নাম দিয়েছি তারাঝরা
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩০ এএম
আপডেট: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:২০ এএম
আগারগাঁওয়ে বিশ্বব্যাংক অফিস প্রাঙ্গণে হেমন্তে ফুটেছে তারাঝরা ফুল। ছবি: লেখক
-->‘সামনেই লতা ভরেছে সাদা ফুলে–
বিলিতি নাম, মনে থাকে না–
নাম দিয়েছি তারাঝরা;
রাতের বেলায় গন্ধ তার
ফুলবাগানের প্রলাপের মতো।’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্যামলী কাব্যের ‘সম্ভাষণ’ কবিতায় বিদেশি এক লতানো ফুলের নাম দিয়েছেন ‘তারাঝরা’। বিদেশি নামের বদলে বাংলা ভাষায় ফুলটিকে আপন করে নেওয়ার এই প্রয়াসে মিশে আছে কবির প্রকৃতিপ্রেম ও কল্পনার সৌন্দর্য। কবিতায় ফুলটির প্রজাতি নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। তবে ক্লিমেটিস গণের কোনো ফুলের সঙ্গে এর মিল থাকতে পারে।
হেমন্তের শুরু। আগারগাঁওয়ে বিশ্বব্যাংকের কার্যালয় প্রাঙ্গণে ঢুকে পথের ধার ধরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ নাকে এল মিষ্টি সুগন্ধ। ডানদিকে তাকিয়ে দেখি, লাল সিরামিক ইটের দেয়াল বেয়ে একটি লতা বেশ খানিকটা জায়গাজুড়ে ঝোপ তৈরি করেছে। অজস্র সাদাটে ফুলে ভরে আছে তার ডালপালা। মৃদু রোদে ফুলগুলোর শুভ্রতা আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। মাদকতাময় সুবাসে চারপাশের বাতাস যেন ভরে উঠেছে। পাশেই আরেকটি সুগন্ধি ফুলের ঝোপ–বেলি। দুই ফুলের ঘ্রাণ মিলে তৈরি করেছে এক মনোরম পরিবেশ।
আরও পড়ুন
তারার মতো অসংখ্য ফুলের দিকে তাকালে রবীন্দ্রনাথের দেওয়া ‘তারাঝরা’ নামটি মনে পড়ে। মনে হয়, বসন্তরাতের আকাশের তারাগুলো বুঝি মাটিতে নেমে এসে আশ্রয় নিয়েছে সবুজ লতার বুকে। কবির কল্পনায় পরদেশি ফুলের মঞ্জরি যেন প্রিয়তমার কালো খোঁপায় গেঁথে দেওয়া তারার মালা। তিনি লিখেছেন–
‘সে কথা মনে মনে গড়ে তুলেছি
যেমন করে তুমি জড়িয়ে তুলেছ তোমার খোঁপা।
বলব, ‘প্রিয়ে, এই পরদেশী ফুলের মঞ্জরী
আকাশে চেয়ে খুঁজছিল বসন্তের রাত্রি,
এনেছি আমি তাকে দয়া করে
তোমার ওই কালো চুলে।’
লতাজুড়ে ফুটে থাকা অসংখ্য সাদাটে ফুলের দিকে তাকালে কবিতার এই চিত্রকল্প আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে। সবুজ লতা যেন প্রিয়তমার শ্যামল খোঁপা, আর তার বুকে ফুটে থাকা ফুলগুলো যেন একেকটি উজ্জ্বল তারা।
ক্লিমেটিস (Clematis) রানানকুলেসি (Ranunculaceae) গোত্রের একটি উদ্ভিদ গণ। এ গণের অধিকাংশ প্রজাতি লতানো বা আরোহী স্বভাবের। অনেক প্রজাতির কাণ্ড কাষ্ঠল। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ক্লিমেটিসের বহু প্রজাতি জন্মে। এদের মধ্যে কিছু প্রজাতি ও সংকর জাত বাগানে শোভাবর্ধক উদ্ভিদ হিসেবে চাষ করা হয়। প্রজাতিভেদে ফুলের আকার, রং, গঠন ও সুগন্ধে পার্থক্য দেখা যায়।
