আজকাল ওয়েবডেস্ক: বিশ্বজুড়ে দূষণ কমানোর নানা প্রতিশ্রুতি আর বাগাড়ম্বরের মাঝেই চরম বিপদের পূর্বাভাস দিল রাষ্ট্রসংঘ। বুধবার প্রকাশিত ‘ইউনাইটেড নেশনস এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রাম’ (UNEP)-এর বার্ষিক ‘এমিশনস গ্যাপ রিপোর্ট’-এ সতর্ক করে জানানো হয়েছে, বিভিন্ন দেশ যদি তাদের বর্তমান সব জলবায়ু প্রতিশ্রুতি হুবহু পূরণও করে, তবুও এই শতাব্দীর শেষে পৃথিবীর তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পায়ন যুগের তুলনায় অন্তত ২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। আর যদি বর্তমান সরকারি নীতিগুলোতেই পৃথিবী চলতে থাকে, তবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি গিয়ে ঠেকবে ২.৮ ডিগ্রিতে।
প্যারিস জলবায়ু চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল বিশ্ব উষ্ণতা বৃদ্ধিকে প্রাক-শিল্প স্তরের ১.৫ ডিগ্রির মধ্যে বেঁধে রাখা, আর খুব বেশি হলে তা যেন ২ ডিগ্রির ওপরে না যায়। কিন্তু বহু বছর ধরে পর্যাপ্ত পদক্ষেপের অভাবে সেই ১.৫ ডিগ্রির লক্ষ্যমাত্রা ধরে রাখার সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেছে বলে সাফ জানিয়েছে রাষ্ট্রসংঘ। রিপোর্টটি প্রকাশ করে রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ১.৫ ডিগ্রির সীমা যে অতিক্রম করবেই, তা আর এড়ানো সম্ভব নয়। এর বিধ্বংসী প্রভাব ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে—ভয়াবহ বন্যা, তীব্র তাপপ্রবাহ, দাবানল এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন করছে, যার শিকার সবচেয়ে বেশি হচ্ছে সেই গরিব দেশগুলো, যাদের দূষণের দায় সবচেয়ে কম।
রিপোর্টে উঠে এসেছে, ২০২৫ সালেও বিশ্বজুড়ে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ২০২৪ সালের রেকর্ড মাত্রার সমান ছিল। বিশেষ করে কয়লা, তেল ও গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর কারণে কার্বন নির্গমন আগের বছরের চেয়ে কিছুটা বেড়েছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে জানাচ্ছেন, তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রির ওপরে সামান্য বাড়লেও বিশ্বজুড়ে চরম আবহাওয়া এবং অপরিবর্তনীয় প্রাকৃতিক পরিবর্তনের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশ্ব ইতিমধ্যে প্রায় ১.৪ ডিগ্রি উত্তপ্ত হয়ে গেছে এবং আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই তা ১.৫ ডিগ্রির সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বের তিন-চতুর্থাংশ দূষণের জন্য দায়ী জি-২০ ভুক্ত দেশগুলো। দূষণ বৃদ্ধির হার এই গোষ্ঠীভুক্ত অনেক দেশে কিছুটা কমলেও বড় ব্যতিক্রম হিসেবে উঠে এসেছে আমেরিকার নাম। প্যারিস চুক্তি থেকে আমেরিকার আনুষ্ঠানিক প্রত্যাহার এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের কারণে দেশটির কার্বন নির্গমন প্রায় ১৩৩ মেগাটন বেড়েছে, যা অন্য যেকোনও দেশের বৃদ্ধির তুলনায় অনেক বেশি। শীর্ষ দূষণকারী দেশগুলোর মধ্যে আমেরিকা ছাড়াও চিন ও ইন্দোনেশিয়ায় নির্গমন বেড়েছে, যদিও ভারত, রাশিয়া এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে সামান্য কমেছে। এদিকে আগামী নভেম্বরে তুরস্কে শুরু হতে যাওয়া সিওপি৩১ (COP31) জলবায়ু সম্মেলনের আগে এই রিপোর্ট বিশ্বনেতাদের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন উন্নয়নশীল ও পরিবেশবাদী সংগঠন একে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ‘ঐতিহাসিক ব্যর্থতা’ বলে কটাক্ষ করেছে। তবে গুতেরেসের মতে, নেতৃত্বের ব্যর্থতা থাকলেও ১.৫ ডিগ্রির মাত্রা সাময়িক অতিক্রম করা মানেই লড়াই থেকে হাল ছেড়ে দেওয়া নয়, বরং অবিলম্বে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে পদক্ষেপ নেওয়াই এখন একমাত্র পথ।
