ব্যাংকিং জটিলতায় পড়ছেন আদালতের কিছু কর্মী, তবে তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রমে প্রভাব পড়েনি বলে জানিয়েছেন উপপ্রধান কৌঁসুলি নাজহাত শামীম খান। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) কিছু কর্মী ব্যাংকিং-সংক্রান্ত সমস্যার মুখে পড়লেও আদালতের তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। গাজা যুদ্ধসহ বিভিন্ন পরিস্থিতিতে যুদ্ধাপরাধের তদন্তে ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’ হয়েছে বলে তিনি জানান।
বিজ্ঞাপন
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞার কারণে তদন্তের সক্ষমতা বা কাজের পরিধি কমানোর কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি আইসিসি। তবে নিষেধাজ্ঞা আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হলে এর পূর্ণাঙ্গ প্রভাব কী হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
আইসিসির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও চলতি মাসে আইসিসির ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেন। আদালতটিকে ‘বেপরোয়া আদালত’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, আইসিসি তার হুমকি বন্ধ করবে, নতুবা যুক্তরাষ্ট্র আদালতটিকেই বন্ধ করে দেবে।
গত ৯ অক্টোবর ঘোষিত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার আগে আদালতকে ছয় মাসের সময় দেওয়া হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ নিরসনে সমাধান উপস্থাপন ও আলোচনার সুযোগ রাখার কথা জানিয়েছে ওয়াশিংটন। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের কোন পদক্ষেপে সন্তুষ্ট হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
নতুন নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য পুরো প্রতিষ্ঠানটি। এর আগে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আইসিসির ১৩ জন কর্মকর্তা ও কর্মীর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। নাজহাত শামীম খানও তাদের একজন।
ব্যাংকিং ও প্রযুক্তি সেবায় বিকল্পের সন্ধান
নাজহাত শামীম খান জানান, নিষেধাজ্ঞা আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হতে আরো সময় থাকলেও আদালতের কয়েকজন কর্মী ইতিমধ্যে ব্যাংকিং-সংক্রান্ত সমস্যায় পড়েছেন। তার মতে, সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে ব্যাংকগুলো প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করছে।
তিনি বলেন, নীতিগতভাবে নিষেধাজ্ঞা প্রতিষ্ঠানটির ওপর আরোপ করা হয়েছে, ফলে ব্যক্তিগতভাবে কর্মীদের সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা নয়। বাস্তবে অবশ্য কিছু কর্মী ব্যাংকিং সেবা পেতে অসুবিধার কথা জানিয়েছেন।
নিষেধাজ্ঞার প্রভাব মোকাবিলায় আইসিসি নিজেদের প্রযুক্তি ও অন্যান্য সেবাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনছে। আদালতটি মাইক্রোসফটের সফটওয়্যারের পরিবর্তে ইউরোপীয় বিকল্প ব্যবহার শুরু করেছে। পাশাপাশি ব্যাংকিং ও স্বাস্থ্যবিমা সেবা প্রদানকারী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে খান বলেন, ক্রেডিট কার্ড ছাড়া চলাফেরা ও ভ্রমণসহ দৈনন্দিন অনেক কাজই কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে শরণার্থী শিবির কিংবা গণনৃশংসতার ঘটনাস্থল পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তার কাছে এই ব্যক্তিগত অসুবিধাকে ভিন্নভাবে দেখতে সাহায্য করেছে।
তিনি বলেন, যেসব ভুক্তভোগীর জন্য বিচার পাওয়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তাদের কাছে নিষেধাজ্ঞা কিংবা ক্রেডিট কার্ডের বিষয়টি মুখ্য নয়; তারা ন্যায়বিচার চান।
গাজা যুদ্ধের তদন্তে অগ্রগতির দাবি
২০২৪ সালের নভেম্বরে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং দেশটির সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আইসিসি। এরপর গাজা যুদ্ধসংক্রান্ত তদন্তে নতুন কোনো অভিযোগ প্রকাশ্যে না এলেও তদন্ত থেমে নেই বলে জানিয়েছেন খান।