ক্লিমেটিসের আধুনিক উদ্যানজাতগুলোর ইতিহাসে Clematis × jackmanii একটি উল্লেখযোগ্য নাম। উনিশ শতকে ইংল্যান্ডের জ্যাকম্যান পরিবারের নার্সারিতে এই সংকর জাত তৈরির কাজ শুরু হয়। ১৮৬২ সালে গাছটিতে প্রথম ফুল ফোটে এবং পরের বছর এটি বাণিজ্যিকভাবে পরিচিতি লাভ করে। এর ফুল বড় ও গাঢ় বেগুনি রঙের। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশের উদ্যানবিদরা ক্লিমেটিসের আরও বহু সংকর জাত উদ্ভাবন করেন, যেগুলো ফুলের রং, আকার ও গঠনের বৈচিত্র্যের জন্য বাগানপ্রেমীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
রবীন্দ্রনাথের ‘তারাঝরা’ ফুলটি ঠিক কোন প্রজাতির ক্লিমেটিস, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। তবে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক উদ্ভিদবৈচিত্র্যে ক্লিমেটিসের একটি উল্লেখযোগ্য প্রজাতি হলো Clematis gouriana Roxb. ex DC.। কিউয়ের রয়্যাল বোটানিক গার্ডেনের Plants of the World Online-এ প্রজাতিটিকে স্বীকৃত উদ্ভিদ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল এবং এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশে এর বিস্তৃতি রয়েছে।
প্রজাতিটির নামের শেষাংশ gouriana এবং প্রাচীন বাংলার গৌড়ের নামের মধ্যে সম্পর্কের কথা উল্লেখ করা হয়। এর তেলেগু নাম হিসেবেও ‘গৌরী-কুন্তলা’ নামটি পাওয়া যায়। এই গৌরী নামের সঙ্গে এ ফুলের প্রজাতিগত নামের শেষাংশেরও মিল খুঁজে পাওয়া যায়। এর ইংরেজি নাম Indian Clematis, Gourian Clematis, Indian Clematis বা Indian travelers's joy. এটি একটি বড় কাষ্ঠল লতানো বা আরোহী স্বভাবের গুল্ম প্রকৃতির উদ্ভিদ। সহায়ক পেলে লতা ৩ থেকে ৮ মিটার লম্বা হতে পারে। ফুলের গড়ন খানিকটা লেবু ফুলের মতো, আকারে ছোট, সবুজাভ-সাদা বা হলুদাভ-সাদা, ১৫ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার লম্বা শাখায়িত পুষ্পমঞ্জরিতে অসংখ্য সুগন্ধী ফুল ফোটে। ফুলের পাপড়ির বিস্তার প্রায় ২ সেন্টিমিটার, চারটি বৃতি থাকে, যা দেখতে পাপড়ির মতোই দেখায়। কেন্দ্রস্থলে ঝুঁটির মতো গুচ্ছাকারে থাকে জননকেশরগুচ্ছ। ফুল ফোটার সময় অক্টোবর থেকে মার্চ। পাতা ১ দশমিক ৫ থেকে ৮ সেন্টিমিটার লম্বা, ডিম্বাকার-বর্শাকৃতি, শীর্ষাগ্র সুচালো, গোড়ার দিক গোলাকার। সবুজ পাতাগুলো লতার দুই পাশে বিপরীতমুখীভাবে সজ্জিত থাকে। বসন্তের শেষে বা গ্রীষ্মের শুরুতে শাখা কলম বা কাটিং অথবা দাবাকলম করে এর চারা তৈরি করা যায়। একসঙ্গে সহজে বিপুলসংখ্যক চারা দ্রুত তৈরি করা হচ্ছে টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে। ছাদবাগান বা খোলা বাগান–সব জায়গাতেই এটি লাগানো যায়। জুঁইয়ের চেয়ে এখন এ ফুলের কদর বাড়ছে।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ
আরও পড়ুন
ডোরা ডানার লম্বা-পদী মাছি
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩০ এএম
আপডেট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪৫ এএম
রমনা উদ্যানে শরৎকালে দেখা ডোরা ডানার লম্বা-পদী মাছি। ছবি: লেখক
