নাটোরের বড়াইগ্রামের বনপাড়ায় বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে দুই চালকসহ ১২ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৩০ জন।
২০১৪ সালের একই দিনে একই স্থানে প্রাণহারায় ৩৮ জন
জামায়াতের উদ্বেগ
জুবায়ের হোসেন (নাটোর) নিজাম উদ্দিন (বড়াইগ্রাম)
নাটোরের বড়াইগ্রামের বনপাড়ায় বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে দুই চালকসহ ১২ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৩০ জন। গতকাল মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে নাটোর-পাবনা মহাসড়কের বনপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। এদিকে, ঘটনার পরপরই নিহতের স্বজনদের জন্য আর্থিক সহায়তাসহ সাত সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। ২০১৪ সালের ২০ অক্টোবরে বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কের রেজুর মোড়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছিল ৩৮ জনের। ঠিক ১২ বছর পর আবারো সেই ২০ অক্টোবরেই বনপাড়ায় ১২ জনের মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনায় উপজেলা জুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
খবর পেয়ে জাতীয় সংসদের হুইপ ও নাটোর-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ, জেলা প্রশাসক সুমনী আক্তার, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক ও ইউএনও লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এ সময় হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে এক লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেয়ার ঘোষণা দেন। একই সাথে তিনি নাটোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট আবুল হায়াতকে প্রধান করে সাত সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটির গঠনের ঘোষণা দেন।
দুর্ঘটনায় নিহতরা হলেন- বাস চালক রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ফরাদপুর গ্রামের আব্দুল হাকিমের ছেলে সোহেল রানা (৪০), বাগমারা উপজেলার কনোপাড়া গ্রামের বাবর আলীর ছেলে আনোয়ারুল হক (৩০), পটুয়াখালী জেলার মির্জাগঞ্জ উপজেলার পূর্ব সুবিধখালী গ্রামের আজহার হাওলাদারের ছেলে শহীদুল ইসলাম (৪৫) ও শহীদুল ইসলামের মেয়ে তাছফিয়া খাতুন (৮), শরীয়তপুর জেলার জাজিরা উপজেলার রামকৃষ্ণপুর গ্রামের জহরউদ্দিনের ছেলে জুয়েল (৪০), একই উপজেলার ডুবি সাহিবর গ্রামের ইউনুস আলী শিকদারের ছেলে সোহাগ শিকদার (৩০), জাহান উদ্দিন মোল্লার ছেলে আব্দুস সালাম মোল্লা (৪৬), আরব আলী ফকিরের ছেলে আব্দুস সামাদ ফকির (৭০), পালের চর গ্রামের আব্দুর রাজ্জাক ব্যাপারীর ছেলে শাহীন আহমেদ (৩২), ট্রাক চালক ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বড় মান্দারবাড়ীয়া গ্রামের জাকির হোসেনের ছেলে আবু কালাম (৫৫), নওগাঁ জেলার সাপাহার উপজেলার ঘোনটোলা গ্রামের সাজ্জাদ হোসেনের ছেলে রাসেল (৩৩) ও ফরিদপুর সদর উপজেলার বাকুমদিয়া গ্রামের শ্রী ওমর জমাদারের ছেলে শ্রী হিমেশ জমাদার (৩৫)।
বনপাড়া হাইওয়ে থানার এসআই আলমগীর হোসেন বলেন, ভোরে নাটোর থেকে বালুবোঝাই ট্রাকের (ঢাকা মেট্রো ট ২২-৬২০৬) সঙ্গে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা থেকে চাঁপাইনাবগঞ্জগামী যাত্রীবাহী বাস আরপি স্পেশালের (ঢাকা মেট্রো ব ১২-৪৪৪৫) মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই ৯ জন নিহত হন। পরে আহতদের উদ্ধার করে নাটোর সদর হাসপাতাল ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ স্থানীয় বিভিন্ন ক্লিনিকে নেওয়া হলে সেখানে আরো ৩ জন মারা যান। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
নাটোর ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক আক্তার হামিদ জানান, খবর পাওয়ার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় আহতদের উদ্ধার করে নাটোরের স্থানীয় হাসপাতাল ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (রামেক) পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এদিকে, ঘটনার পর পরই জাতীয় সংসদের হুইপ ও নাটোর-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু ঘটনাস্থল পরিদর্শনসহ নাটোর সদর হাসপাতালে গিয়ে আহত রোগীদের খোঁজখবর নেন। একই সাথে নাটোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট আবুল হায়াতকে প্রধান করে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক, ইউএনও লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস এবং বনপাড়া হাইওয়ে থানার ইনচার্জ উপ-পরিদর্শক আলমগীর হোসেনসহ মোট সাত সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটির গঠনের ঘোষণা দেন।
