বাংলাদেশে আইনজীবী হওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩৫ বছর বয়সসীমা নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ বিষয়ে গত মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) ঘোষণা দেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। একই উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলও। ২০৩০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকরের প্রাথমিক পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।
আইনপেশার মান ও মর্যাদা রক্ষা এবং অনিয়ম প্রতিরোধে নেওয়া এ উদ্যোগ নিয়ে বিচারাঙ্গনের আইনজীবীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও কেউ মনে করেন, বয়সসীমা নির্ধারণের পরিবর্তে বার কাউন্সিলের পরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সংস্কার জরুরি। আবার কারও কারও মতে, পেশায় প্রবেশের বয়স নির্ধারণ করা হলে অবসরের বয়সও নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন
আইনজীবী হিসেবে পেশায় প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩৫ বছর নির্ধারণের উদ্যোগের পর আইনপেশা থেকে অবসরের বয়সসীমা নিয়েও আলোচনা সামনে এসেছে।
আইনজীবীদের একাংশের মতে, নির্দিষ্ট বয়সের পর শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা কমে আসায় অনেকের পক্ষে সক্রিয়ভাবে পেশায় যুক্ত থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু অবসরের নির্দিষ্ট বয়স ও সুবিধার ব্যবস্থা না থাকায় পেশা ছাড়ার পর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে ওঠে।
বিজ্ঞাপন
সিদ্ধান্ত নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩৫ বছর নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল। গত ১৯ আগস্ট বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় এ সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। সিদ্ধান্তটি ২০৩০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) এ তথ্য নিশ্চিত করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ও বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান রুহুল কুদ্দুস কাজল।
বয়সসীমা নির্ধারণের কারণ ব্যাখ্যা করে রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, সিদ্ধান্তটি শুধু আইনজীবীদের স্বার্থে নয়, দেশের স্বার্থেও নেওয়া হয়েছে। তার দাবি, বিভিন্ন বয়সের মানুষ আইনপেশায় প্রবেশ করায় আইনাঙ্গনে ‘টাউট’ শ্রেণির মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।
তিনি বলেন, অন্য পেশায় বিভিন্ন অভিজ্ঞতা অর্জনের পর কেউ কেউ ৫০ থেকে ৫৫ বছর বয়সে আইনপেশায় আসেন। তাদের মধ্যে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিরাও রয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, আইনপেশা কী দুর্নীতিবাজদের ডাম্পিং স্টেশন?
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন এমপি ১৪ অক্টোবর সাংবাদিকদের জানান, গত ১৯ আগস্ট এ বিষয়ে কোনো সভা হয়নি।
জয়নুল আবেদীন বলেন, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ১৫ সদস্যের একটি সংস্থা। অ্যাটর্নি জেনারেল পদাধিকারবলে এর চেয়ারম্যান হলেও নীতিনির্ধারণী বিষয়ে তার ভোটাধিকার নেই। নির্বাচিত ১৪ সদস্যের ভোটে ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। নির্বাচিত সদস্যদের ভোটাধিকার রয়েছে এবং ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি তাদের নেতৃত্ব দেন।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, বার কাউন্সিলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সারাদেশের আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রতিবছর সংস্থাটির একটি বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বার কাউন্সিলের নির্বাচিত ও পদাধিকারবলে সদস্যদের পাশাপাশি দেশের সব আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক অংশ নেন। তবে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণের বিষয়ে এ ধরনের কোনো সভা হয়নি। তার ভাষ্য, বার কাউন্সিলও এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
বয়সসীমা নির্ধারণ নিয়ে আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে জয়নুল আবেদীন বলেন, আইনমন্ত্রী সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য দিতে পারেন। তবে সেই বক্তব্য কীভাবে নেওয়া হবে, তা দেশের আইনজীবীরাই নির্ধারণ করবেন।
তিনি বলেন, বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের মতামতের ভিত্তিতে কোনো আইন পাস হবে না। বয়সসীমা নির্ধারণের বিষয়ে আইন প্রণীত হওয়ার পর এ নিয়ে মন্তব্য করা যাবে। বর্তমানে বিষয়টি কোনো আইনে পরিণত হয়নি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যানের বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) বলেন, চেয়ারম্যানের দেওয়া তথ্য ভাইস চেয়ারম্যান অস্বীকার করেছেন।
তাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আপনারা যে কোনো কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই মন্তব্য করে ফেলেন কেন যে সমন্বয় নেই?’