-->প্রায় প্রতিদিন ভোরে হাঁটতে যাই রমনা উদ্যানে। চোখের সামনে কত কিছুই না পড়ে! চলতি মাসের ৪ তারিখে হাঁটার রাউন্ড শেষ করে নার্সারির ভেতরে ঢোকার আগেই কয়েকটি নীলজবার চারাগাছ চোখে পড়ল। রাতের শিশিরে ভিজে আছে পাতাগুলো। একটি পাতার ওপর বসে থাকা পোকাটি দেখে থমকে দাঁড়ালাম। মনে হলো, সে যেন ব্যায়াম করছে। ছয়টি লম্বা ও সরু পায়ের মধ্যে সামনের জোড়াটি সামনে বাড়িয়ে কখনো একটির ডগা অন্যটির সঙ্গে ঠেকাচ্ছে, কখনো আবার হাতের তালু ঘষার মতো পরস্পরের সঙ্গে ঘষছে। কিছুক্ষণ পর সামনের পা দুটি আরও সামনে প্রসারিত করে বুকডন দেওয়ার মতো ভঙ্গি করছে, আবার কখনো নাচের মতো ছন্দময়ভাবে নাড়াচ্ছে। সামনের পা দুটি যেন এক মুহূর্তের জন্যও স্থির থাকতে চায় না। অন্যদিকে মাঝের ও পেছনের চারটি পায়ের ওপর ভর করে দেহটিকে বেশ খানিকটা উঁচু করে রেখেছে। পা ছয়টিই লম্বা, সরু ও কালচে-বাদামি। তবে সামনের পায়ের অগ্রভাগ সাদা। পা দুটি ছড়িয়ে দিয়ে এমন ভঙ্গি করছে, যেন একটি বোলতা। তাই প্রথম দেখায় তাকে বোলতা বলে ভুল করেছিলাম।
কুড়ি বছরেরও বেশি আগে ধানখেতে পোকামাকড় শনাক্ত করার প্রশিক্ষণ দেওয়ার সময়ও এ ধরনের পোকা দেখে বিভ্রান্ত হতাম। প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে ধানখেত থেকে হাতজাল দিয়ে পোকামাকড় সংগ্রহ করে সেগুলো ক্লোরোফর্ম দিয়ে অচেতন করার পর সাদা কাগজের ওপর রাখা হতো। এরপর প্রশিক্ষণার্থীদের সেগুলো বাছাই করতে বলা হতো। এর উদ্দেশ্য ছিল দুটি। প্রথমত, ধানগাছের নির্দিষ্ট বৃদ্ধিপর্যায়ে কী কী পোকামাকড় উপস্থিত থাকে, তা শনাক্ত করা। দ্বিতীয়ত, তাদের মধ্যে কী ধরনের সম্পর্ক রয়েছে এবং ধানখেতের জন্য কোনটি উপকারী আর কোনটি ক্ষতিকর, তা নির্ধারণ করা।
পোকামাকড় বাছাইয়ের সময় এমন কিছু পতঙ্গ পাওয়া যেত, যেগুলো আমরা সহজে চিনতে পারতাম না। সেগুলোকে নিরপেক্ষ পোকাদের দলে রাখা হতো। অর্থাৎ ধানখেতে তাদের ভূমিকা সম্পর্কে আমাদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য ছিল না। এসব পোকাদের মধ্যে প্রায়ই এই লম্বা-পদী মাছির দেখা পেতাম। প্রথম দেখায় কখনো মনে হতো, এটি বোলতা। বোলতা হলে তাকে উপকারী পোকাদের দলে রাখা যেত। কিন্তু আতশি কাচ দিয়ে ভালো করে পরীক্ষা করলে বোঝা যেত, এটি আসলে মাছি। মাছির সাধারণত এক জোড়া কার্যকর ডানা থাকে, আর বোলতার সাধারণত দুই জোড়া। বহুদিন পর রমনা উদ্যানে সেই পোকাটিকে দেখে পুরোনো দিনের কথাগুলো মনে পড়ে গেল। তবে এবার আর তাকে অচেনা মনে হলো না। এটি এক ধরনের লম্বা-পদী মাছি, ইংরেজিতে যাকে বলা হয় স্টিল্ট-লেগড ফ্লাই (Stilt-legged fly)।
আরও পড়ুন
মাছি ডিপ্টেরা (Diptera) বর্গের অন্তর্ভুক্ত। এদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এক জোড়া কার্যকর ডানা থাকা। মশা-মাছিসহ আমাদের চারপাশে দেখা অনেক পরিচিত পতঙ্গই এই বর্গের সদস্য। পৃথিবীতে ডিপ্টেরা বর্গের বিপুলসংখ্যক প্রজাতি রয়েছে। এদের মধ্যে মাইক্রোপেজিডি (Micropezidae) নামে একটি পরিবার রয়েছে। এই পরিবারের মাছিগুলো সাধারণভাবে স্টিল্ট-লেগড ফ্লাই বা লম্বা-পদী মাছি নামে পরিচিত। এদের পা অন্য অনেক মাছির তুলনায় লম্বা ও সরু। কিছু প্রজাতির সামনের পায়ের ভঙ্গি ও নড়াচড়া বোলতার কথা মনে করিয়ে দেয়।
