বাংলাদেশে দারিদ্র্য কমার পরিবর্তে বাড়ছে। মূল্যস্ফীতির চাপ ও আয়ের স্থবিরতায় মধ্যবিত্ত শ্রেণি আরও বেশি ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে এবং সংসারের খরচ চালাতে গিয়ে পরিবারগুলোর খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা এখন কাঠামোগত সীমার শেষ প্রান্তে।
গতকাল রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) ফ্ল্যাগশিপ প্রকাশনা ‘স্টেট অব দ্য রিয়েল ইকোনমি : ডাইনামিক্স অব রিভার্সালস অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। বইটি যৌথভাবে সম্পাদনা করেছেন অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান এবং নামিরা শামীম।
অনুষ্ঠানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দারিদ্র্যের বিপরীতমুখী প্রবণতা এবং মধ্যবিত্তের ক্রমবর্ধমান ভঙ্গুরতার বিষয়ে পিপিআরসি ও বিশ্বব্যাংকের তথ্যে মিল পাওয়া গেছে। পিপিআরসির জাতীয় প্রতিনিধিত্বমূলক জরিপ অনুযায়ী, মাঝারি দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২৭ দশমিক ৯ শতাংশে
দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে চরম দারিদ্র্য ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ। পাশাপাশি বৈষম্যও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে, যেখানে ব্যয়ভিত্তিক জিনি সহগ বেড়ে ০ দশমিক ৪৩৬-এ পৌঁছেছে।
জরিপের বরাত দিয়ে তিনি জানান, দেশের প্রায় ১৮ শতাংশ পরিবার বা ৩ কোটি ১০ লাখ মানুষ চরম ঝুঁকিপূর্ণ মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে রয়েছে। তারা দারিদ্র্যসীমা ও মধ্যম আয়ের মাঝামাঝি স্তরে কোনোমতে টিকে থাকলেও স্থবির আয় ও লাগামহীন ব্যয়ের কারণে যেকোনো ছোট অর্থনৈতিক ধাক্কাতেই দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এ ছাড়া দেশের প্রায় অর্ধেক পরিবারের অন্তত একজন সদস্য দীর্ঘস্থায়ী রোগে ভুগছেন, যার ফলে আয়ের বড় অংশ চলে যাচ্ছে চিকিৎসা ও ওষুধে। হোসেন জিল্লুর রহমান সতর্ক করে বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি কেবল বৈশ্বিক বা ভূ-রাজনৈতিক ধাক্কার শিকার নয়; বরং এটি এখন ‘উচ্চ দারিদ্র্য-নিম্ন বিনিয়োগ-নিম্ন প্রবৃদ্ধি’র একটি দুষ্টচক্রে বন্দি হয়ে পড়েছে।
অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর জঁ পেম বলেন, অর্থনীতির বড় সংকটগুলো মোকাবিলায় বাণিজ্য নীতি, সরকারি অর্থায়ন (পাবলিক ফাইন্যান্স) এবং জ্বালানি দক্ষতায় অবিলম্বে বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও আত্মবিশ্বাস ফেরাতে শিক্ষাব্যবস্থাকে শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।
সিপিডির বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশে আয়বৈষম্য দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ প্রবৃদ্ধির সুফল কাজে লাগিয়ে মানুষকে যেভাবে দ্রুত দারিদ্র্যমুক্ত করছে, বাংলাদেশ তা পারছে না।
রপ্তানি খাতের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, ‘বিগত ২০ বছরে তৈরি পোশাক খাতের বাইরে আমরা বিকল্প কোনো বড় রপ্তানি খাত দাঁড় করাতে পারিনি। আমাদের মোট রপ্তানিতে আরএমজি খাতের নির্ভরতা ৭৩-৭৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮৫ শতাংশে পৌঁছেছে।’ আমলাতান্ত্রিক জটিলতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, সনদ এখন আর চাকরির নিশ্চয়তা দেয় না, আর বর্তমান জেন-জি প্রজন্ম একটি সাধারণ পারমিটের জন্য সরকারি অফিসে ৩০-৪০ বার যাওয়া কোনোভাবেই মেনে নেবে না।
অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরা খাদ্যপণ্যের লাগামহীন দাম এবং ন্যূনতম মজুরির নিশ্চয়তা না থাকায় অত্যন্ত দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন। বিশেষ করে পোশাক খাতে নারী কর্মসংস্থান কমে যাওয়ায় পরিবেশবান্ধব কৃষিভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি।
সমাপনী বক্তব্যে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বিনিয়োগ স্থবিরতা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারহীন বাস্তবতাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। তিনি অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনে ‘হয়রানিমুক্ত পরিবেশ’ নিশ্চিত করাকে সংস্কারের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেন। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক গণতন্ত্র, প্রবৃদ্ধির নতুন খাত তৈরি, মানসম্মত শিক্ষা, উৎপাদনশীলতার আধুনিকায়ন এবং সুশাসনের সমন্বয়ে একটি পঞ্চস্তম্ভভিত্তিক ‘ট্রানজিশন কমপ্যাক্ট’ বা রূপান্তরমূলক জাতীয় সমঝোতা বাস্তবায়নের জোর তাগিদ দেন।
