খন্দকার মোহাম্মদ আলী বাবু, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি:
সম্প্রতি শুধু নয়, অতীতের বাস্তবতার চিত্রেও দেশের সাধারণ মানুষ গভীর বেদনা, আবেগ ও অনুভূতির মধ্য দিয়ে নানা অভিজ্ঞতা উপলব্ধি করেছেন। মানুষের মনের গভীরে জমে থাকা আত্মচিৎকার ও নীরব কান্না যেন গোপনে চোখের জলে ভাসিয়ে দিচ্ছে তাদের জীবন। কিন্তু কী সেই আত্মচিৎকার, যার শব্দ তথাকথিত রাজনৈতিক নেতাদের কানে পৌঁছায় না? নাকি নেতাদের পাশে থাকা ‘জি হুজুর’ বলা ব্যক্তিরাই সেই আর্তনাদ তাদের কানে পৌঁছাতে দেন না?
এই চিত্র যে শুধু সাম্প্রতিক সময়ের, তা নয়। যুগ যুগ ধরে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক ব্যক্তিদের চারপাশের বাস্তবতায় একই চিত্র পরিলক্ষিত হয়ে আসছে।
ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক ব্যক্তিরা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে বসার পর অনেক সময় এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েন যে এলাকার সেবাপ্রত্যাশী সাধারণ মানুষের খোঁজখবর নেওয়ার প্রয়োজনও অনুভব করেন না। একদিকে তাঁরা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ব্যস্ত থাকেন, অন্যদিকে তাঁদের চারপাশে থাকা দলীয় সহযোগীদের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানোর নানা তৎপরতা নিয়ে সময় কাটান। এ ছাড়া আত্মীয়স্বজন ও সৌখিন বন্ধুবান্ধবের চাওয়া-পাওয়া পূরণ করাও যেন অনেকের কাছে নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়ে পরিণত হয়।
অথচ তাঁরা ভুলে যান, যাঁদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় জনসেবার দায়িত্ব পালনের সুযোগ পান, সেই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করাই তাঁদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেই চেয়ারে বসেই শাসন, শোষণ ও নির্যাতনের পথ তৈরি করা হয়। নিজস্ব অনুসারী বা ক্যাডার বাহিনীর মাধ্যমে নিজেদের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানোর চেষ্টা করা হয়। ক্ষমতার অপব্যবহার করে কেউ কেউ নানা অনিয়ম ও অপরাধের সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁদের অনেককে নিজেদের কর্মকাণ্ডের পরিণতির মুখোমুখি হতে হয়।
উন্নয়ন অনুসন্ধান ফাউন্ডেশনের মফস্বল পর্যায়ের স্বেচ্ছাসেবীদের তথ্য ও ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এসব বিষয় অনুসন্ধানে উঠে আসছে বলে জানাযায়,সমাজে উল্লেখযোগ্য অবদান না রেখেও ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠা কিছু রাজনৈতিক নেতার কর্মকাণ্ডের পরিণতির বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সাধারণ মানুষ পরিস্থিতি বুঝে ওঠার আগেই তাঁদের জীবনে নতুন সংকটের সূচনা হয়। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, আইন ও অপরাধের জটিলতায় জড়িয়ে পড়ে অনেক মানুষ। এরপর নিজেদের জীবন ও নিরাপত্তা রক্ষার তাগিদে সংশ্লিষ্ট নেতাদের রক্ষায়ও তাঁদের প্রস্তুত হতে হয় বলে সাধারন মানুষের আলোচনায় উঠে আসে।
চিরাচরিত এমন দৃশ্য আর কতকাল দেখবেন সাধারণ খেটে খাওয়া অসহায় মানুষ? জ্ঞানী ও সচেতন মহলের কাছেও কি এর কোনো কার্যকর সমাধান নেই, যার মাধ্যমে ভুক্তভোগীরা সঠিক পথের সন্ধান পাবেন?
এলাকার সচেতন মহল জানান,রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় রাজনৈতিক নেতাদের জন্য বিভিন্ন সাংবিধানিক অধিকার ও সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত মানুষেরা সংবিধানে স্বীকৃত অধিকার বাস্তবে কতটা ভোগ করতে পারছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। সরকারের পরিবর্তন হয়, নেতার পরিবর্তন হয়, কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রত্যাশিত চাওয়া-পাওয়ার কতটা পূরণ হয়, সেই প্রশ্নের উত্তর অনেক ক্ষেত্রেই অধরা থেকে যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ভুক্তভোগী জানান,
ক্ষণস্থায়ী এই জীবনে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা যেন চাতক পাখির মতো এক ফোঁটা জলের আশায় আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা পিপাসার্ত প্রাণের প্রতিচ্ছবি। বাংলার ভূখণ্ডে অসংখ্য অসহায় মানুষ নানা সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তাঁদের প্রত্যাশা, অধিকার ও প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
রাজনৈতিক স্বার্থ, ভুল সিদ্ধান্ত ও পারস্পরিক প্রতিহিংসার প্রভাবেও সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন বলে অভিযোগ রয়েছে। তারপরও গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা রেখে, নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আশায় তাঁরা অপেক্ষা করেন। সরকার আসে, সরকার যায়; ক্ষমতার পালাবদল ঘটে, কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনে প্রত্যাশিত পরিবর্তন কতটা আসে, সেটিই আজ বড় প্রশ্ন।
দেশের ১৮ কোটি মানুষের জন্য প্রতিবেদকের প্রত্যাশা, গণতন্ত্র যেন কেবল ভোটাধিকার প্রয়োগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে। রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধা, ন্যায়বিচার, মৌলিক অধিকার ও জনসেবার সুফল যেন সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছায়। কারণ, গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি সাধারণ মানুষ। তাঁদের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত হলেই গণতন্ত্রের প্রকৃত তাৎপর্য প্রতিষ্ঠিত হবে।
এ জাতীয় আরো খবর..