রমনা উদ্যানে দেখা মাছিটির ডানায় গাঢ় রঙের পট্টি বা ডোরার মতো নকশা ছিল। এ বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে এর বাংলা নাম দেওয়া যেতে পারে ‘ডোরা ডানার লম্বা-পদী মাছি’। তবে এর নির্দিষ্ট প্রজাতি নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা যায়নি। লম্বা-পদী মাছিদের মধ্যে ডানার নকশা, পায়ের গঠন ও দেহের রঙে প্রজাতিভেদে পার্থক্য দেখা যায়। তাই শুধু বাহ্যিক চেহারার ভিত্তিতে এর সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক পরিচয় নির্ধারণ করা কঠিন।
লম্বা-পদী মাছির দেহ সাধারণত সরু ও লম্বাটে হয়। মাথার দুই পাশে থাকে যৌগিক চোখ। পা ছয়টি, লম্বা ও চিকন। অনেক প্রজাতির পায়ে কালচে বা বাদামি রঙের পাশাপাশি হালকা রঙের বলয় দেখা যায়। ডানা সাধারণত স্বচ্ছ হলেও তাতে গাঢ় ছোপ, পট্টি কিংবা ডোরার মতো নকশা থাকতে পারে। ডানার এসব নকশা ও পায়ের গঠন প্রজাতি শনাক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
মাছিটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো সামনের পা দুটি অনবরত নাড়ানো। পা দুটি কখনো সামনে প্রসারিত করছে, কখনো একটির সঙ্গে অন্যটি ঠেকাচ্ছে, আবার কখনো ছড়িয়ে রাখছে। এ আচরণের কারণে তাকে অনেকটা বোলতার মতো দেখায়। কিছু পতঙ্গের ক্ষেত্রে অন্য প্রাণীর মতো দেখানোর বৈশিষ্ট্য শিকারিদের বিভ্রান্ত করতে এবং আত্মরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এই মাছিটির সামনের পা নাড়ানোর সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য কী, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।
লম্বা-পদী মাছির বিভিন্ন প্রজাতির খাদ্যাভ্যাস ও জীবনচক্রে পার্থক্য রয়েছে। কিছু প্রজাতির পূর্ণবয়স্ক মাছি ছোট পতঙ্গ শিকার করে। অন্য কিছু প্রজাতি পচনশীল জৈব পদার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবেশে দেখা যায়। এদের লার্ভা বা শূককীটের আবাসস্থলও প্রজাতিভেদে ভিন্ন হতে পারে। মাটি, পচা উদ্ভিদাংশ কিংবা অন্যান্য জৈব পদার্থসমৃদ্ধ পরিবেশে কোনো কোনো প্রজাতির লার্ভা বেড়ে ওঠে।
রমনা উদ্যানে দেখা ক্ষুদ্র মাছিটি আবারও মনে করিয়ে দিল, পরিচিত পরিবেশের মধ্যেও কত বিচিত্র প্রাণী আমাদের চোখের সামনে বিচরণ করে। একটি পাতার ওপর বসে সামনের পা নাড়াতে থাকা ছোট্ট পতঙ্গও কৌতূহল জাগাতে পারে, ফিরিয়ে আনতে পারে বহুদিনের পুরোনো স্মৃতি।
আরও পড়ুন
ঔষধি উদ্ভিদ পূর্বী ভাঁট
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩০ এএম
আপডেট: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪০ এএম
ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেনে দেখা পূর্বী ভাঁট। ছবি: লেখক
-->প্রকৃতির অরণ্য, পাহাড় ও ঝোপঝাড়ে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য প্রজাতির উদ্ভিদ, যেগুলোর অধিকাংশের পরিচয় ও গুরুত্ব সাধারণ মানুষের অজানা। এসব উদ্ভিদের কিছু প্রজাতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে লোকজ চিকিৎসা ও খাদ্যসংস্কৃতির অংশ হয়ে আছে। তেমন একটি উদ্ভিদ হলো হেয়াতি বা পূর্বী ভাঁট। উত্তর-পূর্ব ভারতের কয়েকটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে এটি নেফাফু নামে পরিচিত। আমাদের দেশের পার্বত্য অঞ্চলে উদ্ভিদটির ব্যবহার দেখা যায়। লোকজ চিকিৎসায়, বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে গাছটির পাতা ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে।