নাটোরের পুলিশ সুপার শরীফুল হক বলেন, এটা সরু সড়ক। তারপরেও বেপরোয়া গতিতে অসতর্ক হয়ে গাড়ি চালনাই সড়ক দূর্ঘটনার প্রধান কারণ। নিহতদের লাশ উদ্ধার করে হাইওয়ে থানায় রেখে পরিচয় শনাক্ত করার পর স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালের আজকের দিনে ২০ অক্টোবর বড়াইগ্রামের রেজুর মোড়ে বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কে দেশের সবচেয়ে বড় বাস দুর্ঘটনায় ৩৮ জন নিহত হয়। সেই শোকাহত দিনের ১২ বর্ষপূর্তির দিনেই আবারও ভয়াবহ দুর্ঘটনাটি ঘটলো।
এক যুগ পর ফিরে এলো ট্রাজেডি
নাটোরের বড়াইগ্রামে যেন ইতিহাসের এক নির্মম ট্রাজেডির পুনরাবৃত্তি ঘটে গেল। ২০১৪ সালের ২০ অক্টোবর উপজেলার বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কের রেজুর মোড়ে দুটি যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছিলেন ৩৮ জন মানুষ। ঠিক ১২ বছর পর, ২০২৬ সালের ২০ অক্টোবর একই উপজেলায় নাটোর-পাবনা মহাসড়কের বনপাড়া পৌরসভার সরকারপাড়া এলাকায় যাত্রীবাহী বাস ও বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ গেল ১২ জনের। আহত হয়েছেন অনন্ত ৩০ জন। একই তারিখে, একই উপজেলায় দুই ভয়াবহ দুর্ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলেছে সড়কে প্রাণহানি।
২০১৪ সালের সেই ভয়াবহ দিন
২০১৪ সালের ২০ অক্টোবর সোমবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কের রেজুর মোড়ে ঢাকা থেকে রাজশাহীগামী কেয়া পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে গুরুদাসপুরগামী অথৈ পরিবহনের বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি বাস ট্রাককে ওভারটেক করতে গিয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা বাসের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষের পর যানবাহন দুটি সড়কের পাশে ছিটকে পড়ে। একটি বাস পানিতে এবং অন্যটি পাশের খাদে পড়ে যায়। ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়।
এক যুগ পরও একই প্রশ্ন?
১২ বছর আগে বাসের সঙ্গে বাসের সংঘর্ষ, আর এবার বাসের সঙ্গে বালুবোঝাই ট্রাকের সংঘর্ষ। দুর্ঘটনা দুটির ধরন ও পরিস্থিতি এক নয়, তবে একই তারিখে একই উপজেলায় এমন প্রাণঘাতী ঘটনা মানুষের মনে পুরোনো ক্ষত আবারও জাগিয়ে তুলেছে। বড়াইগ্রামের এই দুই র্ট্যাজেডি শুধু দুটি দুর্ঘটনার স্মৃতি নয়! এটি সড়কে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যর্থতা ও করণীয় নিয়ে নতুন করে ভাবার উপলক্ষ। ২০১৪ সালের ২০ অক্টোবরের শোকের স্মৃতি মুছে যাওয়ার আগেই ২০২৬ সালের একই তারিখে নতুন করে প্রাণহানির ঘটনা ঘটল।
মিয়া গোলাম পরওয়ারের উদ্বেগ
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশের সড়ক ও মহাসড়কগুলোয় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে একের পর এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে। এমন ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা রোধে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, অদক্ষ চালকরা যাতে গাড়ি চালাতে না পারেন, সে বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনের চলাচল বন্ধ করাসহ সড়ক সিন্ডিকেট ভেঙে নাগরিকদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
গতকাল মঙ্গলবার ভোর ৫টায় নাটোরে বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও শোক প্রকাশ করেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার। শোক বিবৃতিতে তিনি এসব কথা বলেন।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, নাটোরের বনপাড়ায় নাটোর-পাবনা মহাসড়কে মঙ্গলবার ভোরে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনা খুবই মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক। আমি এ দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও আহতের ঘটনায় ব্যথিত ও শোকাহত। মহান আল্লাহ তাআলার নিকট নিহতদের রুহের মাগফিরাত কামনা এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করছি। পাশাপাশি হতাহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দুর্ঘটনায় আহতদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সব বিভাগের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সহযোগিতা দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।
তিনি বলেন, দেশের সড়ক ও মহাসড়কগুলোয় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে একের পর এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে। এমন ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা রোধে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, অদক্ষ চালকেরা যাতে গাড়ি চালাতে না পারেন, সে বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনের চলাচল বন্ধ করাসহ সড়ক সিন্ডিকেট ভেঙে নাগরিকদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানাচ্ছি।
মঙ্গলবার ভোরে নাটোরের বনপাড়ায় নাটোর পাবনা-মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাস ও বালুবোঝাই ট্রাকের সংঘর্ষে ১৪ জন নিহত এবং অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন।