তিনি বলেন, ‘আমাদের একজন সিনিয়র ব্যক্তি, যিনি বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান, তিনি একটি বক্তব্য দিয়েছেন। আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বার কাউন্সিলের গৃহীত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আমি আপনাদের তথ্যভিত্তিক বক্তব্য দিয়েছি। যদি আপনাদের মনে হয়, আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আমার বক্তব্যের সঙ্গে কোনো ধরনের বৈপরীত্য রয়েছে, তাহলে আপনারা চাইলে ওই কমিটির উপস্থিত অন্য সদস্যদেরও সাক্ষাৎকার নিতে পারেন। আমাকে বিব্রত করার চেষ্টা করছেন কেন?’
বিজ্ঞাপন
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন একজন সিনিয়র ব্যক্তি। তিনি বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান। তিনি আমাদের সম্মানিত ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। কোন প্রেক্ষাপটে তিনি একটি বক্তব্য দিয়েছেন, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, ‘আমি আপনাদের যে বিষয়টি বলেছি, এর পাশাপাশি তিনি আইনজীবীদের পেশাগত মানোন্নয়নে কী করা উচিত এবং তরুণ আইনজীবীদের করণীয় সম্পর্কে অনেক উপদেশমূলক কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, তরুণ আইনজীবীদের অন্তত ১০ বছর একটি চেম্বারে থেকে কাজ করা উচিত। পেশাগত উন্নয়ন নিয়ে তিনি আরও অনেক পরামর্শ দিয়েছেন। এসব উপদেশমূলক বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতেই হয়তো তিনি ওই কথাটি বলেছেন।
বিজ্ঞাপন
ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘একটি বক্তব্যকে বিচ্ছিন্নভাবে বিবেচনা করে আমাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা রয়েছে— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কোনো সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না। বার কাউন্সিলের কমিটির বৈঠকে কী সিদ্ধান্ত হবে, আর কী হবে না, তা ওই বৈঠকের নিয়মিত প্রক্রিয়ারই অংশ।’
আইনজ্ঞদের প্রতিক্রিয়া
জানা যায়, বাংলাদেশসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে প্রণীত আইন ও আইনি কাঠামোর প্রভাব রয়েছে। সময়ের সঙ্গে এসব আইনের অনেক ক্ষেত্রে সংশোধন ও পরিবর্তন আনা হলেও আইনজীবী হিসেবে পেশাগত জীবন শুরু করার সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণের বিষয়টি নির্ধারণ করা হয়নি।
প্রতিবেশী দেশ ভারতে একসময় বার কাউন্সিল আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৪৫ বছর বয়সসীমা নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছিল। এ সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করা হলে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বয়সসীমা আরোপের বিষয়টি পর্যালোচনা করে এবং সংশ্লিষ্ট বিধান বাতিলের নির্দেশ দেয়। এ ধরনের বয়সসীমা পেশা পরিবর্তন করে আইনপেশায় আসতে ইচ্ছুক ব্যক্তি ও অবসরপ্রাপ্তদের জন্য বৈষম্য সৃষ্টি করতে পারে—এমন যুক্তিও এ বিতর্কে উঠে আসে। পাকিস্তানেও আইনপেশায় প্রবেশের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
একইভাবে, কোনো কোনো আইনজীবীর মতে, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আইনপেশায় প্রবেশের জন্য সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারিত নেই। যুক্তরাজ্যে সলিসিটর হিসেবে যোগ্যতা অর্জনের জন্য সলিসিটর কোয়ালিফিকেশন এক্সামিনেশন (এসকিউই) এবং ব্যারিস্টার হওয়ার প্রশিক্ষণ ও যোগ্যতা অর্জনের ক্ষেত্রেও সাধারণভাবে কোনো সর্বোচ্চ বয়সসীমা নেই।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক জাগো নিউজকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বিচারকদের অবসরের কোনো বয়স নেই। তবে, কেউ আগে অবসরে যেতে চাইলে কোনো বাধা নেই। তিনি বলেন, ১৯৭৪ সালে কোনো পেশায় অবসরে যাওয়ার সময় তুলে দেওয়া হয়েছে।
