অ্যাজিলিটি রোবোটিকসের মানবসদৃশ রোবট ডিজিট-ফাইভ (Humanoid Robot Digit 5) নিজেই চার্জিং কেব্ল খুলতে পারে, বসা অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়াতে পারে এবং নিজে নিজেই দাঁড়ানোর পর কাজের জন্য প্রস্তুত বলে সংকেত দিতে পারে। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির মতো এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানুষের সাহায্য ছাড়াই রোবটটি তার কাজের পালার জন্য প্রস্তুতি নিতে পারে।
ডিজিটের উচ্চতা ১ দশমিক ৭৫ মিটার এবং ওজন ৬৫ কেজি। এটি সর্বোচ্চ ১৬ কেজি ওজন বহন করতে পারে, ঘণ্টায় প্রায় ৫ কিলোমিটার গতিতে হাঁটতে পারে এবং একবার চার্জে কয়েক ঘণ্টা কাজ করতে পারে। গুদাম ও পণ্য পরিবহন-সংক্রান্ত কার্যক্রমের জন্য এটি তৈরি করা হয়েছে। সেখানে মানুষের পাশাপাশি কাজ করে বারবার করতে হয়—এমন কাজগুলো সামলাতে পারে রোবটটি।
তবে রোবটটির চার্জিং পোর্টের নকশা নিয়ে হাস্যরস তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি ডিজিট-ফাইভ এর ছবি এবং ভিডিও দাবি করা পোস্ট সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ছড়িয়ে পড়া ছবি এবং ভিডিওতে দেখা যায়, চার্জিং কেবল খুলতে রোবটটিকে অস্বস্তিকর ভঙ্গিতে অবস্থান নিতে হয়। তা নিয়ে অনেকে মজা করছেন।
প্রযুক্তিটি চমকপ্রদ হলেও চার্জিংয়ের এই অস্বাভাবিক ব্যবস্থা দেখে নেটিজেনরা প্রশ্ন তুলেছেন— ‘এমন নকশায় অনুমোদন দিয়েছিল কে!’
‘ডিজিট-ফাইভ’ কী?
মার্কিন রোবটিক্স কোম্পানি অ্যাজিলিটি রোবোটিকস (Agility Robotics) তার হিউম্যানয়েড বা মানবাকৃতির রোবট Digit-এর নতুন সংস্করণ ডিজিট-ফাইভ সম্প্রতি উন্মোচন করা হয়। কোম্পানির দাবি, এই রোবট গুদাম ও কারখানায় মানুষের পাশে নিরাপদে কাজ করতে সক্ষম এবং সাধারণত প্রয়োজন হয় এমন নিরাপত্তা-বেষ্টনী ছাড়াই কাজ করতে পারবে।
ওরেগনের সেলেমভিত্তিক কোম্পানিটি বলছে, ডিজিট-ফাইভ হলো বড় পরিসরে মানুষের সঙ্গে ‘সহযোগিতামূলকভাবে নিরাপদ’ কাজের জন্য তৈরি তাদের প্রথম হিউম্যানয়েড রোবট। রোবটটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) এবং একাধিক সেন্সর ব্যবহার করে কাছাকাছি মানুষকে শনাক্ত করে। পরিস্থিতি বুঝে এটি মানুষকে এড়িয়ে চলে, থামে কিংবা বসে পড়ে। কেউ খুব কাছে এলে আলাদা নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রোবটের প্রতিক্রিয়া সক্রিয় করে।
আগের মডেলের চেয়ে বেশি সক্ষম
কোম্পানির তথ্যমতে, ডিজিট-ফাইভ সর্বোচ্চ ৫০ পাউন্ড বা প্রায় ২৩ কেজি ওজন তুলতে পারে, যা আগের সংস্করণ ডিজিট-ফোর (Digit 4)-এর চেয়ে ৪০ শতাংশ বেশি। এটি ৭ দশমিক ২ ফুট উচ্চতার বস্তু পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যেখানে আগের মডেলের সক্ষমতা ছিল ৫ দশমিক ৫ ফুট।