২০২৫ সালের ১৬ আগস্ট ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেনে উদ্ভিদটির সন্ধান পাই।
পূর্বী ভাঁটের আদি বিস্তৃতি হিমালয় অঞ্চল থেকে দক্ষিণ চীন ও ইন্দোচীন পর্যন্ত। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, মায়ানমার, থাইল্যান্ডসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে এর বিস্তৃতি রয়েছে। এ উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নাম Clerodendrum colebrookeanum, এটি Lamiaceae পরিবারের উদ্ভিদ।
আরও পড়ুন
পূর্বী ভাঁট একটি বহুবর্ষজীবী গুল্ম বা ছোট উদ্ভিদ। অনুকূল পরিবেশে এটি কয়েক মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। বিশেষ করে আর্দ্র গ্রীষ্মমণ্ডলীয় পরিবেশে গাছটি ভালো জন্মে। গাছটির গঠন ঝোপালো হওয়ায় অন্যান্য গুল্মের সঙ্গে সহজেই মিশে থাকে। এর কাণ্ড শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত এবং কচি ডালপালা তুলনামূলকভাবে কোমল। গাছের শাখার অগ্রভাগে গুচ্ছবদ্ধভাবে ছোট ছোট ফুল ফোটে। ফুল সাধারণত সাদা বা হালকা সাদাটে রঙের। ফুলের বাইরে বেরিয়ে থাকা লম্বা পুংকেশর ফুলের গুচ্ছকে স্বতন্ত্র রূপ দেয়। ফুল ফোটার সময় গাছটি বেশ আকর্ষণীয় দেখায়। ফুলের পর ছোট মাংসল ফল তৈরি হয়। পরিপক্বতার সঙ্গে ফলের রং পরিবর্তিত হতে পারে। ফুল ও ফলের গঠন উদ্ভিদটিকে সঠিকভাবে শনাক্ত করার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
এ গাছের পাতাগুলো বেশ বড়, সাধারণত ডিম্বাকার থেকে হৃৎপিণ্ডাকৃতির। পাতার অগ্রভাগ সুচালো, কিনারা করাতের দাঁতের মতো খাঁজযুক্ত। পাতাগুলো কাণ্ডে বিপরীতক্রমে সাজানো থাকে। পাতার রং সবুজ। পাতা হাত দিয়ে ঘষলে একটি স্বতন্ত্র গন্ধ পাওয়া যায়, যা গাছটিকে শনাক্তে সহায়তা করতে পারে। তবে শুধু গন্ধ বা পাতার আকৃতি দেখে উদ্ভিদটির পরিচয় নিশ্চিত করা ঠিক নয়।
পূর্বী ভাঁট শুধু একটি বুনো গুল্ম নয়, এটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা ও খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। লোকজ চিকিৎসায় এর পাতা উচ্চ রক্তচাপ, হজমের সমস্যা ও কয়েকটি প্রদাহজনিত উপসর্গে ব্যবহারের কথাও বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। উদ্ভিদটির রক্তচাপ-হ্রাসকারী প্রভাব নিয়ে পরীক্ষাগার ও প্রাণীভিত্তিক গবেষণাও হয়েছে। এসব গবেষণায় কিছু জৈবসক্রিয় উপাদানের সম্ভাব্য ভূমিকার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে গাছটির নির্যাস কীভাবে কাজ করে, মানুষের ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা কতটা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে কী ধরনের ঝুঁকি থাকতে পারে, এসব বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