‘উন্নত বিশ্বে চাকরিতে প্রবেশ কিংবা অবসরের কোনো বয়স বেঁধে দেওয়া নেই। আইনপেশায় তো প্রশ্নই আসে না’ বলেন শাহদীন মালিক। তবে, উন্নত বিশ্বে কিছু পেশায় শারীরিক যোগ্যতার অংশ হিসেবে বয়সকে বিবেচনা করা হয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বাংলাদেশের আইনপেশার যুক্ত হওয়ার জন্য বয়স নির্ধারণ করা বৈষম্য তৈরি হতে পারে বলে মতামত দেন। তিনি বলেন, যদিও বার কাউন্সিল বয়স নির্ধারণের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটি এখনো বাস্তবায়ন করা হয়নি। দুদিন হলো মাত্র আলোচনায় এসেছে। আগে বাস্তবায়ন হোক, তারপর দেখা যাবে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইলিয়াস আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, একজন ব্যাংকার একজন সেনা কর্মকর্তা অবসরের পর কেন আইনপেশার জন্য বার কাউন্সিলের সনদ নিয়ে তার অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারবেন না। ৩৫ বছর সনদের বয়স করা ঠিক হবে না। কারণ বিশ্বের অনেক দেশেই চাকরিতে যোগদানের বয়স থাকলেও অবসরের কোনো বয়স নেই।
ইলিয়াস আহমেদ বলেন, বার কাউন্সিলের কল্যাণ তহবিল (বেনাবোলেন ফান্ড) থেকে আইনজীবীদের আজীবন ৫০ শতাংশ বা নির্দিষ্ট কোনো সুবিধা দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত এখনো নেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, জমানো অর্থ জীবিত অবস্থায় তোলার সুযোগ নেই, কেবল মৃত্যুর পর পরিবার তা পেয়ে থাকে, ফলে জীবনধারণ ও রুজি-রোজগারের জন্য সুস্থ থাকা পর্যন্ত প্র্যাকটিস চালিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।
লাইফটাইম ভাতা বা আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলেই কেবল প্র্যাকটিস করার জন্য একটি নির্দিষ্ট বয়সসীমা নির্ধারণ করা যুক্তিযুক্ত হবে। শারীরিক ও মানসিকভাবে সক্ষম থাকা পর্যন্ত কোর্টে বা ইন-হাউজ চেম্বারে প্র্যাকটিস চালিয়ে যাওয়াই আইনজীবীদের একমাত্র পথ বলে মতামত দেন তিনি।
আইনপেশায় প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ করা হলে অবসরের বয়সসীমাও নির্ধারণ করা উচিত বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী খাদেমুল ইসলাম। তার মতে, আইনজীবীদের সর্বোচ্চ ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত পেশায় নিয়োজিত থাকার সুযোগ রাখা যেতে পারে। এতে পেশাগত জীবনের শেষে তারা প্রাপ্য সুবিধাসহ অবসরে যেতে পারবেন।
খাদেমুল ইসলাম বলেন, অবসরের বয়সসীমা না থাকায় অনেক আইনজীবী জীবনের শেষ পর্যায়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হন। বিশেষ করে অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে যারা নিয়মিত পেশায় যুক্ত থাকতে পারেন না, তাদের পক্ষে আইনজীবীদের বেনাভোলেন্ট ফান্ডে নিয়মিত চাঁদা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। চাঁদা বকেয়া থাকায় তারা ডিফল্টার হিসেবে বিবেচিত হন। ফলে তাদের সন্তানরাও ওই তহবিল থেকে অর্থ তুলতে পারেন না।
তার মতে, আইনজীবীদের অবসরের বয়স নির্ধারণ করা হলে পেশাগত জীবনের শেষে আর্থিক সুবিধা নিয়ে অবসরে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। ৭৫ বছর বয়সসীমা দেশের মানুষের গড় আয়ুর সঙ্গেও সংগতিপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এম আশরাফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩৫ বছর নির্ধারণের উদ্যোগকে তিনি শতভাগ সমর্থন করেন। তার মতে, আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন এবং পেশাদার আইনজীবী হওয়া সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। আইনপেশার মান, আদালতের শৃঙ্খলা, পেশাগত আচরণবিধি ও শিষ্টাচার বজায় রাখতে এ ধরনের বয়সসীমা ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি বলেন, আইনপেশায় প্রবেশের ক্ষেত্রে শুধু ডিগ্রি নয়, পেশাগত দক্ষতা, নিষ্ঠা ও মানসিক প্রস্তুতিও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাজ্যের ব্যারিস্টারি পেশার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সেখানে পেশাগত যোগ্যতা অর্জন ও তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়মকানুন রয়েছে। তাই আইন বিষয়ে ডিগ্রি থাকলেই যে কোনো সময় পেশাদার আইনজীবী হওয়ার সুযোগ থাকবে, এমনটি নয়।