নতুন ব্যাটারিটি ৯০ মিনিট চলে এবং মাত্র ৯ মিনিটে রিচার্জ হয়। অ্যাজিলিটির দাবি, এতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ২০ ঘণ্টার বেশি কাজ করা সম্ভব। বিভিন্ন কাজের প্রয়োজন অনুযায়ী রোবটের গ্রিপারও বদলানো যাবে।
গুদামের বহু কাজ করবে
ডিজিট-ফোর মূলত টোট বা পণ্যবাহী বাক্স স্থানান্তরের কাজ করেছে। কোম্পানি জানায়, GXO, Schaeffler, Amazon ও টয়োটার কানাডীয় উৎপাদন শাখার মতো গ্রাহকদের কাছে এটি ৬৫ হাজার ঘণ্টার বেশি কাজ করেছে।
অ্যাজিলিটি বলছে, ডিজিট-ফাইভ গুদাম বা কারখানার আরও বেশি কাজ করতে পারবে। যেমন, প্যালেট খালি করা, যন্ত্রের দেখভাল, যন্ত্রাংশ সংগ্রহ, পণ্য পরীক্ষা এবং পাঠানোর আগে সেগুলো প্যালেটে সাজানো।
বড় অর্ডার, তবে আর্থিক ঝুঁকি
মে মাস পর্যন্ত ডিজিট-ফাইভ-এর জন্য নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে ৩০ কোটি ডলারের বেশি বহুবর্ষমেয়াদি অর্ডার রয়েছে বলে জানিয়েছে অ্যাজিলিটি। কোম্পানির SEC-এ জমা দেয়া দলিল অনুযায়ী, একটি গ্রাহক তিন বছরে ১,০০০টি রোবট নেবে। তবে গ্রাহকের নাম প্রকাশ করা হয়নি।
একই সঙ্গে কোম্পানির আর্থিক ঝুঁকির চিত্রও সামনে এসেছে। ২০২৫ সালে অ্যাজিলিটি-র নিট বিক্রয় ছিল ১৭.৮ লাখ ডলার, কিন্তু পরিচালন কার্যক্রমে ক্ষতি দ্বিগুণ হয়ে ১৪ কোটি ২০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। কোম্পানির নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান Grant Thornton তাদের প্রতিবেদনে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহের কথা উল্লেখ করেছে।
তবে অ্যাজিলিটি বলছে, চলমান SPAC মার্জার থেকে শেয়ারহোল্ডারদের শেয়ার ফেরত নেওয়ার আগেই ৬২ কোটি ডলারের বেশি নগদ তহবিল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই তহবিল কোম্পানির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে।
‘ডিজিট-ফাইভ’কখন পাওয়া যাবে?
ডিজিট-ফাইভ-এর প্রাথমিক ব্যবহার শুরু হতে পারে ২০২৭ সালের প্রথমার্ধে। ওই বছরের শেষ নাগাদ এটি সাধারণভাবে বাজারে পাওয়া যাবে বলে প্রত্যাশা করছে কোম্পানি। রোবটগুলো তৈরি হবে সেলেমের RoboFab কারখানায়, যার বার্ষিক উৎপাদন লক্ষ্য ১০ হাজার রোবট।
অ্যাজিলিটির প্রতিযোগীদের মধ্যে রয়েছে Boston Dynamics, Tesla, Apptronik, Figure AI ও 1X Technologies। কোম্পানিটি বলছে, এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই বড় বিনিয়োগ পেয়েছে; ফলে হিউম্যানয়েড রোবটের বাজারে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হতে চলেছে।
তথ্যসূত্র: গিকওয়্যার, পিআর নিউজওয়্যার, অ্যাজিলিটি রোবোটিকস
