৪৫ মিনিট আগে
![]()
আনিসুর রহমান
ছবি: স্টার
নারী লং জাম্পে ২২ বছরের পুরনো জাতীয় রেকর্ড ভেঙে সদ্য সমাপ্ত এশিয়ান গেমসের টিকিট পেয়েছিলেন স্বপ্না খাতুন। জাপানে ক্যারিয়ারসেরা আন্তর্জাতিক পারফরম্যান্স করলেও ১৬ জন প্রতিযোগীর মধ্যে ১৫তম হয়ে আসর শেষ করেন তিনি। সম্প্রতি নিজের পারফরম্যান্স, ভবিষ্যৎ লক্ষ্য ও দেশের ক্রীড়াঙ্গনের নানা সীমাবদ্ধতা নিয়ে দ্য ডেইলি স্টারের আনিসুর রহমানের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন বিকেএসপির এই প্রাক্তন শিক্ষার্থী।
সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো:
দ্য ডেইলি স্টার (ডিএস): এশিয়ান গেমসে আপনার পারফরম্যান্সকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
স্বপ্না খাতুন (স্বপ্না): গেমসে আমার ৫.৬৯ মিটারের লাফটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যক্তিগত সেরা হলেও গত মে মাসে জাতীয় অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে গড়া ৬.২৫ মিটারের জাতীয় রেকর্ডের চেয়ে কম ছিল। জাপানে অনুশীলনের সময় আমি নিয়মিত ৬ মিটারের বেশি লাফিয়েছিলাম। তাই মূল মঞ্চের পারফরম্যান্সের ব্যাখ্যা দেওয়া কঠিন। তবে সেখানকার টানা বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়া আমার ওপর বেশ বড় প্রভাব ফেলেছিল।
এশিয়ান গেমস আমাকে আরেকটি বিষয় অনুধাবন করিয়েছে— শারীরিক ও অ্যাথলেটিক দক্ষতায় আমরা অন্য দেশের অ্যাথলেটদের চেয়ে খুব একটা পিছিয়ে নেই। মূল পার্থক্যটা সুযোগ-সুবিধায়। বিদেশি অ্যাথলেটরা বিশ্বমানের ফিজিওথেরাপি, পুষ্টি ও অনুশীলনের সুবিধা পায়। উদাহরণস্বরূপ, থাইল্যান্ডের শীর্ষ স্প্রিন্টারের জন্য ওয়ার্ম-আপের সময়ই দুজন নির্দিষ্ট ফিজিও ছিলেন। আর আমাদের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধারই অভাব ছিল।
ডিএস: আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য কেমন প্রস্তুতির প্রয়োজন?
স্বপ্না: মাত্র এক থেকে তিন মাসের প্রস্তুতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভালো ফলাফলের আশা করা একেবারেই অবাস্তব। শুধু শারীরিক ফিটনেস গড়তেই অন্তত দেড় থেকে তিন মাস সময় লাগে। তাড়াহুড়ো করে প্রস্তুতি নিলে ইনজুরির ঝুঁকি বাড়ে এবং শরীরও মানিয়ে নিতে পারে না। সাফল্য পেতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন— ঠিক যেমন পরীক্ষার আগের রাতে না পড়ে সারাবছর নিয়মিত পড়ালেখা করতে হয়।
ডিএস: আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় বাংলাদেশের সুযোগ-সুবিধা ও পুষ্টিগত (নিউট্রিশনাল) সহায়তা কেমন?
স্বপ্না: এখানে বিশাল ব্যবধান রয়েছে। আমাদের ক্রীড়া সংস্থাগুলো কিছু সহায়তা দেয় ঠিকই, তবে তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। ঘাটতি মেটাতে আমাদের নিজেদের বেতন থেকেই ভালো ডায়েট ও পুষ্টির পেছনে খরচ করতে হয়। আর বড় কোনো প্রতিযোগিতার আগে এই খরচ আরও বেড়ে যায়।
তাছাড়া, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বাইরে থাকা অ্যাথলেটদের জাতীয় স্টেডিয়ামে অনুশীলনের জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসতে হয়। অন্যদিকে, জাপানের স্টেডিয়ামগুলোতে সিন্থেটিক প্র্যাকটিস ট্র্যাক ও আধুনিক জিম সরঞ্জাম রয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করতে হলে আমাদের অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন করতেই হবে।
ছবি: সংগৃহীত
ডিএস: দেশে পদকজয়ী অ্যাথলেট কীভাবে গড়ে তোলা সম্ভব?
