মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁও গ্রামে লাল বর্ণে প্রতিমা গড়ে ব্যতিক্রম উপায়ে দুর্গাপূজা উদযাপনের আয়েজনে, অসংখ্য ভক্ত ও দর্শনার্থীরা দেখতে আসেন।
পাঁচগাঁওয়ের এই পূজার বিশেষত্ব শুধু প্রতিমার রঙে নয়, এর পেছনে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহ্য ও জনশ্রুতি। সাধক সর্বানন্দ দাসের হাত ধরে শুরু হওয়া এই আয়োজন সময়ের পরিক্রমায় পরিণত হয়েছে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় দুর্গোৎসবে।
পাঁচগাঁওয়ে দেবী দুর্গার লালবর্ণের প্রতিমাকে ঘিরে প্রচলিত রয়েছে একটি অলৌকিক কাহিনি। জনশ্রুতি অনুযায়ী, সাধক সর্বানন্দ দাস আসামের কামাখ্যায় পূজার জন্য একটি শিশুকন্যা লাভ করেন। ধীরে ধীরে শিশুটির শরীর লাল বর্ণ ধারণ করতে শুরু করলে সাধক উপলব্ধি করেন, তার মধ্যে স্বয়ং দেবীর আবির্ভাব ঘটেছে।
আরও পড়ুন
কথিত আছে, দেবী সাধককে বর দিতে চাইলে তিনি রাজনগরের পাঁচগাঁওয়ে দেবীর আবির্ভাব কামনা করেন। তখন দেবী জানান, সেখানে তার প্রতিমার রং হবে লাল। সেই থেকে গ্রামটিতে লালবর্ণের প্রতিমায় দেবী দুর্গার পূজা হয়ে আসছে।
লোককথায় আরও বলা হয়, এক সময় দেবী তার উপস্থিতির নিদর্শন হিসেবে একটি কাঁচাঘরের বেড়ায় পাঁচ আঙুলের লাল ছাপ রেখে যান। সেই সঙ্গে রেখে যান নিজের স্বর্ণালংকার। স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, অলংকারগুলো এখনও পূজার সময় দেবীর প্রতিমায় পরানো হয়।
পাঁচগাঁওয়ের দুর্গাপূজা ঘিরে সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত চলে বিশেষ আয়োজন। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি, ধূপের সুবাস আর পূজার আনুষ্ঠানিকতায় মণ্ডপজুড়ে তৈরি হয় ভিন্ন এক আবহ। লালবর্ণের প্রতিমা দেখতে ভিড় করেন নানা বয়সি মানুষ। অনেকে আসেন মনস্কামনা নিয়ে, কেউ আসেন পরিবারের মঙ্গল কামনায়, আবার কেউ আসেন ঐতিহ্যের টানে।
স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, প্রতিবছর দেশ-বিদেশ থেকে লক্ষাধিক ভক্ত ও দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে এই পূজায়। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের বাইরেও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ আসেন। ভারত থেকেও ভক্তদের আগমন ঘটে বলে জানান তারা।
পূজার সময় অনেকে দেবীর উদ্দেশে পশুবলি দেন, বস্ত্র ও অলংকার নিবেদন করেন। মনস্কামনা পূরণে কেউ হোমযজ্ঞ করেন, কেউ জ্বালান প্রদীপ ও আগরবাতি। কয়েকটি মহিষ ও শত শত পাঁঠাসহ হাঁস-কবুতর বলি দেওয়ার কথাও জানান স্থানীয়রা।
পাঁচগাঁও দুর্গাপূজার পরিচালক সঞ্জয় দাস সাধক সর্বানন্দ দাসের ষষ্ঠ উত্তরপুরুষ। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, তাদের পরিবারে ৩০০ বছরের বেশি সময় ধরে লালবর্ণের প্রতিমায় দুর্গাপূজা হয়ে আসছে। এটি মূলত পারিবারিক পূজা। তবে দেবীর জাগ্রত উপস্থিতিতে মানুষের বিশ্বাসের কারণে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক ভক্ত ও দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে।
সঞ্জয় দাস বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় একবার পূজার আনুষ্ঠানিকতায় ছেদ পড়ে। সে বছর প্রতিমা পূজার পরিবর্তে ঘটপূজা করা হয়েছিল।
পূজার দিনগুলোতে দর্শনার্থীদের ভিড় সামলাতে পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি প্রতিবেশীদেরও ব্যস্ত থাকতে হয়। তবে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি বলে জানান তিনি। স্থানীয় প্রশাসন সার্বিক সহযোগিতা করেন। এবারও স্থানীয় ও জেলা পর্যায়ের প্রশাসনের কর্মকর্তারা খোঁজখবর নিয়েছেন।
পাঁচগাঁওয়ের ব্যতিক্রমী আয়োজনের পাশাপাশি মৌলভীবাজারের অন্যান্য পূজা মণ্ডপেও চলছে শারদীয় দুর্গোৎসবের নানা আয়োজন। জেলা শহরের বেশ কয়েকটি মণ্ডপের প্রবেশপথ সাজানো হয়েছে নান্দনিক নকশায়। আলোকসজ্জা ও দৃষ্টিনন্দন সাজে উৎসবের আবহ ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে।
জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সুত্রে জানা যায়, জেলায় এবার সার্বজনীন ৮শত ৯৮টি এবং ব্যক্তিগত ১শত ২৪টি সহ মোট ১ হাজার ২২টি পূজা মন্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। এ মধ্যে সদরে ১১১টি, বড়লেখায় ১৪৬টি, জুড়িতে ৭৬টি, কুলাউড়ায় ২২৭টি, রাজনগরে ১৩৬টি, কমলগঞ্জে ১৫৪টি ও শ্রীমঙ্গলে ১৭২টি পূজা মন্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
পুলিশ সুপার মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘জেলার সব পূজা মণ্ডপগুলোতে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি মণ্ডপে পুলিশ ও আনসারের সমন্বয়ে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে।’
পুলক পুরকায়স্থ/খাদিজা রুমি/