তার ভাষ্য, আদালতের বিচারকদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গ্রেপ্তারি পরোয়ানার নতুন আবেদনসহ সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলো জনসমক্ষে প্রকাশের ক্ষেত্রে গোপনীয়তা বজায় রাখা হচ্ছে। বিচারকেরা প্রকাশের অনুমতি না দেওয়া পর্যন্ত এসব তথ্য প্রকাশ করা যাবে না।
খান বলেন, তদন্তের কোনো পর্যায়ে নতুন পদক্ষেপ নেওয়ার সময় ঘনিয়ে এলেও তা প্রকাশ্যে জানানো সম্ভব নাও হতে পারে। ফলে বাইরে থেকে কার্যক্রম স্থবির মনে হলেও গাজা যুদ্ধের তদন্তসহ অন্যান্য বিষয়েও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, নিষেধাজ্ঞার কারণে কোনো তদন্ত বন্ধ করা হয়নি এবং আদালত তার কার্যক্রমের পরিধি কমানোর সিদ্ধান্তও নেয়নি।
আফগানিস্তান তদন্ত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ
আইসিসির বিরুদ্ধে মার্কিন প্রশাসনের অভিযোগগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের বিচারের আওতায় আনার আশঙ্কার বিষয়টিও রয়েছে। তবে এ বিষয়ে রুবিও ঠিক কাদের বা কোন ঘটনার কথা বলেছেন, তা স্পষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেন খান।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে—এমন ধারণা থেকে উদ্বেগ তৈরি হয়ে থাকতে পারে। তবে আইসিসি এখন পর্যন্ত কোনো মার্কিন নাগরিককে আদালতের সামনে হাজির করেনি।
আফগানিস্তান তদন্তের প্রসঙ্গ তুলে খান বলেন, সেখানে তদন্তের অগ্রাধিকার হলো তালেবান ও ইসলামিক স্টেট খোরাসান (আইএস-কে)-এর বিরুদ্ধে নারী, কিশোরী এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর সংঘটিত অপরাধের অভিযোগ। চলতি মাসে আফগানিস্তানে লিঙ্গভিত্তিক নিপীড়নের অভিযোগে তালেবানের সদস্যদের বিরুদ্ধে জারি করা চারটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রকাশ করে আইসিসির প্রাক-বিচারিক চেম্বার।
সাবেক প্রধান কৌঁসুলিকে ঘিরেও বিতর্ক
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বাইরেও আইসিসির কৌঁসুলি দপ্তরকে আরেকটি জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। আদালতের সাবেক প্রধান কৌঁসুলি করিম খানের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগের বিষয়ে ২০২৪ সালের নভেম্বরের শেষ দিকে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়। ব্রিটিশ আইনজীবী করিম খান অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। পরে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর ভোটের পর তাকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
নতুন প্রধান কৌঁসুলি নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত নাজহাত শামীম খান দপ্তরের দায়িত্ব যৌথভাবে পরিচালনা করছেন।
আইসিসির পাশে ইউরোপীয় ইউনিয়ন
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় আইসিসির রেজিস্ট্রার ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আলোচনা করছেন। নিষেধাজ্ঞার প্রভাব ঠেকানো কিংবা আদালতকে সুরক্ষিত রাখার অন্যান্য উপায় নিয়েও আলোচনা চলছে।
এদিকে আদালতটির প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থনের কথাও তুলে ধরেছেন খান। বৃহস্পতিবার ইউরোপীয় পার্লামেন্ট আইসিসি ও এর কর্মকর্তাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য দেওয়া শাখারভ পুরস্কারে ভূষিত করেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশ আদালতের ব্যয় নির্বাহে আর্থিক সহায়তা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
খানের মতে, আইসিসির প্রতি এই সমর্থন আদালতের কর্মীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। তিনি বলেন, আদালতটির প্রতি এত মনোযোগ থাকার বিষয়টি এর প্রাসঙ্গিকতারই প্রতিফলন।
তিনি আরও বলেন, যেসব ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার পাওয়ার অন্য কোনো পথ নেই এবং যারা রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে নিজেদের কথা তুলে ধরতে চান, তাদের জন্য আইসিসি বিচার পাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
এআরবি