তবে ৩৫ বছরের বয়সসীমা তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর না করে ২০৩৫ সাল থেকে চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন ব্যারিস্টার এম আশরাফুল ইসলাম। তিনি বলেন, এতে বর্তমানে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করছেন বা আইনজীবী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন— এমন ব্যক্তিরা নিজেদের ক্যারিয়ার গুছিয়ে নেওয়ার পর্যাপ্ত সময় পাবেন। একই সঙ্গে আইনপেশার মানোন্নয়নের উদ্যোগ বাস্তবায়নেও তা সহায়ক হবে।
তার মতে, প্রস্তাবিত এ অন্তর্বর্তী সময়ের ব্যবস্থা চালু করা হলে নতুন নিয়মের কারণে সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্তদের স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব হবে এবং দেশের বিচারব্যবস্থা ও আইন পেশার শৃঙ্খলা বজায় রাখার উদ্যোগও কার্যকর হবে।
মানবাধিকারবিষয়ক সংগঠন রাইজ ফর রাইটস ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. বাহাউদ্দিন আল ইমরান আইনজীবীদের সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তার মতে, বয়সসীমা ৩৫ বছরের পরিবর্তে ৪০ বছর করা যেতে পারে।
বাহাউদ্দিন আল ইমরান বলেন, আইনজীবীদের অবসরের বয়স ও সুবিধা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অবসরের সুবিধা দেওয়ার পর আইনজীবীদের আইনবিষয়ক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুযোগ রাখা যেতে পারে।
আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণের সুপারিশ করে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের লিগ্যাল এডুকেশন কমিটি। ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ২৫৩/২০১৪ নম্বর সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপিলের প্রেক্ষাপটে এ বিষয়ে যৌক্তিক বয়সসীমা নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে কমিটি।
কমিটির মতে, আইন পেশার মর্যাদা ও দক্ষতা বৃদ্ধি, দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা এবং পেশাকে আরও গতিশীল রাখার জন্য আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ করা সমীচীন। পরে কমিটির প্রস্তাব ও সুপারিশ বার কাউন্সিলের সভায় উপস্থাপন করা হলে সদস্যরা ৩৫ বছরকে সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণের বিষয়ে একমত হন।
বর্তমানে বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার অ্যান্ড বার কাউন্সিল অর্ডার, ১৯৭২-এর ২৭(১)(খ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আইন পেশায় প্রবেশের ন্যূনতম বয়স ২১ বছর। অন্যদিকে, বাংলাদেশের সংবিধানে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা নির্ধারিত থাকলেও অ্যাটর্নি জেনারেলসহ আইনজীবীদের অবসরের জন্য আইনে নির্দিষ্ট কোনো বয়সসীমা নেই।
আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণের সিদ্ধান্তের ফলে পেশায় প্রবেশের বয়স নিয়ে নতুন নিয়ম আসছে। একই সঙ্গে পেশাগত জীবনের শেষ পর্যায়ে আইনজীবীদের আর্থিক নিরাপত্তা, বেনাভোলেন্ট ফান্ডের সুবিধা এবং অবসরের পর আইন-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়গুলোও আলোচনায় এসেছে।
এফএইচ/এমএএইচ/ এমএফএ
ফলো করুন
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়।
