ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের একের পর এক হামলার প্রেক্ষাপটে বার্ষিক আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলন স্থগিত করেছে সৌদি আরব। আগামী ২৬ অক্টোবর রাজধানী রিয়াদে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ‘ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ (এফআইআই) সম্মেলনটি আগামী বছর পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তাঝুঁকি বিবেচনায় রিয়াদের বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কর্মীদের বাসা থেকে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিদের প্রাণঘাতী হামলা অব্যাহত থাকায় সম্মেলন আয়োজনের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে আয়োজক কর্তৃপক্ষ। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়, ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত নির্ধারিত অনুষ্ঠানটি আগামী বছর অনুষ্ঠিত হবে। নতুন তারিখ শিগগিরই ঘোষণা করা হবে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এফআইআই ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মাহা বিনতে মিশারি আল সৌদ জানিয়েছেন, অংশীদার, সদস্য, বক্তা ও প্রতিনিধিদের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই সম্মেলন পেছানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, এবারের আয়োজনটি সম্মেলনের দশম আসর। তাই আয়োজনের যথাযথ মান বজায় রাখা এবং অংশগ্রহণকারীদের প্রত্যাশা পূরণের মাধ্যমে অনুষ্ঠানটিকে স্মরণীয় করে তুলতে চায় কর্তৃপক্ষ।বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সুইজারল্যান্ডের দাভোস সম্মেলনের আদলে গড়ে ওঠা এফআইআই অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘দাভোস ইন দ্য ডেজার্ট’ নামে পরিচিত। সৌদি সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত এই সম্মেলনে দেশটির অর্থনৈতিক রূপান্তর ও বিনিয়োগ পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরা হয়।তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে পর্যটন, খেলাধুলা ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতের বিকাশ ঘটানো সৌদি আরবের অন্যতম লক্ষ্য। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিপুল পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতেই সম্মেলনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আয়োজকদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এবারের সম্মেলনে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অংশ নেওয়ার কথা ছিল। তাঁদের মধ্যে ছিলেন অ্যালফাবেট ও গুগলের প্রেসিডেন্ট এবং প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা রুথ পোরাট, গোল্ডম্যান স্যাকস গ্রুপের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী ডেভিড সলোমন এবং ব্ল্যাকরকের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী লরেন্স ফিঙ্ক।
এদিকে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থনকারী সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে ইরান-সমর্থিত হুতিদের সংঘাত সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আরও বেড়েছে। আনসার আল্লাহ নামেও পরিচিত এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী সৌদি আরবের সামরিক স্থাপনা, জ্বালানি অবকাঠামো এবং বেসামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। হামলার লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও রয়েছে। এসব হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত এবং কয়েক শ মানুষ আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাঝুঁকির মধ্যে রিয়াদের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মীদের বাসা থেকে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছে। একজন সরকারি কর্মী ও দুই পরামর্শক বার্তা সংস্থা এএফপিকে এ তথ্য জানিয়েছেন।প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত রোববার রিয়াদের একটি সরকারি সংস্থার কর্মীরা বার্তা পান। সেখানে জানানো হয়, চলতি সপ্তাহের সোমবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দূরবর্তী পদ্ধতিতে কাজ চলবে। পাশাপাশি কর্মীদের স্বাভাবিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার অনুরোধ জানানো হয়।
এ ছাড়া বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় থাকা কিং আবদুল্লাহ ফাইন্যান্সিয়াল ডিস্ট্রিক্টের কোম্পানিগুলোও কর্মীদের বাড়ি থেকে কাজ করতে বলেছে। এতে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক এলাকাগুলোতেও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি সামনে এসেছে।রিয়াদের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ৯৯ তলাবিশিষ্ট কিংডম সেন্টার ভবনেও কর্মীদের পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত না যাওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। ভবনটিতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) একটি আঞ্চলিক কার্যালয় রয়েছে।
সম্মেলন স্থগিত ও কর্মীদের দূর থেকে কাজ করার নির্দেশ—দুই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে হুতিদের হামলার প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত দেশটির নিরাপত্তা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
