অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, যোগাযোগ ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সেইসাথে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের মতো চ্যালেঞ্জ এবং নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বাংলাদেশের মানুষের অর্জিত সক্ষমতা ও একটি উন্নত ভবিষ্যৎ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে ২০০৪ সালের ২৫ অক্টোবর নয়া দিগন্তের প্রথম সংখ্যার প্রধান শিরোনাম করা হয়েছিল–‘বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ’।
আজ নয়া দিগন্তের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রতিবেদনটি পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো—
বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ
মাসুমুর রহমান খলিলী
নিরন্তর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এ পরিবর্তন আবহাওয়া ও পরিবেশে। পরিবর্তন ঘটেছে অর্থনীতিতে, সমাজ উন্নয়নে। রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও নির্বাচন পদ্ধতিতেও এসেছে পরিবর্তন। সমাজ সংস্কৃতিও এক স্থানে থেমে নেই। আইন-শৃঙ্খলা মূল্যবোধ চেতনারও পরিবর্তন এসেছে। এ নিরন্তর পরিবর্তনের সবকিছু ইতিবাচক ধারায় ঘটেছে এমন বলা যাবে না। তবে দীর্ঘ প্রায় সাড়ে ৩ দশকে রাষ্ট্রিক জীবনে বাংলাদেশ অনেক শক্তি সঞ্চার করেছে। বিপর্যয়ে পড়লেও ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি অর্জন করেছে। নানা বিষয়ে হতাশা নৈরাশের মধ্যেও স্বপ্ন দেখার আশাবাদ এনে দিয়েছে দেশের মানুষের সামনে।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশ। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ হিসেবে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে এগোতে হয় স্বাধীনতা উত্তরকালে। '৭৫-এর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর রাজনৈতিক ব্যবস্থাতেও অস্থিরতা দেখা দেয়। নানা রাজনৈতিক টানাপড়েণের মধ্যদিয়ে '৯০'র দশকের শুরুতে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আসে স্থিতিশীলতা। নির্বাচনের মতো গণতন্ত্রের অতীব প্রয়োজনীয় যে প্রতিষ্ঠান জনগণের আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল তা আবার শক্তি ফিরে পায়। ক্ষমতা পরিবর্তনের শান্তিপূর্ণ উপায় হিসেবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু হয় সাংবিধানিকভাবে। এ পদ্ধতির মাধ্যমে পর পর তিনটি আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশে। রাজনৈতিক ব্যবস্থার এ উন্নয়ন তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য কম নয়।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ একটি অপূর্ব শক্তি অর্জন করেছে। সেটি হলো ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা। সাগর- তীরবর্তী ও নদী অববাহিকার দ্বীপ দেশ হিসেবে নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হানে বাংলাদেশে। বন্যা, সাইক্লোন, টর্নেডো, অনেক সময় খরা-নিঃস্ব করে দেয় দেশের মানুষকে। এ নিঃস্ব অবস্থা থেকে আবার ঘুরে দাঁড়ায় তারা।
৩৫ বছর আগে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু গড় আয় ছিল ১০০ ডলারের নিচে। সে আয় এখন সাড়ে ৪০০ ডলার। মালয়েশিয়া বা দক্ষিণ কোরিয়াসহ যেসব দেশ এক সময় বাংলাদেশের মতো ছিল তারা অনেক দূর এগিয়ে এখন মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। সে সাফল্য বাংলাদেশ নানা কারণে পায়নি, তবে এ দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি অন্য অনেক দেশের চেয়ে ভালো। সাধারণভাবে শুধু ডলারের হিসাবে বাংলাদেশের মানুষের আয় বেড়েছে এমন নয়। একই সাথে সম ক্রয়ক্ষমতা হিসেবে মাথাপিছু আয়ের যে হিসাব করা হয় তাতেও এ দেশের মানুষের আয় বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ডলারের যে ক্রয়ক্ষমতা তার সাথে তুলনা করা হলে বাংলাদেশের মানুষের গড় মাথাপিছু আয় ২ হাজার ডলারের কাছাকাছি।
শুধু মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যেমন এগিয়েছে তেমনিভাবে অর্থনীতির অন্যান্য সূচকেও তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি এসেছে। দেশের অর্থনীতির আকার বেড়েছে। ইউরোপ-আমেরিকার চেইন শপগুলোতে স্থান করে নেয়ার মতো পণ্য রপ্তানি করছে বাংলাদেশ। বৈদেশিক বাণিজ্য, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ফোরামে বাংলাদেশ পরিচিতি পেয়েছে। বাজেটের বিদেশ নির্ভরতা কমেছে। গত অর্থবছরে ৫০ হাজার কোটি টাকার বাজেট বাস্তবায়ন করতে বিদেশ থেকে ঋণ নিতে হয়েছে ২ হাজার কোটি টাকা। সামষ্টিক ক্ষেত্রে অর্থনীতির এ অগ্রগতি ব্যক্তি জীবনেও দেখা যায়। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও অনেক এগিয়েছে। সাধারণ গার্মেন্টস শ্রমিক অথবা শ্রমজীবী কৃষি বা শিল্প মজুর, নগর-মহানগরের রিকশাচালক, যাদের খালি গায়ে, ছেঁড়া জামায় শ্রম বিক্রি করতে দেখা যেত, তাদের সে অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। সাধারণভাবে ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে অভ্যন্তরীণ বাজার বড় হয়েছে। নানা শিল্প গড়ে উঠেছে অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে কেন্দ্র করে।
সামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশ বিস্ময়কর অগ্রগতি অর্জন করেছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে যেখানে 'বাস্কেট কেস' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল সেই বাংলাদেশকে অনুসরণ করে আফ্রিকান দেশগুলোকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনান। ৩০ বছর আজও এ দেশের মানুষের গড় আয়ু যেখানে ৪০ বছরের কোঠায় ছিল তা এখন ৬০ পেরিয়ে গেছে। শিশু মৃত্যুর হার, সাক্ষরতা, স্কুলে ভর্তি, বিশুদ্ধ খাবার পানির প্রাপ্তি, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার ব্যবহার, মাথাপিছু জ্বালানি ব্যবহার, মাথাপিছু ফোন বা মোবাইল—এমন বিবেচনায় ৩ দশকে ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে।
আবহাওয়ানির্ভর বাংলাদেশের কৃষি জাপান-ভিয়েতনামের মতো উন্নতি করতে পারেনি; তবে ৩০ বছর আগে ৭ কোটি মানুষের জন্য যে খাদ্য ঘাটতি ছিল এখন জনসংখ্যা দ্বিগুণ হওয়ার পরও সে ঘাটতি শেষ হয়ে স্বনির্ভরতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট 'সুপার রাইস' গবেষণায় অনেক দূর এগিয়েছে। এ ক্ষেত্রে সাফল্য বাংলাদেশকে চাল রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করতে পারে। মৎস্য ও পশুপালন খাতেও বাংলাদেশ পিছিয়ে নেই। ভেতরে ভেতরে মৎস্য চাষে বিপ্লব এসেছে। প্রায় সারা বছর ৬০/৭০ টাকা কেজিতে মুরগি পাওয়া যায়। চাল বা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পেলেও ডলারে হিসাব করলে দামের বড় ধরনের হেরফের দেখা যায় না। মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে অনেক তবে তা মূলত টাকার চলতি মূল্যে। এ কারণে সম ক্রয়ক্ষমতা অনুপাতে আয় ডলারের নামমাত্র হিসাবের চেয়ে বেশি বেড়েছে।
আবহাওয়া ও পরিবেশেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে গত সাড়ে ৩ দশকে। এ পরিবর্তন অবশ্য বিশ্ব আবহাওয়া পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। আবহাওয়া উত্তপ্ত হওয়ার ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠ স্ফীত হচ্ছে। বন্যা, সাইক্লোনসহ দুর্যোগ বাড়ছে। এ দুর্যোগ দেশের অর্থনীতি, সাধারণ জনমানুষের উপার্জন ক্ষমতার ওপর আঘাত হানছে। তবে একই সাথে দেশের মানুষ অর্জন করছে আঘাত সামলে ওঠার ক্ষমতা। বন্যার মতো দুর্যোগ যেমন আনে ভোগান্তি তেমনি পলি বয়ে এনে মাটির উর্বরতা শক্তি বাড়ায়। খাদ্যশস্য উৎপাদন এতে বাড়ছে টেকসইভাবে।
সাড়ে ৩ দশকে সমাজও সংস্কৃতিতে পরিবর্তন এসেছে। এক সময় গ্রামের পর গ্রামে শিক্ষিত মানুষ পাওয়া ছিল অনেক ক্ষেত্রে ভাগের ব্যাপার। এখন ঘরে ঘরে শিক্ষিত মানুষ পাওয়া যায়। শিক্ষার সাথে সাথে উন্নত সংস্কৃতিরও বিকাশ হচ্ছে। টেলিভিশনের সাদা-কালো যুগ থেকে রঙিন টেলিভিশন, আরও পরে স্যাটেলাইট যুগ এসেছে সংস্কৃতি ক্ষেত্রে। সংস্কৃতির এ খোলা দরজায় সবকিছু ভালো এসেছে এমন নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে অবক্ষয় ও অপসংস্কৃতি দোরগোড়ায় পৌঁছেছে। তবে প্রযুক্তি মঙ্গল জয়ের শক্তি যেমন মুঠোয় আনে, তেমনি পারমাণবিক ধ্বংসের ক্ষমতাও আয়ত্তে এনে দেয়। একইভাবে বাংলাদেশের সংস্কৃতির রূপান্তরে দুটিই আমরা পেয়েছি।
যোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তিতেও বিস্ময়কর পরিবর্তন এসেছে। কয়েক দশক ধরে স্থির টেলিফোন যেখানে ৫ লাখের নিচে ছিল সেখানে মাত্র এক দশকে মোবাইল ফোনের সংযোগ ৩০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যে ৫ মিনিট কথা বলতে আগে যেখানে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা প্রয়োজন হতো এখন তা সারা যায় ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। কম্পিউটার প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তৃতি ঘটেছে দেশে। এর প্রভাব সার্বিক জীবনযাত্রায়ও পড়ছে।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতেও পরিবর্তন এসেছে গত সাড়ে ৩ দশকে। এ পরিবর্তন ঘটেছে নেতিবাচকভাবে। এই একটি ক্ষেত্রের নেতিবাচক পরিবর্তন অনেক ক্ষেত্রের অগ্রগতিকে রুদ্ধ করছে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, খুন-খারাবি অনেক বেড়েছে। স্বাধীনতা উত্তর অস্থির সময় বাদ দেয়া হলে বাংলাদেশের ১০০ বছরের ইতিহাসে এ ধরনের অবনতিশীল আইন-শৃঙ্খলার প্রবণতা দেখা যায় না। তবে বিভিন্ন সময় এই অবনতির গতি রোধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। কখনও চেষ্টা ফলপ্রসূ হয়েছে, কখনও হয়নি।
এত কিছুর পরও বাংলাদেশের মানুষ কি স্বপ্ন দেখতে পারে না এক উন্নত ভবিষ্যতের। এ প্রশ্ন আজ অনেকের। এই জিজ্ঞাসার ইতিবাচক জবাবই এগিয়ে নিতে পারে এ দেশের মানুষকে, এ দেশ- এ ভূখণ্ডকে।
