স্বাভাবিক প্রসবের অপেক্ষায় ছিলেন প্রসূতি। চলছিল চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে নরমাল ডেলিভারির চেষ্টা। কিন্তু হঠাৎ গর্ভের শিশুর শ্বাসকষ্ট দেখা দেওয়ায় বদলে যায় পরিস্থিতি। মা ও অনাগত সন্তানের নিরাপত্তায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। এমন সংকটময় মুহূর্তে রোগীকে অন্য হাসপাতালে পাঠানোর পরিবর্তে নিজেদের হাসপাতালেই জরুরি অস্ত্রোপচারের উদ্যোগ নেন চিকিৎসকেরা। তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সফল হয় অস্ত্রোপচার। পৃথিবীর আলো দেখে নবজাতক, সুস্থ রয়েছেন মা-ও।
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শনিবার রাতের ঘটনা এটি। হাসপাতালটির ইতিহাসে এই প্রথম নরমাল ডেলিভারির চেষ্টা চলাকালে জটিলতা দেখা দেওয়ায় জরুরি ভিত্তিতে সিজারিয়ান অপারেশন সম্পন্ন হয়। উপজেলা পর্যায়ে জরুরি প্রসূতিসেবার সক্ষমতার ক্ষেত্রে ঘটনাটিকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে সিজারিয়ান অপারেশন একেবারে নতুন কিছু নয়। প্রয়োজনীয় জনবল, অবকাঠামো ও অস্ত্রোপচারের সুবিধা থাকা কিছু হাসপাতালে নিয়মিত সিজার করা হয়। তবে এসব অস্ত্রোপচারের অনেকগুলোই আগে থেকে নির্ধারিত থাকে। অর্থাৎ, চিকিৎসকেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সিদ্ধান্ত নেন যে স্বাভাবিক প্রসবের পরিবর্তে সিজারিয়ান অপারেশন প্রয়োজন। সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন প্রসূতি।
কিন্তু নরমাল ডেলিভারির চেষ্টা চলার মধ্যে হঠাৎ মা বা গর্ভের শিশুর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। তখন দ্রুত সিদ্ধান্ত, প্রস্তুত অস্ত্রোপচার দল, অ্যানেস্থেশিয়ার ব্যবস্থা এবং অপারেশন থিয়েটারের সক্ষমতা। সবকিছু একসঙ্গে নিশ্চিত করা জরুরি। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সময়ের গুরুত্ব অনেক বেশি। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে পাঠাতে হয়। বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবার সেই সংকটময় পরিস্থিতিতেই জরুরি সিজারের প্রয়োজন দেখা দেয়।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, স্বাভাবিক প্রসবের জন্য ভর্তি হওয়া ওই প্রসূতির গর্ভের শিশুর শ্বাসকষ্ট শুরু হলে দ্রুত অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর প্রয়োজন পড়ে। তবে সেদিন হাসপাতালে গাইনি বিশেষজ্ঞ ও সার্জনসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসক উপস্থিত থাকায় এবং রোগীর স্বজনদের সম্মতি পাওয়ায় সেখানেই অস্ত্রোপচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
চিকিৎসকদের দ্রুত ও সমন্বিত প্রচেষ্টায় সফলভাবে সম্পন্ন হয় সিজারিয়ান অপারেশন। অস্ত্রোপচারের পর মা ও নবজাতক দুজনই সুস্থ রয়েছেন।
অস্ত্রোপচারে প্রধান সার্জন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের গাইনি বিশেষজ্ঞ ও সার্জন ডা. পিনাকি দাশ। সহকারী সার্জন ছিলেন ডা. রওনক নাজনীন। অ্যানেস্থেশিওলজিস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ডা. মো. আবু সুফিয়ান। অপারেশন থিয়েটারের দায়িত্বে ছিলেন সিনিয়র স্টাফ নার্স লিপি।
পুরো কার্যক্রমের তত্ত্বাবধানে ছিলেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. প্রিয়াঙ্কা চক্রবর্তী এবং আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মুমিনুল হক।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এ সফল অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির জরুরি প্রসূতিসেবা দেওয়ার সক্ষমতা নতুনভাবে সামনে এসেছে। বিশেষ করে নরমাল ডেলিভারির চেষ্টা চলাকালে জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় জনবল ও সমন্বিত উদ্যোগ কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা স্পষ্ট হয়েছে।
উপজেলা পর্যায়ে এ ধরনের সেবা কার্যকর করা গেলে জরুরি পরিস্থিতিতে রোগীকে দূরের হাসপাতালে নেওয়ার ঝুঁকি ও সময়ের চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে এ জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী, সার্বক্ষণিক প্রস্তুতি, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং অস্ত্রোপচার-পরবর্তী পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা।
বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এ উদ্যোগ তাই শুধু একটি সফল অস্ত্রোপচারের ঘটনা নয়; বরং জরুরি মুহূর্তে স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার সক্ষমতারও একটি দৃষ্টান্ত। মা ও নবজাতকের সুস্থতা এ ঘটনার সবচেয়ে স্বস্তির দিক। একই সঙ্গে এটি মনে করিয়ে দেয়, প্রসবকালীন জটিলতায় দ্রুত সিদ্ধান্ত ও যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা মা ও শিশুর নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. প্রিয়াংকা চক্রবর্তী বাংলানিউজকে বলেন, ‘উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রথমবারের মতো জরুরি সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে সন্তান প্রসব সম্পন্ন হয়েছে। এটি আমাদের স্বাস্থ্যসেবার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। এর মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে জরুরি প্রসূতিসেবা দেওয়ার সক্ষমতা আরও বাড়ল। আমরা চাই, বাঁশখালীর মানুষ যেন প্রয়োজনীয় মাতৃস্বাস্থ্যসেবা নিজ উপজেলাতেই পান। মা ও নবজাতক দুজনই সুস্থ আছেন। ভবিষ্যতেও এ ধরনের জরুরি সেবা অব্যাহত রাখতে আমরা কাজ করে যাব।’
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের গাইনি সার্জন ডা. পিনাকি দাশ বলেন, ‘নরমাল ডেলিভারির জন্য প্রসূতিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় জরুরি সিজারিয়ান অপারেশনের প্রয়োজন দেখা দেয়। এরপর প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে সফলভাবে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করা হয়। বর্তমানে মা ও নবজাতক দুজনই সুস্থ আছেন। বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রথমবারের মতো এ ধরনের জরুরি সিজারিয়ান অপারেশন সম্পন্ন হওয়া আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। আমরা চাই, উপজেলা পর্যায়েই প্রসূতিরা প্রয়োজনীয় জরুরি স্বাস্থ্যসেবা পান এবং জটিল পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়।’
উপজেলা মেডিকেল অফিসার (আইসিটি) ডা. আছরার উল্লাহ নূরী বলেন, ‘বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রথমবারের মতো জরুরি সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে সন্তান প্রসব সম্পন্ন হওয়া আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। এর মধ্য দিয়ে উপজেলা পর্যায়ে জরুরি মাতৃস্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে নতুন একটি অধ্যায় যুক্ত হলো। প্রসূতিকে প্রথমে স্বাভাবিক প্রসবের জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। পরে শারীরিক অবস্থা ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভিত্তিতে জরুরি সিজারিয়ান অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় সফলভাবে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। বর্তমানে মা ও নবজাতক দুজনই সুস্থ রয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এ ধরনের জরুরি সেবা চালু ও কার্যকর রাখা গেলে স্থানীয় মানুষের ভোগান্তি অনেকটাই কমবে। বিশেষ করে প্রসূতিদের জরুরি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনে দূরের হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে যে সময় ও ঝুঁকি তৈরি হয়, তা কমাতে উপজেলা পর্যায়ে সক্ষমতা বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চাই, বাঁশখালীর মানুষ যেন নিজ উপজেলাতেই মানসম্মত ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পান। এ জন্য চিকিৎসক, নার্স ও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। ভবিষ্যতেও রোগীদের নিরাপত্তা ও সেবার মান বজায় রেখে এ ধরনের চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রাখার বিষয়ে আমরা আশাবাদী।’
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মুমিনুল হক বলেন, ‘বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রথমবারের মতো জরুরি সিজারিয়ান অপারেশন সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় মা ও নবজাতক দুজনই সুস্থ রয়েছেন। এ উদ্যোগ উপজেলা পর্যায়ে জরুরি প্রসূতিসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
The post বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রথম জরুরি সিজার, সুস্থ মা ও নবজাতক appeared first on বাংলাধারা.
