শান্তির নোবেলে ট্রাম্পের অশান্তি! প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা আর প্রত্যাখ্যানের অতৃপ্তি
সাইফুল ইসলামপ্রকাশ:
অডিও সংবাদএই খবরটি পডকাস্টে শুনুন
বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট তিনি। তার একটি সিদ্ধান্তে বদলে যেতে পারে বিশ্বরাজনীতির সমীকরণ। তার কথায় কখনো কাঁপে শেয়ারবাজার, কখনো উত্তপ্ত হয় আন্তর্জাতিক কূটনীতি। অথচ সেই ডোনাল্ড ট্রাম্পেরই যেন শান্তি কেড়ে নিয়েছে একটি শান্তির পুরস্কার! নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ার আক্ষেপ এখন রীতিমতো ক্ষোভে পরিণত হয়েছে। প্রশ্ন হলো, শান্তির জন্য নোবেল চান ট্রাম্প, নাকি নোবেল পাওয়ার জন্যই তার এত শান্তির আয়োজন?
পৃথিবীতে অনেকেই পুরস্কার পেয়ে বিখ্যাত হন। কেউ কেউ পুরস্কার না পেয়েও ইতিহাসে অমর হয়ে থাকেন। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্ভবত এক বিরল চরিত্র, যিনি পুরস্কার না পাওয়াকেও পরিণত করেছেন আন্তর্জাতিক সংবাদে!
ব্যবসায়ী থেকে রিয়েলিটি টেলিভিশনের তারকা, সেখান থেকে হোয়াইট হাউসের অধিপতি। ট্রাম্পের জীবন যেন হলিউডের কোনো চিত্রনাট্য। সেখানে অর্থ আছে, ক্ষমতা আছে, বিতর্ক আছে, আত্মপ্রচারের বিপুল আয়োজনও আছে। আছে নিজেকে সবার চেয়ে সেরা প্রমাণের এক অদম্য তাড়না। কিন্তু এত অর্জনের পরও একটি অপূর্ণতা যেন তাকে কিছুতেই স্বস্তি দিচ্ছে না। সেটি নোবেল শান্তি পুরস্কার।
২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার ঘোষণার পর সেই পুরোনো ক্ষতে যেন আবারও নুনের ছিটা পড়েছে। নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি শান্তিতে নোবেল ঘোষণা করে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রখ্যাত আইনজ্ঞ নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাইয়ের নামে। বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রাম, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারে দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতি পান তিনি। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সাবেক বিচারক ও জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সাবেক হাইকমিশনার পিল্লাই গাজায় সংঘটিত অপরাধের তদন্ত নিয়েও আন্তর্জাতিক আলোচনায় এসেছেন।
এমন একজন মানুষের নোবেলপ্রাপ্তিতে অভিনন্দন না জানিয়ে রীতিমতো ক্ষোভে ফেটে পড়লেন ট্রাম্প।
নিউইয়র্কের এক রাজনৈতিক সমাবেশে নোবেল কমিটির সিদ্ধান্তকে তিনি আখ্যা দিলেন লজ্জাজনক ও বিব্রতকর হিসেবে। এখানেই শেষ নয়। নরওয়ের জন্য এই সিদ্ধান্ত এক ‘অমোচনীয় কলঙ্ক’ হয়ে থাকবে বলেও মন্তব্য করলেন। পিল্লাইকে এমনভাবে উপস্থাপন করলেন, যেন তিনি একেবারেই অচেনা কেউ! এমনকি নরওয়ের এই আচরণ তিনি ভুলবেন না বলেও জানিয়ে দিলেন।
ভাবা যায়! একটি পুরস্কার না পাওয়ার অভিমান পৌঁছে গেল আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অসন্তোষের পর্যায়ে!
ট্রাম্প অবশ্য তার দাবির পক্ষে যুক্তিও হাজির করেছেন। তাঁর ভাষ্য, তিনি আটটি যুদ্ধ থামিয়েছেন। কাজেই শান্তিতে নোবেল পাওয়ার যোগ্য দাবিদার তিনিই।
তার মধ্যস্থতায় কিছু আন্তর্জাতিক বিরোধে কূটনৈতিক অগ্রগতি হয়েছে, সেটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু যুদ্ধবিরতি আর স্থায়ী শান্তি কি একই বিষয়? সাময়িক সমঝোতা আর সংঘাতের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির মধ্যেও তো বিস্তর ফারাক। উপরন্তু, তার দাবি করা বেশ কয়েকটি সংঘাতের অবসানের কৃতিত্ব নিয়েই রয়েছে প্রশ্ন।
ট্রাম্পের রাজনৈতিক দর্শনের একটি পরিচিত কথা, ‘শক্তির মাধ্যমে শান্তি’। কিন্তু সেই শান্তির পথে যখন সামরিক হুমকি, অর্থনৈতিক চাপ কিংবা প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করার কৌশল প্রধান হয়ে ওঠে, তখন প্রশ্ন জাগে, এটি শান্তি প্রতিষ্ঠার দর্শন, নাকি শক্তির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার আরেক নাম?
