নিয়োগ পাওয়ার ২১ দিন পর গতকাল সোমবার তালা ভেঙে নিজ কার্যালয়ে প্রবেশ করেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম। সকালে উপাচার্যের কার্যালয়ে প্রবেশের পর তাকে অবরুদ্ধ করে রাখেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। ভিসিকে কার্যালয় ছাড়ার সময়সীমা বেঁধে দেন শিক্ষার্থীরা। এরপরও তিনি উপাচার্য কার্যালয় না ছাড়লে এক পর্যায়ে ভবনের বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন আন্দোলনকারীরা। গতকাল রাত ৯টায় প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত উপাচার্য তার কার্যালয়ে বিদ্যুৎহীন অবরুদ্ধ অবস্থায় ছিলেন। বাইরে থেকে খাবার পানি ও বিস্কুট পাঠিয়েছেন বলে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন।
শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, উপাচার্যের সঙ্গে ভবনের ভেতরে আটকা পড়েন ছাত্রদলের সভাপতি ওয়াসিফ রাশেদসহ কয়েকজন ছাত্রনেতা। উপাচার্যকে স্বাগত জানাতে তারা সেখানে গিয়েছিলেন।
এদিকে, উপাচার্যের ক্যাম্পাসে প্রবেশের প্রতিবাদে পূর্ণ কর্মবিরতি ও সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী সমিতি। একই দিন নগরীর বহদ্দারহাট থেকে চুয়েটগামী শিক্ষার্থীদের বহনকারী বাসে দুই দফা হামলার ঘটনাও ঘটেছে। আন্দোলনে যোগ দিতে নগর থেকে বাসে করে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে আসছিলেন। হামলায় বাসচালকসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন।
হামলাকারীরা শিক্ষার্থীদের ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবির আখ্যা দেন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, গতকাল সোমবার সকাল ৯টার দিকে মাইক্রোবাসে করে ক্যাম্পাসে আসেন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম। প্রধান ফটকে নিজেকে ‘শিক্ষক’ পরিচয় দিয়ে তিনি ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন। পরে চুয়েট শাখা ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকে সঙ্গে নিয়ে উপাচার্যের কার্যালয়ে যান। সেখানে শিক্ষার্থীদের লাগানো তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন তিনি। এ সময় তার কক্ষে চুয়েট শাখা ছাত্রদলের সভাপতি ওয়াসিফ রাশেদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান আল সাবিত ও সাংগঠনিক সম্পাদক বিপ্লব হোসাইন উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে, উপাচার্যের ক্যাম্পাসে আসার খবর ছড়িয়ে পড়লে সকাল সাড়ে ৯টা থেকে উপাচার্য কার্যালয়ের সামনে জড়ো হতে থাকেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। তারা ‘আমাদের দাবি, আমাদের দাবি, মানতে হবে, মানতে হবে’ এবং ‘প্রত্যাখ্যান, প্রত্যাখ্যান, নতুন ভিসি প্রত্যাখ্যান’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন। দুপুর ১২টার মধ্যে উপাচার্যকে কার্যালয় ছেড়ে যাওয়ার আলটিমেটাম দেন শিক্ষার্থীরা। নির্ধারিত সময়ের পর তারা ভবনের ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন। উপাচার্য ভবনের বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দেন। এতে কার্যালয়ের ভেতরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন নতুন উপাচার্য।
গতকাল একটার দিকে উপাচার্যের জন্য ফুল ও খাবার নিয়ে তার দপ্তরে যাওয়ার সময় ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক বিপ্লব হোসাইনকে বাধা দেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে তার কাছ থেকে ফুল ও খাবার নিয়ে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়। বিকেলে ভবনের ভেতর থেকে ছাত্রদল নেতা ওয়াসিফ রাশেদ বলেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে একটি স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে। তার ভাষ্য, উপাচার্য নিয়োগ সরকারের সিদ্ধান্ত। শিক্ষকদের একটি অংশ নিজেদের স্বার্থে শিক্ষার্থীদের উসকে দিচ্ছেন।
আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ও যন্ত্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আহনাফ শাহরিয়ার অর্ণব বলেন, উপাচার্য নিজেকে শিক্ষক পরিচয় দিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছেন এবং তালা ভেঙে কার্যালয়ে ঢুকেছেন। তাকে চলে যাওয়ার জন্য আমরা সময় বেঁধে দিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি তা উপেক্ষা করেছেন। তাই আমরা আবারও বাইরে থেকে ভবনে তালা দিয়েছি।
একই বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সাবিহা শবনম বলেন, সকালে শিক্ষার্থীরা যখন ঘুমাচ্ছে, তিনি তখন তালা ভেঙে চুয়েটে ঢুকলেন। উনি ভিসি হওয়ার যোগ্য নন।
ক্যাম্পাসে প্রবেশের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম। তিনি বলেন, সাধারণ শিক্ষার্থীরা দ্রুত ক্লাসে ফিরতে চান। বিশেষ করে ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা ক্লাস শুরুর জন্য উদগ্রীব। শিক্ষকেরাও ক্লাস নিতে চান। তিনি বলেন, গত তিন সপ্তাহে ১৪ থেকে ১৫টি কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে। এ ক্ষতি পুষিয়ে নিতে একাডেমিক রিকভারি প্ল্যান তৈরি করা হবে। দ্রুত ফল প্রকাশ করে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
নিয়োগের পর ২১ দিন সময় নিয়ে ক্যাম্পাসে আসার কারণ ব্যাখ্যা করে উপাচার্য বলেন, আকষ্মিক নিয়োগের পর পরিস্থিতি বুঝতে এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে পরামর্শ করতে সময় লেগেছে। পরিস্থিতি অনুকূলে মনে হওয়ায় তিনি ক্যাম্পাসে এসে দায়িত্ব পালন শুরু করেছেন।
তিন সমিতির কর্মবিরতির ঘোষণা : নবনিযুক্ত উপাচার্যের ক্যাম্পাসে প্রবেশের প্রতিবাদে পূর্ণ কর্মবিরতি ও সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে চুয়েটের শিক্ষক সমিতি, কর্মকর্তা সমিতি ও কর্মচারী সমিতি। গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামে তিন সমিতির যৌথ সভায় ঘোষণা দেওয়া হয়, ক্যাম্পাসে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার দায়ভার উপাচার্যকে বহন করতে হবে।
হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ : শিক্ষার্থীদের বাসে হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামের সামনে থেকে শুরু হয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে সমাবেশে তিন সমিতির নেতারা বক্তব্য রাখেন এবং বাসে হামলার নিন্দা জানান।
গত ২১ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমের স্থলাভিষিক্ত হন। অধ্যাপক সায়েমকে নিয়োগের মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় অপসারণের প্রতিবাদে এবং তাকে পুনর্বহালের দাবিতে পরদিন থেকে অনির্দিষ্টকালের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। পরে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও কর্মবিরতিতে যোগ দেন। আন্দোলনের কারণে প্রায় ২০ দিন ধরে চুয়েটে ক্লাস-পরীক্ষাসহ সব ধরনের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
