দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়িয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করার প্রচেষ্টায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে নোয়াখালীর সেনবাগের সুন্দলপুর-৪ মূল্যায়ন কাম উন্নয়ন কূপ। প্রাথমিক হিসাবে, কূপটি থেকে প্রতিদিন প্রায় ৭০ লাখ ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে। কূপটির গ্যাস প্রবাহ, মজুত ও দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনক্ষমতা যাচাইয়ের কাজ চলছে। পরীক্ষায় সম্ভাবনা নিশ্চিত হলে দেশের গ্যাস সরবরাহে যুক্ত হবে নতুন জোগান, যা আমদানিনির্ভরতা কমানোর বৃহত্তর প্রচেষ্টায় সহায়ক হতে পারে।
দেশের গ্যাস খাতে দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জের মধ্যে সুন্দলপুরের এই সম্ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা ও অন্যান্য খাতে গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে; অন্যদিকে পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন কমে আসায় সরবরাহে চাপ তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন কূপ অনুসন্ধান, বিদ্যমান ক্ষেত্রের উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানো এবং নতুন মজুত শনাক্ত করার উদ্যোগ দেশীয় জ্বালানি খাতকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দলপুর-৪-এর মতো উদ্যোগের সুফল বাড়াতে হলে বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি কূপ খননের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। স্থলভাগ ও সমুদ্রাঞ্চলে অনুসন্ধান জোরদার, সম্ভাবনাময় কূপ দ্রুত উৎপাদনে আনা, পুরোনো কূপের সংস্কার এবং গ্যাস পরিবহনের অবকাঠামো উন্নয়নের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এতে দেশীয় সম্পদের ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকিও কমানো সম্ভব।
নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার নবীপুর ইউনিয়নের বড় চারিগাঁও গ্রামে সুন্দলপুর-৪ কূপের খননকাজ শুরু হয় গত ২৮ জুলাই। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) তথ্য অনুযায়ী, ডিরেকশনাল ওয়েল পদ্ধতিতে এমডব্লিউডি প্রযুক্তি ব্যবহার করে কূপটি ১ হাজার ৫৭৮ মিটার গভীর পর্যন্ত খনন করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৪২০ থেকে ১ হাজার ৪৬০ মিটার গভীরতার স্তরে গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
কূপটিতে বর্তমানে ড্রিল স্টেম টেস্ট (ডিএসটি) চলছে। প্রকল্প পরিচালক মো. মোজাম্মেল হক জানিয়েছেন, পরীক্ষা শেষ হলে গ্যাসের মজুত ও উত্তোলনযোগ্য পরিমাণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
প্রাথমিক হিসাবে দৈনিক ৭০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হলে জাতীয় গ্রিডে বাড়তি জোগান যুক্ত হবে। তবে দেশের দৈনিক চাহিদা ও বিদ্যমান ঘাটতির তুলনায় এ পরিমাণ সীমিত। ফলে কূপটি উৎপাদনে গেলেও এককভাবে শিল্প, বিদ্যুৎ, সার ও আবাসিক খাতের গ্যাস সংকট দূর হবে না। এর গুরুত্ব হলো, দেশীয় উৎস থেকে সরবরাহ বাড়ানোর ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় এটি একটি নতুন সংযোজন হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে ভূগর্ভে গ্যাসের উপস্থিতি এবং বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কূপের চাপ, গ্যাস প্রবাহের হার, ভূতাত্ত্বিক কাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনক্ষমতা যাচাইয়ের পরই এর প্রকৃত সম্ভাবনা নির্ধারণ করা যাবে। পরীক্ষার ফল ইতিবাচক হলে পরবর্তী উন্নয়ন ও উৎপাদন পরিকল্পনা নির্ধারণ সহজ হবে।
অনুসন্ধান বাড়লেই খুলবে নতুন সম্ভাবনা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরুল ইমাম দীর্ঘদিন ধরে দেশের স্থলভাগ ও সমুদ্রাঞ্চলে গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছেন।
দেশের গ্যাস পরিস্থিতি বিশ্লেষণে তার বক্তব্যের মূল দিক হলো, বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে নতুন মজুত আবিষ্কারের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। পুরোনো ক্ষেত্রের উৎপাদন কমে আসার পাশাপাশি চাহিদা বাড়ায় নতুন উৎস অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ, অনুসন্ধান কার্যক্রমকে সুন্দলপুর-৪ বা অন্য কোনো একটি সম্ভাবনাময় কূপের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। ভূকম্পন জরিপ, অনুসন্ধান কূপ খনন, ভূতাত্ত্বিক তথ্য বিশ্লেষণ এবং সফল কূপকে দ্রুত উৎপাদনে নেওয়ার কাজ সমান্তরালে এগিয়ে নিতে হবে। এতে নতুন গ্যাসের সন্ধান পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে এবং ভবিষ্যৎ সরবরাহ পরিকল্পনা আরও নির্ভরযোগ্য হবে।
স্থলভাগের কম অনুসন্ধান করা অঞ্চলগুলোর পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরেও অনুসন্ধানের সুযোগ রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি, নির্ভরযোগ্য জরিপ এবং প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের সমন্বয় ঘটাতে পারলে এসব সম্ভাবনার প্রকৃত চিত্র পাওয়া সহজ হবে। নতুন আবিষ্কারের পাশাপাশি আগে শনাক্ত করা সম্ভাবনাময় কাঠামোগুলো পুনর্মূল্যায়ন করাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