ট্রাম্পের নোবেল-প্রেমের সবচেয়ে চমকপ্রদ অধ্যায়টি অবশ্য অন্যখানে।
২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি হোয়াইট হাউসে গিয়ে নিজের নোবেল পদকটি তুলে দেন ট্রাম্পের হাতে। ভেনেজুয়েলার স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক পরিবর্তনে ট্রাম্পের ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে এই উপহার দেন তিনি।
ট্রাম্পও মহাখুশি! সানন্দে গ্রহণ করেন সেই পদক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একে পারস্পরিক শ্রদ্ধার চমৎকার নিদর্শন হিসেবে তুলে ধরেন।
কিন্তু বিধি বাম! নোবেল কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিল, পদক হাতবদল হতে পারে, কিন্তু নোবেলজয়ীর সম্মান নয়। অর্থাৎ, পদকটি ট্রাম্পের হাতে থাকলেও নোবেলজয়ীদের তালিকায় নামটি মাচাদোরই থাকবে।
পরিহাস! বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর ব্যক্তির হাতে নোবেলের আসল সোনার পদক, অথচ পুরস্কারটি তাঁর নয়! অনেকটা ট্রফি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এমন এক খেলোয়াড়ের মতো, যিনি আসলে ম্যাচটিই জেতেননি!
ট্রাম্পের এই নোবেল-আকাঙ্ক্ষার পেছনে অবশ্য আরেকটি নাম ঘুরেফিরে আসে; বারাক ওবামা।
২০০৯ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম বছরেই নোবেল শান্তি পুরস্কার পান ওবামা। সেই সিদ্ধান্ত নিয়েও কম বিতর্ক হয়নি। সমালোচকদের প্রশ্ন ছিল, বাস্তব অর্জনের চেয়ে ভবিষ্যতের প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিয়ে এত বড় স্বীকৃতি দেওয়া কতটা যৌক্তিক?
ট্রাম্পও সেই প্রশ্ন তুলেছেন বারবার। তাঁর যুক্তির সারকথা, ওবামা যদি নোবেল পেতে পারেন, তাহলে তিনি কেন নন?
এখানেই ট্রাম্পের ব্যক্তিত্বের একটি চেনা বৈশিষ্ট্য সামনে আসে। তিনি শুধু সফল হতে চান না, অন্যদের চেয়ে বেশি সফল হিসেবে স্বীকৃতিও চান। ব্যবসায় নিজের নামকে ব্র্যান্ড বানানো, টেলিভিশনে তারকাখ্যাতি, রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে বিদ্রূপ করা, সবখানেই তাঁর আত্মপ্রচারের এক স্বতন্ত্র ধরন রয়েছে।
তাঁর রাজনৈতিক জীবনের দিকে তাকালেও দেখা যায়, প্রশংসা পেলে তিনি উদার, সমালোচনা এলেই আক্রমণাত্মক। নির্বাচনী পরাজয় মেনে নিতে অনীহা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি তির্যক মন্তব্য কিংবা নিজের অর্জনকে অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপন এসব কারণে তাঁকে ঘিরে বিতর্কের শেষ নেই।
তবে আত্মবিশ্বাস আর আত্মমুগ্ধতার মধ্যে যে সূক্ষ্ম সীমারেখা, ট্রাম্পের সমালোচকদের মতে, সেটি তিনি প্রায়ই অতিক্রম করেন।
অবশ্য নোবেল শান্তি পুরস্কারের ইতিহাসও বিতর্কমুক্ত নয়। হেনরি কিসিঞ্জার থেকে শুরু করে বারাক ওবামা। অনেকের পুরস্কারপ্রাপ্তি নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। কাজেই ট্রাম্পের অবদান নিয়ে আলোচনা কিংবা তাঁর যোগ্যতা মূল্যায়ন নিশ্চয়ই হতে পারে।
কিন্তু পুরস্কার না পাওয়ার কারণে বিজয়ীকে হেয় করা, বিচারকদের আক্রমণ করা কিংবা একটি দেশকে প্রকাশ্যে তিরস্কার করা কতটা দায়িত্বশীল আচরণ?
নোবেল শান্তি পুরস্কার কোনো নির্বাচনী বিজয় নয়, কোনো ব্যবসায়িক চুক্তিও নয় যে দরকষাকষি করে আদায় করতে হবে। এটি এমন এক স্বীকৃতি, যার মর্যাদা নিহিত থাকে কাজের মধ্যে, দাবির উচ্চকণ্ঠে নয়।
ট্রাম্পের হাতে বিপুল ক্ষমতা, সম্পদ, খ্যাতি। বিশ্বের সংবাদমাধ্যমে প্রতিদিন তাঁর উপস্থিতি। তাঁর একটি মন্তব্যই হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক শিরোনাম। তবু একটি পুরস্কারের স্বীকৃতি যেন তাঁর কাছে অধরাই থেকে যাচ্ছে।
ইতিহাস একদিন বিচার করবে, বিশ্বশান্তিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রকৃত অবদান কতটুকু। তিনি নোবেল পাওয়ার যোগ্য ছিলেন কি না, সেটিও সময়ের বিচারে আলোচিত হবে।
কিন্তু আপাতত প্রশ্নটি অন্য জায়গায়।
ট্রাম্প নোবেল শান্তি পুরস্কারকে যতটা ভালোবাসেন, শান্তির আদর্শকেও কি ঠিক ততটাই ভালোবাসেন?
নাকি পুরস্কারটির প্রতি তাঁর আকর্ষণ আসলে সেই পুরোনো ট্রাম্পীয় দর্শনেরই প্রতিফলন। সবকিছুতেই আমাকে জিততে হবে, সবার আগে থাকতে হবে!
গল্পের সবচেয়ে বড় পরিহাস সম্ভবত এখানেই। যিনি গোটা বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার কৃতিত্ব দাবি করেন, একটি নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ায় নিজের মনেই যেন শান্তি খুঁজে পাচ্ছেন না!
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই- এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…