লোকজ চিকিৎসায় উদ্ভিদটি ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। এর বিভিন্ন নির্যাসে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসহ কিছু জৈবসক্রিয় উপাদান শনাক্ত হয়েছে। প্রাথমিক গবেষণায় রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সম্ভাব্য প্রভাবের ইঙ্গিত থাকলেও ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় এর কার্যকারিতা ও নিরাপদ মাত্রা প্রতিষ্ঠিত নয়। তাই একে ডায়াবেটিসের প্রমাণিত চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
উদ্ভিদটির নির্যাসের প্রদাহবিরোধী ও ব্যথা উপশমকারী বৈশিষ্ট্য নিয়েও গবেষণা হয়েছে। তবে গবেষণাগার বা প্রাণীর ওপর পাওয়া ফলাফল সরাসরি মানুষের চিকিৎসায় কার্যকর বলে ধরে নেওয়া যায় না। এ বিষয়ে আরও নিয়ন্ত্রিত গবেষণা প্রয়োজন।
বিভিন্ন অঞ্চলের লোকজ চিকিৎসায় পূর্বী ভাঁটের পাতা পেটের অস্বস্তি, ডায়রিয়া ও আমাশয়ের মতো সমস্যায় ব্যবহারের বিবরণ রয়েছে। কিছু জনগোষ্ঠী শারীরিক অন্যান্য সমস্যাতেও গাছটির বিভিন্ন অংশ ব্যবহার করে আসছে। এসব ব্যবহার ঐতিহ্যগত জ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও চিকিৎসায় এর কার্যকারিতা নিয়ে বৈজ্ঞানিক কোনো প্রমাণ নেই।
পূর্বী ভাঁটের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো খাদ্য হিসেবে এর ব্যবহার। উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর খাদ্যসংস্কৃতিতে গাছটির কচি পাতা শাক হিসেবে রান্না করে খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। কখনো পাতা সেদ্ধ করে, কখনো অন্য উপকরণের সঙ্গে মিশিয়ে রান্না করা হয়। এই ব্যবহার উদ্ভিদটির সঙ্গে স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের পরিচয় বহন করে। তবে কোনো জনগোষ্ঠীর খাদ্যাভ্যাসে উদ্ভিদটির প্রচলন থাকলেই সেটিকে সবার জন্য সমানভাবে নিরাপদ বা রোগ নিরাময়ে কার্যকর বলে ধরে নেওয়া যায় না।
লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মুমিনুন্নিসা সরকারি কলেজ, ময়মনসিংহ
আরও পড়ুন
বনে সবুজতাউড়া
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩০ এএম
আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১১ এএম
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির হাজারিখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে সবুজতাউড়া। ছবি: শাহানুল করিম চপল
-->ছেলেবেলায় গ্রামে ‘তাউড়া’ নামের একটি লম্বা লেজওয়ালা পাখি চিনতাম। পাখিটি আমাদের কবুতরের খোপের কাছে দিনের বেলায় বারবার আসা-যাওয়া করত। কবুতরের ছানা নিয়ে যেতে তার এই আসা-যাওয়া। সুযোগ পেলেই খোপে ঢুকে ছানা নিয়ে উড়াল দিত। যে কারণে আমরা এ পাখি এলেই সতর্ক থাকতাম, কখনো কখনো তাড়িয়ে দিতাম। তাড়া খেয়ে সে উড়ে বাড়ির বাগানের আমগাছে চলে যেত। কয়েক জোড়া ‘তাউড়া’ আমাদের বাড়িতে বসবাস করত। এ পাখি গাছের ডালে বসে ‘কো… কি…লি…; কো…কি…লি…’ সুরে ডাকত এবং তার লম্বা লেজটি দোলাত। এ কারণে কেউ কেউ পাখিটিকে ‘লেজদোলানো পাখি’ নামে ডাকত। অনেক পরে জেনেছি, এ পাখির আরেক নাম খয়রা হাঁড়িচাচা। এ পাখির যে আরও জাতভাই আছে, সেটি ছেলেবেলায় জানা ছিল না। তখন পাখি নিয়ে কোনো বই ছিল না। তাই কেবল গ্রামে যে পাখি বসবাস করত, তাদের চিনতাম দেখে দেখে এবং বড়দের কাছ থেকে স্থানীয় নাম জেনে নিতাম।