দেশের গ্যাস ঘাটতি পূরণে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা, বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় এবং সরবরাহের অনিশ্চয়তার কারণে আমদানিনির্ভর ব্যবস্থায় ঝুঁকি রয়েছে। এ কারণে দেশীয় গ্যাসের অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ও ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিমের বক্তব্যের মূল তাৎপর্য হলো, দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় একক কোনো উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। তাৎক্ষণিক সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকট বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। শুধু এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে সরবরাহ ঘাটতির স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; দেশীয় অনুসন্ধান ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি জ্বালানির উৎস বহুমুখী করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের এসব মূল্যায়ন থেকে স্পষ্ট, আমদানি ও দেশীয় উৎপাদনকে পরস্পরের বিকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। স্বল্পমেয়াদে আমদানি সরবরাহের ঘাটতি সামলাতে সহায়তা করে। অন্যদিকে দেশীয় গ্যাসের নতুন মজুত আবিষ্কার, বিদ্যমান ক্ষেত্রের উৎপাদন বাড়ানো এবং সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করা দীর্ঘমেয়াদে আমদানির ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি করে।
দেশীয় উৎপাদন বাড়লে শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনের পরিকল্পনাও সহজ হতে পারে। তবে এ সুফল নির্ভর করবে নতুন গ্যাসের প্রকৃত প্রাপ্যতা, উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন সক্ষমতা এবং খাতভিত্তিক চাহিদা ব্যবস্থাপনার ওপর।
বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে তিতাস, বিবিয়ানা, হবিগঞ্জ, বাখরাবাদ, কৈলাসটিলা, সিলেট ও ভোলার গ্যাসক্ষেত্র। এসব ক্ষেত্রের কয়েকটি দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় গ্যাস সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। তবে পুরোনো ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে আসার ঝুঁকি মোকাবিলায় নতুন কূপ খনন, বিদ্যমান কূপের সংস্কার এবং অবশিষ্ট মজুতের কার্যকর ব্যবহার জরুরি।
নোয়াখালীর সুন্দলপুর-৪ কূপটি সুন্দলপুর গ্যাসক্ষেত্রের পরিচিত কাঠামোর অংশ। সে কারণে এটিকে সম্পূর্ণ নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হিসেবে বিবেচনা না করে বিদ্যমান এলাকার গ্যাস সম্ভাবনা যাচাই ও উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে দেখা যুক্তিযুক্ত। পরীক্ষায় প্রত্যাশিত প্রবাহ পাওয়া গেলে এ অঞ্চলের গ্যাস উৎপাদনে নতুন অবদান রাখার সুযোগ তৈরি হবে।
এদিকে ভোলায় গ্যাসের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রেও উৎপাদনের পাশাপাশি পরিবহন অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ। কোনো গ্যাসক্ষেত্রে উত্তোলনযোগ্য মজুত থাকলেও প্রয়োজনীয় পাইপলাইন ও সরবরাহব্যবস্থা না থাকলে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে সেই গ্যাস পৌঁছানো কঠিন। তাই অনুসন্ধান, উত্তোলন এবং জাতীয় গ্রিডে সংযোগকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে শুধু গ্যাসের মজুত শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়; কোথায় কত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, কী পরিমাণ উত্তোলন করা সম্ভব এবং কোন অবকাঠামোর মাধ্যমে তা ভোক্তাদের কাছে পৌঁছানো যাবে—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
১৫০ কূপের পরিকল্পনা কতটা গুরুত্বপূর্ণ: দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে সরকার ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার বা সংস্কারের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। ২০২৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর সংসদে জ্বালানিমন্ত্রী জানান, ওই কর্মসূচির আওতায় ৩০টি কূপের খনন ও সংস্কার সম্পন্ন হয়েছে। এর মাধ্যমে দৈনিক প্রায় ১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। আরও সাতটি কূপের কাজ শেষ হলে অতিরিক্ত দৈনিক ৮ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনার কথাও তিনি জানান। এই কর্মসূচির গুরুত্ব হলো, নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের পাশাপাশি বিদ্যমান ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদনক্ষমতা বাড়িয়েও তুলনামূলক দ্রুত সরবরাহে অবদান রাখা সম্ভব। ওয়ার্কওভারের মাধ্যমে উৎপাদন কমে যাওয়া কোনো কোনো কূপের কর্মক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা গেলে নতুন করে অনুসন্ধান ও উন্নয়নের অপেক্ষা না করেই বাড়তি গ্যাস পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে প্রতিটি কূপের ফলাফল তার ভূতাত্ত্বিক অবস্থা ও কারিগরি সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল।
১৫০ কূপের কর্মসূচি নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন, খনন ও সংস্কারের মান নিশ্চিত করা এবং উৎপাদনে আসা গ্যাস দ্রুত জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা গেলে দেশীয় সরবরাহ বাড়ানোর প্রচেষ্টা আরও গতি পেতে পারে। এ জন্য প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি, ব্যয়, উৎপাদন এবং সরবরাহের ফল নিয়মিত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
