জুলাই বিপ্লবের পর পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দুই বছর পূর্ণ হয়েছে। এ সময়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের ৭০ মামলার মধ্যে সাতটির রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এসব মামলায় ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাসহ ২২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ৩৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বর্তমানে ২০ জন আসামি সাজা ভোগ করছেন এবং ৪১ জন পলাতক।
বুধবার ট্রাইব্যুনালের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামীম।
বিজ্ঞাপন
তামীম বলেন, ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম শুরু হয়। সে সময় দেশের অবস্থা ছিল ভঙ্গুর। ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠনের কাজ শুরু হয়। তিনি বলেন, বর্তমানে ট্রাইব্যুনালে সাতটি মামলার রায় ঘোষণা হয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে এ পর্যন্ত কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, ৭০টি মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ৫৫৮ জন। দুই ট্রাইব্যুনালে ২৬টি মামলার বিচার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
প্রসিকিউটর আরো জানান, এসব মামলায় এখন পর্যন্ত ২০৩ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। পলাতক রয়েছেন ৩৫২ জন। এছাড়া একজন আসামি খালাস পেয়েছেন। তিনি বলেন, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা অভিযোগ করেন আমরা দ্রুত সময়ে বিচারকাজ পরিচালনা করছি। অন্যদিকে ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আমরা বিলম্ব করছি। আমরা উভয়পক্ষকে বলতে চাই, ২০১০ সালের ২৫ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে গঠিত সে ট্রাইব্যুনালের প্রথম মামলায় ২০১২ সালের ৪ নভেম্বর অভিযোগ গঠন করা হয়।
এরপর ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি প্রথম রায় ঘোষণা করা হয়। আবুল কালাম আজাদের ওই মামলায় এক মাস ২১ দিনে বিচারকাজ সম্পন্ন হয়েছিল। প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আমরা বলেছি, আইনানুযায়ী যতটুকু সময় নেওয়ার, আমরা ততটুকুই নিচ্ছি। অতিরিক্ত সময়ও নিচ্ছি না, বিলম্বও করছি না।
কেউই বিচারের ঊর্ধ্বে নয়
প্রসিকিউটর তামীম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কামরুল ইসলাম ও রাশেদ খান মেননের সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। তারা দুজনই ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, ২০১০ সালে আইন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে কামরুল ইসলাম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনে ভূমিকা রেখেছিলেন। এটি বড় শিক্ষা—কেউই বিচারের ঊর্ধ্বে নয়।
তামীম বলেন, ক্ষমতায় বা দায়িত্বে থাকা অবস্থায় প্রত্যেকের মনে রাখা উচিত, কোনো অবিচার যেন কারো ওপর না হয়। অন্যথায় তাকেও একদিন বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।
আসামিপক্ষের আইনজীবীদের প্রশ্ন, যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অপরাধের বিচার কেন হচ্ছে। এর জবাবে তামীম বলেন, এ বিষয়ে আইনি ভিত্তি রয়েছে। তিনি বলেন, ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন প্রণয়নের সময় শুধু সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের বিচারের সুযোগ ছিল। ২০০৯ সালে আইন সংশোধনের মাধ্যমে বেসামরিক নাগরিকদেরও বিচারের আওতায় আনা হয়।
প্রসিকিউটর বলেন, ওই সংশোধনের পর রাজনৈতিক ব্যক্তিদেরও এ আইনে বিচার হয়েছে। সেসব মামলায় আপিল বিভাগ রায় বহাল রেখেছে এবং সর্বোচ্চ সাজাও কার্যকর হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল আইনের ৩(১) ধারায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিচার করার সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে অপরাধ সংঘটিত হলেও ১৯৭৩ সালের আইন দিয়ে বিচার হয়েছে। একইভাবে ২০২৪ সালের ঘটনার বিচারও ১৯৭৩ সালের আইন ও ২০০৯ সালের সংশোধনের ভিত্তিতে করা হচ্ছে। এটি বিশ্বের প্রচলিত আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
