জালালাবাদ রিপোর্ট: দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজারে অস্থিরতা কাটছে না| বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দামে কোথাও কোথাও সিলিন্ডার পাওয়া গেলেও দেশের বিভিন্ন জেলায় অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে| ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য এক হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা থাকলেও ক্রেতাদের কাছ থেকে দুই হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে| এতে প্রতিটি সিলিন্ডারে ২৬০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে ভোক্তাদের| এমন অস্থিরতার কারণে সীমিত আয়ের মানুষ প্রচণ্ড রকম কষ্টে আছে| বাড়তি দামের কারণে অসন্তোষ বাড়ছে ভোক্তাদের মধ্যে|
দীর্ঘদিন ধরে এলপিজির বাজারে একটি প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বা সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অভিযোগ রয়েছে| আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় ও সরবরাহ সংকটের কথা বলে বিভিন্ন সময়ে খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে| অথচ দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিইআরসির নির্ধারিত মূল্য অনুসরণ করা হচ্ছে কিনা, তা নিশ্চিত করতে কার্যকর নজরদারির ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে| ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার মূল্য নির্ধারণের সিদ্ধান্ত থাকলেও বাস্তবে তার সুফল পাচ্ছেন না সাধারণ ভোক্তারা|
এলপিজির বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সম্প্রতি জ্বালানি বিভাগ থেকে সব জেলার জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) বাজার তদারকি করে প্রতিবেদন পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়| চলতি মাসের ৮ তারিখে দেশের অনেকগুলো জেলা থেকে জেলা প্রশাসকদের পাঠানো তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে| জ্বালানি বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ডিসিদের রিপোর্টগুলোতে বিভিন্ন এলাকায় নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রির চিত্র উঠে এসেছে| কোনো কোনো জেলায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হলেও বাজারে অতিরিক্ত দাম আদায়ের প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি|
জরিমানা করেও নিয়ন্ত্রণে আসছে না : অতিরিক্ত দামে এলপিজি বিক্রি বন্ধ করতে বিভিন্ন জেলায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে| তবে এত অভিযান ও জরিমানার পরও বাজারে নির্ধারিত দাম নিশ্চিত না হওয়ায় তদারকির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে| যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত নজরদারি, সরবরাহব্যবস্থা যাচাই এবং পুনরাবৃত্ত অপরাধের ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে|
মূল্য নির্ধারণেই সীমাবদ্ধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা : এলপিজির বাজারে বিইআরসির ভূমিকা নিয়েও অসন্তোষ বাড়ছে| সংস্থাটি প্রতি মাসে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এলপিজির মূল্য নির্ধারণ করে| কিন্তু নির্ধারিত মূল্য বাস্তবে কার্যকর না হলে সেই সিদ্ধান্তের সুফল ভোক্তাদের কাছে পৌঁছায় না| বাজারে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি অর্থ আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকায় মূল্য নির্ধারণের পাশাপাশি তা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে|
বাজারের এই পরিস্থিতিতে বিইআরসি, জ্বালানি বিভাগ, জেলা প্রশাসন এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মধ্যে সমšি^ত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে| শুধু অভিযান পরিচালনা বা জরিমানা আদায় নয়, আমদানিকারক থেকে শুরু করে পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে মূল্য ও মজুদের তথ্য যাচাই করা জরুরি| পাশাপাশি কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অবৈধ মজুদ এবং অতিরিক্ত মুনাফার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তও প্রয়োজন|
এ বিষয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান মো. জালাল আহমদে বলেন, বিইআরসি আমদানিকারকদের আমদানি সংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই করে দেশের অভ্যন্তরে একটি ন্যায্য দাম নির্ধারই করে| তবে পুরো বাজার মনিটর করার মতো লোকবল বিইআরসির নাই|
তিনি বলেন, সরকার-নির্ধারিত দামে বিক্রি করা না হলে সেগুলো তদারকি এবং শাস্তি জরিমানা করবে জেলা প্রশাসন| তিনি আরও বলেন, তবে বিইআরসির নিজ¯^ লোকজনও আগামীকাল (আজ) থেকে বাজার তদারকি করবে বলে তিনি জানান| চেয়ারম্যান আরও বলেন, কিছুদিন বাড়তি দামে বিক্রি করা হলেও আমাদের কাছে খবর এসেছে ক্রমš^য়ে দাম কমে আসছে| এ ছাড়া প্রতিনিয়ত শিল্প কারখানায় এলপিজি ব্যবহার বাড়ছে বলে বাজারে সরবরাহ কম থাকতে পারে বলেন মন্তব্য করেন চেয়ারম্যান|
ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ : রান্নার কাজে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল বিপুলসংখ্যক পরিবারকে বাড়তি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে| নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েক শ টাকা বেশি খরচ হওয়ায় সীমিত আয়ের পরিবারগুলো বাড়তি ব্যয়ের চাপে পড়েছে| একই সঙ্গে হোটেল-রেস্তোরাঁ, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যবহারকারীর পরিচালন ব্যয়েও চাপ ˆতরি হচ্ছে|
এলপিজির বাজারে এই অস্থিরতা দূর করতে এখন বড় প্রশ্ন— নির্ধারিত মূল্য ঘোষণা ও বিচ্ছিন্ন অভিযানেই কি দায়িত্ব শেষ হবে, নাকি আমদানি থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থায় কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হবে| জেলা প্রশাসনের প্রতিবেদনেই যখন বিভিন্ন এলাকায় অতিরিক্ত দামে বিক্রির তথ্য উঠে এসেছে, তখন বাজার তদারকিকে আরও কার্যকর করে ভোক্তার কাছে নির্ধারিত দামে এলপিজি পৌঁছে দেওয়াই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রধান চ্যালেঞ্জ|
