শাজাহান আহমেদ আসিফ, নরসিংদী জেলা প্রতিনিধি:
জন্ম থেকেই দুই হাত নেই। শৈশবে পড়াশোনা করতে গিয়ে শুনতে হয়েছে উপহাস, পেরোতে হয়েছে নানা প্রতিকূলতা। উচ্চশিক্ষা অর্জনের পরও শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে পাননি কাঙ্ক্ষিত চাকরি। তবু দমে যাননি আলতাফ হোসেন দুখু মিয়া। নিজের পৈতৃক জমিতে গড়ে তুলেছেন বিদ্যালয়। পা দিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডে লিখে পাঠদান করছেন ১৪৫ শিশুকে। দীর্ঘদিনের সংগ্রাম আর অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে গড়ে তোলা সেই বিদ্যালয়কে আরও এগিয়ে নিতে এবার তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে নরসিংদী জেলা প্রশাসন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় বিদ্যালয়টির উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান কেয়া।
নরসিংদী সদর উপজেলার নগর পাঁচদোনায় অবস্থিত ‘প্রতিভা দুখু মিয়া কিন্ডারগার্টেন’। বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান শিক্ষক আলতাফ হোসেন দুখু মিয়া। দুই হাত না থাকলেও পা দিয়ে কলম ধরা, লেখা, বই পড়া থেকে শুরু করে ব্ল্যাকবোর্ডে লিখে পাঠদান—সবই করেন তিনি। তাঁর কাছে শারীরিক সীমাবদ্ধতা থেমে থাকার কারণ নয়; বরং নিজের সামর্থ্যকে কাজে লাগিয়ে অন্যদের এগিয়ে নেওয়ার অনুপ্রেরণা।
১৯৬২ সালে পাঁচদোনা গ্রামে জন্ম দুখু মিয়ার। ছোটবেলা থেকেই পা দিয়ে দৈনন্দিন কাজ করার অভ্যাস গড়ে তোলেন তিনি। পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহ থাকলেও শিক্ষাজীবনের শুরুতে বাধার মুখে পড়তে হয় তাঁকে। বাবার সঙ্গে মাদ্রাসায় ভর্তি হতে গিয়ে পা দিয়ে আরবি বই ধরার বিষয়টি দেখিয়ে ভর্তি নেওয়া হয়নি বলে জানান তিনি। পরে সাধারণ বিদ্যালয়ে শুরু হয় তাঁর শিক্ষাজীবন।
স্কুলজীবনে সহপাঠীদের উপহাস ও নানা প্রতিকূলতা সহ্য করতে হয়েছে তাঁকে। কিন্তু দমে যাননি। একে একে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করে নরসিংদী সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। উচ্চশিক্ষা অর্জনের পর চাকরির জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেও সফল হননি বলে জানান দুখু মিয়া। তবে চাকরি না পাওয়ার হতাশা তাঁকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। নিজের অর্জিত জ্ঞান শিশুদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
সেই ভাবনা থেকেই ২০০৭ সালে নিজের পৈতৃক জমিতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘প্রতিভা দুখু মিয়া কিন্ডারগার্টেন’। শুরুতে পরিবারের জীবিকা নির্বাহের চিন্তা থেকে বিদ্যালয়টি গড়ে তুললেও ধীরে ধীরে এটি হয়ে ওঠে এলাকার শিশুদের শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঠিকানা। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা হয়। শিক্ষার্থী রয়েছে ১৪৫ জন, আর পাঠদানে নিয়োজিত আছেন আরও নয়জন শিক্ষক।
প্রায় দুই দশক ধরে পা দিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডে লিখে শিশুদের পাঠদান করছেন দুখু মিয়া। প্রতিদিনের পাঠদানের মধ্য দিয়ে তিনি শুধু বইয়ের জ্ঞানই ছড়িয়ে দিচ্ছেন না, নিজের জীবনসংগ্রামের মাধ্যমেও শিশুদের শেখাচ্ছেন অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস ও প্রতিকূলতা জয় করার শিক্ষা।
তবে এতগুলো শিশুর শিক্ষার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাঁকে। শিক্ষকদের বেতন, শিক্ষা উপকরণ এবং বিদ্যালয়ের পরিচালন ব্যয় মেটাতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হয়। সীমিত সামর্থ্য নিয়েই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করে আসছেন তিনি। তাঁর ছেলে মোমেনুল ইসলামও বাবার পাশে দাঁড়াতে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছেন।
দুখু মিয়ার স্বপ্ন, বিদ্যালয়টিকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করা। কিন্তু প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, আর্থিক সহায়তা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার অভাবে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে সোমবার (১২ অক্টোবর) সকালে বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেন নরসিংদীর জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান কেয়া। এ সময় তিনি দুখু মিয়ার জীবনসংগ্রাম, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাস, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পরিবেশ এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনার নানা সমস্যার কথা শোনেন। পরে বিদ্যালয়ের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে পাশে থাকার আশ্বাস দেন তিনি।
জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান কেয়া বলেন, দুখু মিয়া শুধু নরসিংদীর নয়, সারা দেশের গর্ব। তাঁর স্বপ্নের বিদ্যালয়টিকে উচ্চবিদ্যালয়ে রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পরিদর্শনকালে জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে দুখু মিয়াকে অনুদান দেওয়া হয়। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্কুলব্যাগ ও গাছের চারা বিতরণ করা হয়। জেলা প্রশাসনের এ উদ্যোগে বিদ্যালয়টির উন্নয়ন নিয়ে নতুন করে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন দুখু মিয়া।
দুখু মিয়ার কাছে বিদ্যালয়টি শুধু জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম নয়; এটি তাঁর দীর্ঘদিনের সংগ্রাম, আত্মমর্যাদা ও স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। যে মানুষটি নিজেই শৈশবে নানা বাধার মুখোমুখি হয়েছেন, তিনিই এখন অন্য শিশুদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
তিনি চান, তাঁর বিদ্যালয়টি আরও বড় হোক, শিক্ষার্থীরা ভালো পরিবেশে পড়াশোনা করুক এবং এলাকার কোনো শিশু যেন অর্থনৈতিক সংকট বা সুযোগের অভাবে শিক্ষার পথ থেকে ঝরে না পড়ে।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগ তাঁর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এখন বিদ্যালয়টিকে উচ্চবিদ্যালয়ে উন্নীত করার আশ্বাস বাস্তবে রূপ নেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন দুখু মিয়া, তাঁর শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা।
দুই হাত ছাড়াই নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে জীবনসংগ্রামের যে অনন্য দৃষ্টান্ত গড়েছেন আলতাফ হোসেন দুখু মিয়া, তা শুধু একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার গল্প নয়; এটি অদম্য ইচ্ছাশক্তি, আত্মবিশ্বাস ও মানবিকতার গল্প। পা দিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা তাঁর প্রতিটি অক্ষর যেন বলে—সুযোগ ও সহযোগিতা পেলে প্রতিকূলতাকে জয় করেও মানুষের ভবিষ্যৎ গড়ে দেওয়া সম্ভব।
এ জাতীয় আরো খবর..