তাউড়া বা হাঁড়িচাচা, কাক পরিবারের (Corvidae) পাখি। এ পরিবারে হাঁড়িচাচার পাশাপাশি এদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ‘সবুজতাউড়া’ পাহাড়ি বনে বসবাস করে। ২০১৪ সালে রাঙামাটির কাপ্তাই অরণ্যে পাখি দেখতে গিয়ে পাতি সবুজতাউড়ার সঙ্গে প্রথম দেখা হয়। পাখিটি তার ছানাদের নিয়ে পাতার আড়ালে আড়ালে চলাফেরা করছিল। এক অপূর্ব সুন্দর পাখি! এর ইংরেজি নাম Common Green Magpie. সবুজ পালক, উজ্জ্বল লাল ঠোঁট আর চোখের চারপাশে নীলচে-কালো রেখা–সব মিলিয়ে পাখিটির চেহারায় রয়েছে এক অনন্য আকর্ষণ। বনের সবুজের মধ্যে এমন একটি রঙিন পাখির দেখা পাওয়া নিঃসন্দেহে আমার জন্য স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। ঘন গাছপালা আর বুনো পরিবেশের মধ্যে এমন বর্ণিল পাখির উপস্থিতি মনে করিয়ে দেয়, আমাদের বনে এখনো কত বিস্ময় লুকিয়ে আছে।
এ পাখিকে অনেকে সবুজ হাঁড়িচাচাও বলে থাকেন। পাখিটির দেহের অধিকাংশ পালক উজ্জ্বল সবুজ। মাথার ওপরের অংশ হলদে আভাযুক্ত, চোখের ওপর দিয়ে মাথার পেছন পর্যন্ত বিস্তৃত কালো মুখোশের মতো দাগ, আর ঠোঁট ও পা লালচে। লম্বা লেজের ডগায় থাকে সাদা অংশ। ডানার পালকে লালচে-বাদামি রংও দেখা যায়।
আরও পড়ুন
চিরসবুজ বন, আর্দ্র গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বন, বাঁশঝাড় ও ঘন ঝোপঝাড় এ পাখির পছন্দের আবাসস্থল। সাধারণত এটি বনের গাছপালায় বিচরণ করে। বনে এরা একা অথবা জোড়ায় চলে। ঘন পাতার আড়ালে চলাফেরা করার কারণে অনেক সময় পাখিটিকে খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু একবার চোখে পড়লে এর উজ্জ্বল রং ও দীর্ঘ লেজ সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। খাবারের সন্ধানে এরা এক ডাল থেকে অন্য ডালে উড়ে বেড়ায়। এ পাখির খাবারের তালিকায় আছে বিভিন্ন পোকামাকড়, ছোট সরীসৃপ এবং অন্য পাখির ডিম বা ছানা।
এ পাখির বিস্তৃতি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে, যার মধ্যে উত্তর-পূর্ব ভারত, মায়ানমার ও থাইল্যান্ড অন্যতম। এটি বাংলাদেশের একটি দুর্লভ আবাসিক পাখি। সিলেট, চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বনে এ পাখি দেখা যায়।
লেখক: নিসর্গী ও পরিবেশবিদ, জার্মান অ্যারোস্পেস সেন্টার
আরও পড়ুন
বড় ভীমরাজের গল্প
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৪৫ এএম
সুন্দরবনের করমজলে গাছের ডালে একজোড়া বড় ভীমরাজ পাখি। ছবি: লেখক
-->২০০৪ সালের ৩ নভেম্বর। নাইকন ফ্যান ক্লাবের সঙ্গে বিরল ও দুর্লভ পাখি-প্রাণীর সন্ধানে সুন্দরবনে এসেছি। তিন দিনের অভিযান শেষে সকাল সাড়ে ৭টায় করমজল এসে নামলাম। প্রায় আড়াই ঘণ্টা ঘুরে ১৬ প্রজাতির পাখি ও বানরের ছবি তুলে করমজলের নতুন সেতুর এক জায়গায় এসে দাঁড়ালাম খানিকটা বিশ্রাম নেওয়ার জন্য। কিন্তু বিশ্রাম নিতে চাইলেই কি নেওয়া যায়? এখানে বনের ভেতরটা বেশ অন্ধকার। সেই অন্ধকারেই কুচকুচে কালো কিছু একটাকে নড়তে দেখে ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রাখলাম। কালো রঙের দুটি পাখি গাছের ডালে বসে আছে। তাদের মাথায় আছে চমৎকার ঝুঁটি ও লেজে মোরগের মতো লম্বা দুটি পালক; যার আগায় একটি গোলাকার বলের মতো। যদিও পাখিটি আমার কাছে নতুন নয়, কিন্তু একসঙ্গে দুটিকে সব সময় পাওয়া যায় না।