স্টার: তৃণমূল ও স্কুল পর্যায় থেকে একদম প্রাথমিক বয়সেই অ্যাথলেটদের খুঁজে বের করে তৈরি করতে হবে। স্কুলে ১০টি ক্রীড়া ইভেন্ট চালু করার সরকারি উদ্যোগটি যদি টেকসইভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে তা শিক্ষার্থীদের মাঝে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ তৈরি করবে এবং শক্তিশালী অ্যাথলেট উঠে আসবে।
ডিএস: ফেডারেশন ও নীতি নির্ধারকদের এখন কোন বিষয়টিতে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত?
স্টার: অ্যাথলেটদের বিদেশে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো ফেডারেশনগুলোর প্রধান কাজ হওয়া উচিত। কারণ সেখানকার সুযোগ-সুবিধা ও অনুশীলন ব্যবস্থা অনেক আধুনিক। যেকোনো বড় ইভেন্টের দুই-তিন মাস আগে নামকাওয়াস্তে প্রস্তুতি না নিয়ে নিয়মিত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ও ট্রেনিং ক্যাম্পের ব্যবস্থা রেখে চার বছরের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন।
ডিএস: আন্তর্জাতিক মাল্টি-স্পোর্টস ইভেন্টে বাংলাদেশের সাফল্যের পরিমাপ কীভাবে হওয়া উচিত?
স্টার: কেবল অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য আমাদের এত বড় বড় প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া উচিত নয়। আর কতদিন আমরা অভিজ্ঞতা অর্জন করতে থাকব? আমাদের নির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করতে হবে এবং পদক জয়ের মানসিকতা নিয়ে নামতে হবে। বাংলাদেশের অ্যাথলেটদের সহজাত প্রতিভা রয়েছে, কেবল প্রয়োজন উপযুক্ত অনুশীলনের সুযোগ-সুবিধা ও পৃষ্ঠপোষকতা।
ডিএস: আসন্ন দক্ষিণ এশিয়ান (এসএ) গেমসে আপনার লক্ষ্য কী?
স্টার: উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা ও বিদেশে কয়েক মাসের ভালো প্রশিক্ষণ পেলে সেরা তিনে থেকে পদক জেতার ব্যাপারে আমি শতভাগ আত্মবিশ্বাসী। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের শীর্ষ নারী অ্যাথলেটরা সাত মিটারের বেশি লাফিয়ে থাকেন। তবে আমার বিশ্বাস, সুনির্দিষ্ট ও উচ্চমানের ট্রেনিং পেলে আমার ব্যক্তিগত সেরা ৬.২৫ মিটারের রেকর্ডটিকে আরও ৫০ সেন্টিমিটার বাড়িয়ে ৬.৫০ থেকে ৬.৭৫ মিটারে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
ডিএস: চাকরির নিশ্চয়তা একজন অ্যাথলেটের ক্যারিয়ারে কতটা প্রভাব ফেলে?
স্বপ্না: সামরিক বা সার্ভিসেস বাহিনীতে থাকা অ্যাথলেটরা বেশি নিরাপদ বোধ করেন। কারণ তারা জানেন, খেলাধুলা ছাড়ার পরও তাদের চাকরি থাকবে। অন্যদিকে, যাদের স্থায়ী চাকরি নেই, তারা ভবিষ্যৎ নিয়ে সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকেন এবং খেলা শেষে কোচ বা শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখেন।
সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, আনসার, রেলওয়ে ও ব্যাংকগুলোতে অ্যাথলেটদের জন্য স্থায়ী পদের সংখ্যা বাড়ানো গেলে তাদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। এতে যেমন আরও অনেকে অ্যাথলেটিক্সে আসতে উৎসাহিত হবে, তেমনি সার্বিক পারফরম্যান্সের মানও বৃদ্ধি পাবে।
