরে সর্বোচ্চ তিনবার পর্যন্ত প্রজনন করতে পারে। প্রতিবার চার থেকে ছয়টি ডিম দেয়। বাচ্চা ফোটার হার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। আর দাম বাড়ার পেছনে মূলত এর কম প্রাপ্যতা ও দেশে বৈধভাবে আমদানির সুযোগ না থাকা কাজ করছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কাটাবনের পাখি ব্যবসায়ী মাহমুদুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, পাঁচ বছর আগেও এক জোড়া ভায়োলেট রিংনেকের সর্বোচ্চ দাম ছিল ৬০ থেকে ৮০ হাজার টাকা। বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ায় ধীরে ধীরে দাম বেড়েছে। এখন এক জোড়া পাখির দাম দুই লাখ থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত উঠেছে।
আমদানিতে বাধা বৈজ্ঞানিক নাম
রিংনেক ভায়োলেটের মতো ভিন্ন রঙের পাখির দাম বাড়ার পেছনে দেশে বৈধভাবে আমদানির সুযোগ না থাকাও একটি কারণ। বন বিভাগ বলছে, বাংলাদেশে রিংনেক প্যারাকিটের সবুজ রঙের পাখি রয়েছে। বনের পাখি ও খাঁচায় পালা রিংনেকের বৈজ্ঞানিক নাম একই হওয়ায় বর্তমানে এই পাখি আমদানির অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না।
বন অধিদপ্তরের বন সংরক্ষক মো. ছানাউল্যা পাটওয়ারী প্রথম আলোকে বলেন, রিংনেক ভায়োলেটের মতো ভিন্ন রঙের পাখিগুলো রিংনেক প্যারাকিটেরই মিউট্যান্ট ভ্যারাইটি। এগুলো পোষা অবৈধ নয়। তবে বৈজ্ঞানিক নাম একই হওয়ায় আমদানির অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না।
বিষয়টি নিয়ে বৈজ্ঞানিক কমিটিতে আলোচনা করা হবে; কমিটি অনুমোদন দিলে আমদানির সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন ছানাউল্যা পাটওয়ারী।

বনের টিয়া আর খাঁচার টিয়া এক নয়
বাংলাদেশে টিয়া ও টিয়াঠোঁটি গোত্রের আটটি প্রজাতির তথ্য রয়েছে প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএনের লাল তালিকায়।
এগুলো হলো সবুজ টিয়া বা গোলাপিকণ্ঠী টিয়া, চন্দনা টিয়া, মদনা টিয়া, মেটেমাথা টিয়া, ফুলমাথা টিয়া, লালমাথা বা হীরামন টিয়া, বাসন্তী লটকন টিয়া ও কালোবুক টিয়াঠোঁটি।
এসব প্রজাতির মধ্যে মেটেমাথা টিয়া বাংলাদেশে বিপন্ন, ফুলমাথা টিয়া প্রায় বিপন্ন এবং কালোবুক টিয়াঠোঁটি বাংলাদেশ থেকে আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত হিসেবে তালিকাভুক্ত।
বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী, দেশীয় এসব টিয়া ধরা, কেনাবেচা ও বাসায় পোষার ক্ষেত্রে আইনি নিষেধাজ্ঞা আছে।
তবে বন বিভাগের ভাষ্য, খাঁচায় পালা রিংনেক ভায়োলেটের মতো রঙের পাখি পোষা অবৈধ নয়।
রিংনেক ভায়োলেটের দাম নির্ভর করছে মূলত পালকের বিশেষ রং, প্রজননের মাধ্যমে সেই রং পাওয়ার সুযোগ এবং বাজারে পাখিটির প্রাপ্যতার ওপর। দেশে বৈধভাবে আমদানির সুযোগ না থাকায় সরবরাহ বাড়ানোর পথও সীমিত। এ কারণে সাধারণ সবুজ টিয়ার মতো দেখতে হলেও খাঁচায় পোষার জন্য পালকের বেগুনি আভার এই শখের পাখির এক জোড়া কিনতে ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে দুই লাখ টাকার বেশি।