তাই দ্রুত ক্লিক করলাম। এরপর রিভিউ করতেই বুঝতে পারলাম এরা অল্পবয়স্ক পাখি।
এ পাখিকে প্রথম দেখি ১৯৯৪ সালে রাঙামাটির কাপ্তাই পাল্পউড বাগান বিভাগে, খালাত ভাই মো. শফিকুর রহমানের বাসায় বেড়াতে গিয়ে।
আরও পড়ুন
যা হোক, করমজলে দেখা এই পাখিজোড়া এ দেশের ‘পাখির রাজা’ খ্যাত ফিঙের জাতভাই ‘মহারাজা সিংহরাজ’। তবে বড় ভীমরাজ নামেই বেশি পরিচিত। কোথাও কোথাও পাখিটি ধীরাজ নামেও পরিচিত। বাগেরহাটের ফকিরহাট ও খুলনার রূপসার দুটি গ্রামের বাঁশবাগানে ১৯৯৬ সালে ভীমরাজ দেখেছিলাম। রাগে ঘাড় ফোলালে সিংহের কেশরের মতো দেখায় বলে খুলনা-বাগেরহাটে এরা সিংহরাজ বলে পরিচিত। তা ছাড়া যখন তীরবেগে উড়ে তখন নাকি বাতাসে সিংহের গর্জনের মতো শব্দ হয়, তাই এই নাম। ইংরেজি নাম Greater Racket-tailed Drongo| ডাইক্রুরিডি (Dicruridae) গোত্রের এই সদস্যের বৈজ্ঞানিক Dicrurus paradiseus (ডাইক্রুরাস প্যারাডিসিয়াস)। পাখিটির ১৩টি উপ-প্রজাতি রয়েছে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দেখা মিলে।
বড় ভীমরাজ মাঝারি আকারের পাখি। লেজবাদে বাকি দেহের দৈর্ঘ্য ৩১-৩৬ সেন্টিমিটার। লেজসহ ৬৫-৭০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। ওজন ৭০-১২০ গ্রাম। তারের মতো লম্বা লেজের বাইরের পালক দুটির শেষ প্রান্তে রয়েছে প্যাঁচানো উজ্জ্বল কালো ফিতা বা র্যাকেট। দেহের পালক একনজরে ধাতব দ্যুতিময় নীলচে-কালো। সামান্য সবুজাভ আভাও দেখা যায়। মাথার সামনে সুস্পষ্ট ও চমৎকার ঝুঁটি। ঠোঁট, পা, পায়ের পাতা ও আঙুল কালো। চোখের মণি লাল। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির পালক কালচে-বাদামি, অল্প চকচকে। প্রথমেই এদের লেজের লম্বা পালক গজায় না। ঝুঁটিও থাকে ছোট। চোখের মণি বাদামি। এক বছর বয়েসি পাখির পেট ও তলপেটে সাদাটে-ধূসর ছিটছোপে ভরা থাকে।
এরা দেশের সব প্রাকৃতিক বন, বাদাবন, স্যাঁতসেঁতে ঘন জঙ্গল ও বাঁশঝাড়ের বাসিন্দা। একাকী বা জোড়ায় থাকে। বনের মাঝের বা নিচের সারিতে বেশ দেখা যায়। বেশ সাহসী পাখি। ধনেশের মতো বাড় পাখিকেও তাড়িয়ে নিয়ে যায়। মূলত উড়ন্ত পোকামাকড় খায়। সন্ধ্যার অল্প আলোতেও বেশ সক্রিয় থাকে। ফুলের নির্যাসও খেতে পারে। সচরাচর ‘চ্যাক্---চ্যাক্---চ্যা-চা’, ‘ৎসি---রাংগ’ ইত্যাদি স্বরে ডাকে। তবে বিভিন্ন রকমের মিষ্টি সুরেলা শিস, অন্যান্য পাখিদের ডাক এবং মানুষের কথাও অনুকরণ করতে পারে।
এপ্রিল থেকে আগস্ট প্রজননকাল। এ সময় গাছের উঁচু শাখায় সরু শিকড়-বাঁকড় দিয়ে বাটির মতো বাসা বানায়। স্ত্রী তাতে ২-৪টি পাটকিলে রঙের ডিম পাড়ে। ডিম ফোটে ১৫-১৭ দিনে। ছানারা উড়তে শিখে ১৭-২৮ দিনে। ডিম থেকে ফোটার ৪-৬ সপ্তাহে সম্পূর্ণ ছানারা স্বাবলম্বী হয়ে যায়। আয়ুষ্কাল ১০-১৫ বছর।
লেখক: পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
