ঠিক কত সালে এ আয়োজনের সূচনা, তার কোনো দালিলিক প্রমাণ নেই। তবে স্থানীয় প্রবীণদের মতে, আড়াইশ বছরেরও বেশি পুরনো এ ঐতিহ্য।
পৌষসংক্রান্তি এলেই গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার বিনিরাইল গ্রামে বইতে শুরু করে অন্য রকম এক উৎসবের হাওয়া। গ্রামটির শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী এ আয়োজন সাধারণ মানুষের কাছে ‘জামাই মেলা’ বা মাছের মেলা নামেই বেশি পরিচিত। প্রায় আড়াইশ বছরের পুরনো এ কৃষ্টি ও সংস্কৃতি শুধু বেচাকেনার আয়োজন নয়, বরং গ্রামবাংলার মানুষের যুগ যুগ ধরে বয়ে চলা এক জীবন্ত ঐতিহ্য।
ঠিক কত সালে এ আয়োজনের সূচনা, তার কোনো দালিলিক প্রমাণ নেই। তবে স্থানীয় প্রবীণদের মতে, আড়াইশ বছরেরও বেশি পুরনো এ ঐতিহ্য। পৌষসংক্রান্তি ও মকরসংক্রান্তিকে ঘিরে জামাইদের শ্বশুরবাড়িতে নিমন্ত্রণ ও মাছ উপহার দেয়ার রেওয়াজ থেকে বড় মাছ কেনার প্রতিযোগিতার প্রচলন। এ থেকেই পরিচিতি পায় ‘জামাই মেলা’ নামে।
প্রতি বছর পৌষ মাসের শেষ দিন ৩০ পৌষ বসে এ আয়োজন। তিন শতাধিক মাছের দোকানের পাশাপাশি থাকে ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির পসরা। কিশোরগঞ্জ, ভৈরব, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা বড় বড় মাছ নিয়ে আসেন।
এখানে মাছের অন্যতম আকর্ষণ চিতল, বাগাড়, বোয়াল, রুই, কাতল, আইড় ও কালিবাউশ। কোনো কোনো মাছের ওজন হয় ২০-৫০ কেজি পর্যন্ত। দামও ওঠে বেশ চড়া। হাজার থেকে শুরু করে লাখ টাকার মাছও বিক্রি হয় একদিনের হাটে। এছাড়া সামুদ্রিক রূপচাঁদা থেকে শুরু করে স্থানীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছও নিয়ে বসেন ব্যবসায়ীরা। আয়োজকদের দাবি, একদিনেই এখানে কোটি টাকার বেশি মাছ বিক্রি হয়।
মাছের জন্য বিখ্যাত হলেও এ আয়োজনকে ঘিরে পুরো বিনিরাইল গ্রাম রূপ নেয় এক মিলন কেন্দ্রে। মাছের পাশাপাশি বসে মিষ্টির বিশাল সব দোকান। রসগোল্লা, চমচম, সন্দেশ আর জিলাপির গন্ধে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। এছাড়া গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্প, কাঠের আসবাব, মাটির তৈরি তৈজসপত্র ও শিশুদের নানা রঙের খেলনাও পাওয়া যায় এখানে।
আয়োজনটির অভিজ্ঞতা জানতে কথা হয় গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন মোল্লার সঙ্গে। স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘ছোটকাল থেকেই আমরা এ আয়োজন দেখে আসছি। আমার বাপ-দাদার মুখেও এ আয়োজনের কথা শুনেছি। পৌষ মাস এলেই জামাইদের দাওয়াত দিয়ে রাখি, যেন আয়োজনের দিন বেড়াতে আসে। তারাও প্রস্তুতি নিয়ে রাখে।’
তিনি বলেন, ‘এখানে জামাই-শ্বশুরের প্রতিযোগিতা চলে কে কত বড় মাছ কিনবে, তা নিয়ে। জামাই আর শ্বশুরের এ প্রতিযোগিতাই মূলত এ আয়োজনের আসল প্রাণ।’
প্রতি বছর মাছ বিক্রি করতে আসেন স্থানীয় ব্যবসায়ী আমির হোসেন। তিনি জানান, সারা বছরই তারা এই একটি দিনের জন্য অপেক্ষা করেন। কিশোরগঞ্জ ও হাওরাঞ্চল থেকে বড় বড় বাগাড়, বোয়াল ও আইড় মাছ নিয়ে আসেন। জামাইরা দাম নিয়ে খুব একটা কার্পণ্য করেন না। পছন্দ হলে চড়া দামেও মাছ কিনে নেন।
তিনি জানান, এখানে কোনো কোনো মাছের ওজন ২০-৫০ কেজি পর্যন্ত হয়। হাজার টাকা থেকে শুরু করে লাখ টাকার মাছও বিক্রি হয় একদিনের হাটে।
মেলা কমিটির সভাপতি মাওলানা আলী হোসেন জানান, আয়োজনটি একসময় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কালের বিবর্তনে এটি এখন সর্বজনীন আয়োজনে পরিণত হয়েছে। পৌষ মাসের শেষ দিনের এ আয়োজনের সব কাজ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে করা হয়। কোনো দোকান থেকে চাঁদা নেয়া হয় না। জায়গাটিও সম্পূর্ণ ব্যক্তিমালিকানাধীন। একাধিক ব্যক্তি আয়োজনটির জন্য আগে থেকেই তাদের জায়গা খালি রাখেন।
তিনি জানান, স্থানীয় সংসদ সদস্য প্রতি বছরই কিছু সহযোগিতা করেন। আয়োজনস্থলে যাতায়াতের সুবিধার্থে রাস্তা সংস্কার করা হয়। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনও নানাভাবে সহযোগিতা করে।
কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এটিএম কামরুল ইসলাম জানান, এ আয়োজন অনেক প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী। এর ঐতিহ্য ধরে রাখা এবং সুষ্ঠুভাবে আয়োজন সম্পন্ন করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হয়। ভবিষ্যতেও যেকোনো সহযোগিতার প্রয়োজন হলে প্রশাসন প্রস্তুত থাকবে বলে জানান তিনি।
