নিলামের মেয়াদ শেষ হয়েছে প্রায় তিন মাস আগে। নতুন নিলামে বা নবায়নে অনুমোদন মিলেছে কি না, তাও নিশ্চিত নয়। অথচ সরকারিভাবে নদী খনন করে তীরে রাখা মাটি এক্সকাভেটর দিয়ে কেটে নিয়ে ট্রলিতে ভরে ট্রাক্টরে করে নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন ইটভাটায়। মেহেরপুরের কাজলা নদীর তীরে এভাবেই দিনদুপুরে চলছে মাটি ডাকাতি। আর এ অভিযোগ উঠেছে মেহেরপুর জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক এস এম ফিরোজুর রহমানের বিরুদ্ধে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মেহেরপুর সদর উপজেলার গহরপুর গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কাজলা নদী ও বলিয়ারপুরের জিয়া খালের খনন করা মাটি বিক্রি অব্যাহত রয়েছে। অথচ সংশ্লিষ্ট নিলামের মেয়াদ গত ৩০ জুলাই শেষ হয়েছে। নতুন করে দরপত্র আহ্বান কিংবা আগের নিলাম নবায়নের অনুমোদন ছাড়াই মাটি অপসারণ করা হচ্ছে।
মেহেরপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, গত ১৫ জুন মেহেরপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী শান্ত দত্তের স্বাক্ষরিত পরিপত্রে কাজলা নদীর পুনঃখনন প্রকল্পের আওতায় ১৩ দশমিক ৪০০ কিলোমিটার থেকে ১৩ দশমিক ৬০০ কিলোমিটার পর্যন্ত অংশ থেকে উত্তোলিত মাটি নিলামে বিক্রির নির্দেশ দেওয়া হয়। ‘লট নং-নিলাম-০৬/২০২৫-২৬’-এর আওতায় ৬ হাজার ৭৮৯ দশমিক ৭৫ ঘনমিটার মাটি অপসারণের জন্য সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৫০০ টাকায় এস এম ফিরোজুর রহমানকে নির্বাচিত করা হয়।
তবে ওই নিলামের মেয়াদ গত ৩০ জুলাই শেষ হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এরপর মাটি অপসারণ ও বিক্রি অব্যাহত রাখার জন্য নতুন করে কোন অনুমোদন দেওয়া হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মেহেরপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) দরপত্রের মাধ্যমে জিয়াখাল ও কাজলা নদী খননের মাটি বিক্রির ব্যবস্থা করে। তবে সংশ্লিষ্ট নিলামের মেয়াদ গত ৩০ জুলাই শেষ হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এরপরও মেহেরপুর জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক এস এম ফিরোজুর রহমান এবং তার সহযোগী মিয়ারুল ও কিতাব নদীর পাড়ে স্তূপ করে রাখা মাটি কেটে বিভিন্ন ইটভাটায় সরবরাহ করছেন।
যদিও ফিরোজুর রহমানের দাবি, আগের টেন্ডারের মেয়াদ শেষ হলেও নতুন করে আবেদন করা হয়েছে। দু-একদিনের মধ্যেই মাটি বিক্রির আদেশ হাতে এসে পৌঁছাবে।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সরেজমিনে কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীর সঙ্গে গহরপুর এলাকায় কাজলা নদীর পাড়ে গিয়ে দেখা যায়, খনন করা মাটি স্তূপ করে রাখা হয়েছে। সেখান থেকে এক্সকাভেটর দিয়ে মাটি কেটে ট্রাক্টরের ট্রলিতে ভরা হচ্ছে। সেই মাটি বিভিন্ন ইটভাটায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এ সময় মাটি অপসারণের কাজে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনো প্রতিনিধির উপস্থিতি দেখা যায়নি।
মেয়াদোত্তীর্ণ নিলামপত্রের শর্ত অনুযায়ী, পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে মাটি অপসারণ এবং অপসারিত মাটির পরিমাণ পরিমাপ রেজিস্টার খাতায় লিপিবদ্ধ করার কথা। তবে সরেজমিনে এসব শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এস এম ফিরোজুর রহমান বলেন, ‘কাজলার টেন্ডারটা আমার নামে। মেয়াদের আবেদন করা আছে। রোববার বা সোমবারে হাতে পাব। কাজটা শুরু করেছি গত পরশুদিন। এর আগে মাটি উত্তোলনের অনুমোদন পাওয়ার পর নানা জটিলতা ছিল, বৃষ্টির কারণে শুরু করা হয়নি। যদি প্রয়োজন হয় আমি কাগজ নিয়ে ওখানে যাচ্ছি, না হলে আপনি মেহেরপুর শহরে আসলে আমি কাগজ দেখাচ্ছি।’
পরবর্তী সময়ে তিনি এক গণমাধ্যমকর্মীর হোয়াটসঅ্যাপে আগের নিলামের কিছু কাগজ পাঠান। একইসঙ্গে পাঠানো ভয়েস বার্তায় বলেন, ‘ভাইয়া, আমার কাছে এই কাগজগুলো আছে। যদি এই কাগজ নিয়ে নিউজ কর, তাহলে আমাকে নিউজের লিংকটা দিও।’
তবে পাঠানো কাগজগুলো নতুন করে মাটি অপসারণের অনুমোদন কিংবা নিলামের মেয়াদ বাড়ানোর বৈধতা নিশ্চিত করে না।
মাটি অপসারণের বিষয়ে জানতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নাঈম কামাল, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) শান্ত দত্ত এবং উপসহকারী প্রকৌশলী আলমগীর হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন ধরেননি।
পরে সহকারী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘টেন্ডারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুনভাবে সেখানে কাজ করতে গেলে উপজেলা কমিটি এবং জেলা কমিটির অনুমোদন প্রয়োজন। জেলা কমিটি অনুমোদন দিলে তবেই তারা মাটি নিতে পারবে। তবে সেটা তারা পেয়েছে কি না, এখন পর্যন্ত আমি জানি না। আমি যতটুকু জানি, কাজটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। রোববার আপনি অফিসে এলে বিস্তারিত জানতে পারবেন।’
