আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দপ্তর ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বাসভবন থাকা সত্ত্বেও রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা অপরাধের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি এবং জমি দখলের মতো ঘটনা নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৫-এর কার্যালয়ের আওতাধীন এই এলাকায় এক অস্ট্রিয়া প্রবাসী যুবকের দুটি আইফোন ছিনতাই ও এক বাবা-ছেলেকে গুলি করে জখম করার ঘটনা স্থানীয়দের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কার্যকারিতাকে মারাত্মক প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
থানা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই, আগস্ট এবং সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসে মোহাম্মদপুর থানায় ২৯০টি মামলা হয়েছে এবং ১ হাজার ১৫৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া ডিএমপির অন্যান্য অভিযানে আরও প্রায় ১ হাজার ৫০ জনকে আটক ও বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। বিপুলসংখ্যক মামলা ও গ্রেপ্তারের পরও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কোনো কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না আসায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মোহাম্মদপুরের অপরাধজগৎ মূলত তিন স্তরের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। প্রথম স্তরে বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসীরা দেশের সহযোগীদের মাধ্যমে চক্রটি পরিচালনা করে। দ্বিতীয় স্তরে দেশের ভেতরে থাকা কিছু প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তি এই চক্রকে সুরক্ষা দেন। আর তৃতীয় স্তরে মাঠপর্যায়ের সন্ত্রাসীরা ছিনতাই ও চাদাবাজির মতো অপরাধ সংঘটন করে অর্জিত অর্থের একটি অংশ বিদেশে পাঠিয়ে দেয়। মাঠপর্যায়ের অপরাধীরা মাঝেমধ্যে গ্রেপ্তার হলেও মূল পরিকল্পনাকারী ও নেপথ্যের হোতারা সব সময়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
জমি ও প্লট দখল নিয়ে উদ্বেগ
মোহাম্মদপুরে জমি ও প্লট দখলের অভিযোগও দীর্ঘদিনের। স্থানীয়দের দাবি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভয়ভীতি প্রদর্শন, সন্ত্রাসী তৎপরতা ও অস্ত্রের হুমকি দিয়ে সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও ক্ষতিগ্রস্তদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
প্রশ্নের মুখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি
একাধিক প্রশাসনিক কার্যালয় ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতির পরও মোহাম্মদপুরে অপরাধের অভিযোগ অব্যাহত থাকায় অপরাধ প্রতিরোধের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, এত মামলা, অভিযান ও গ্রেপ্তারের পরও কেন ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও সংঘবদ্ধ অপরাধের অভিযোগ থামছে না? অপরাধচক্রের অর্থদাতা ও নির্দেশদাতাদের শনাক্ত করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে? সাধারণ মানুষের নিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাই বা কী?
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, শুধু মাঠপর্যায়ের অপরাধীদের নয়, নেপথ্যের পরিকল্পনাকারী, অর্থের জোগানদাতা ও আশ্রয়দাতাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।
এই অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক জানান, মোহাম্মদপুরে দীর্ঘদিন ধরে অপরাধের পরিসংখ্যান ভয়াবহ এবং এখানকার অপরাধ পরিস্থিতি বারবার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। পর্যাপ্ত সরকারি দপ্তর ও ভিআইপিদের বাসস্থান থাকার পরও ধারাবাহিক ও কঠোর আইনের প্রয়োগের ঘাটতির কারণে অপরাধ দমন করা যাচ্ছে না। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্যের সঙ্গে অপরাধীদের আর্থিক ভাগবাটোয়ারা এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আড়ালে থেকে সুরক্ষার বিষয়টি অপরাধকে আরও উসকে দিচ্ছে।
ড. তৌহিদুল হক মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পকে একটি ‘বিষফোড়া’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, অভিযানের আগাম খবর অপরাধীদের কাছে পৌঁছে যাওয়া এবং মামলা হালকা করে সাজানোর কারণে অপরাধীরা সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে। এমনকি আদালত পর্যায়ে ‘জামিন বাণিজ্যের’ ঘটনাও ঘটছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য তিনি অপরাধীদের রাজনৈতিক আশ্রয় বন্ধ করা, আর্থিক লেনদেনে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা এবং অপরাধ দমনে পৃথক অভিযান ও জোরদার গোয়েন্দা নজরদারির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে বিশাল এই এলাকার আইনশৃঙ্খলার স্বার্থে মোহাম্মদপুরে একাধিক থানা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।