সিসা শনাক্তকরণ জোরদার এবং সীসা দূষণ প্রতিরোধে অবিলম্বে পদক্ষেপের দাবি জানিয়ে আজ রবিবার (১৮ অক্টোবর) একটি র্যালির আয়োজন করেছে এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন- এসডো। এতে প্রায় ১৮০ জন তরুণ-তরুণী অংশ নেন। এসময় বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি প্রতিনিধিরাও যোগ দেন।
র্যালিটি সকাল ১০টা থেকে জাতীয় প্রেসক্লাব হতে হয়ে হাইকোর্ট ও দোয়েল চত্বর হয়ে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে শেষ হয়। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, লেড এক্সপোজার এলিমিনেশন প্রজেক্ট (LEEP) ও ইউনিসেফ বাংলাদেশের সহযোগিতায় এসডো এই র্যালিটি আন্তর্জাতিক সিসা বিষক্রিয়া প্রতিরোধ সপ্তাহ (আইএলপিপিডাব্লিউ)-২০২৬ এর প্রচারণার অংশ হিসেবে আয়োজন করে, যার প্রতিপাদ্য ‘From Detection to Prevention’। এই প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে- সীসা বিষক্রিয়া হওয়ার আগেই প্রতিরোধ করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) আয়োজিত ১৪তম আইএলপিপি সপ্তাহটি চলবে ১৮ থেকে ২৪ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত।
বাংলাদেশে শিশুদের মধ্যে সিসা বিষক্রিয়া একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউনিসেফ ও পিওর আর্থের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে ৩৫.৫ মিলিয়ন শিশুর রক্তে সিসার মাত্রা ৫ μg/dL-এর বেশি। সারা বিশ্বে শিশুদের সীসা বিষক্রিয়ায় আক্রান্তের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় ছোট শিশুরা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি সীসা শোষণ করে, যার ফলে মেধাশক্তি হ্রাস, শিখন অসুবিধা এবং আচরণগত সমস্যা দেখা দেয়। সীসা শিশুদের বিকাশমান মস্তিষ্কের এমন ক্ষতি করতে পারে, যা আর ফেরানো যায় না এবং এর প্রভাব থাকে সারা জীবন।
বিষাক্ত এই সিসা বিভিন্ন উৎস থেকে ছড়ায়। যেমন- প্রসাধনী সামগ্রী, ডেকোরেটিভ ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল রঙ, সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত না করা লেড এসিড ব্যাটারি, হলুদের মশলা এবং শিশুদের খেলনা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সীসার নিরাপদ কোনও মাত্রা নেই।
এসডোর সিনিয়র টেকনিক্যাল এডভাইজর প্রফেসর ড. শাহরিয়ার হোসেন বলেন, সীসা অদৃশ্য, কিন্তু শিশুর মস্তিষ্কের ওপর এর ক্ষতি স্থায়ী। তাই আগে শনাক্তকরণকেই গুরুত্ব দিতে হবে। আরও শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগেই আমাদের পরীক্ষা করতে হবে, উৎস খুঁজে বের করতে হবে এবং ব্যবস্থা নিতে হবে। রঙের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে ইতোমধ্যে ৯০ ppm মানদণ্ড রয়েছে এবং নতুন জাতীয় কৌশলপত্র একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে। এখন বাজারে এই মানদণ্ড কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং পরিকল্পনাকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দিতে হবে।’
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, সীসা কীভাবে আমাদের প্রতিদিনের জীবনে খারাপ প্রভাব ফেলছে তা আজকের এই জাঁকজমকপূর্ণ র্যালির মাধ্যমে জনসাধারনের দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। সীসার এই বিষাক্ততা এমনিতে দেখা যায় না, কিন্তু এর হুমকি মারাত্মক। তাই একে খুব ছোট করে দেখারও সুযোগ নেই। জাতীয় জনস্বাস্থ্যের জরুরি অবস্থা হিসেবে দেখার আহ্বান করছি।
তরুণ-নেতৃত্বাধীন এই র্যালির উদ্দেশ্য ছিল চলমান এই জনস্বাস্থ্য সংকটের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ এবং শিশুদের এই অদৃশ্য বিষ থেকে রক্ষা করার জন্য শনাক্তকরণ ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা আরও জোরদার করা।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব সাবরীনা রহমান বলেন, আমাদের আগে সঠিক তথ্য জানতে হবে যে, বাংলাদেশে সীসা দূষণের উৎসগুলো কী কী? আমাদের বর্তমান অবস্থা এখন কেমন এবং কীভাবে আমরা এই জরুরি অবস্থা মোকাবেলা করবো? সবকিছুই সম্ভব হতে পারে সচেতনতা এবং এডভোকেসির মাধ্যমে।
আই.সি.ডি.ডি.আর,বি’র রিসার্চ অফিসার সুহান আহমেদ বলেন, সীসার বিষক্রিয়া একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি, কিন্তু তা প্রায়ই চোখে পড়ে না। এটি শিশুদের বিকাশ এবং পুরো সমাজের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য বিপদ ডেকে আনে। এটি কোনো ছোটখাটো বিষয় নয় বরং একটি জনস্বাস্থ্যের জন্য বড়ধরনের জরুরি অবস্থা, যা নিয়ে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।
র্যালির মাধ্যমে জনসাধারণ ও গণমাধ্যমের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নীতিনির্ধারকদের প্রতি আরও কঠোর নিয়ম তৈরি করার এবং তা কার্যকর করার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে সুরক্ষা দিতে জনস্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলাদেশকে সকল উৎস থেকে সীসা দূর করতে হবে।
এ লক্ষ্যে সরকার সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। মন্ত্রিসভা ‘সীসামুক্ত বাংলাদেশের জন্য জাতীয় কৌশলপত্র ও বহুবার্ষিক কর্মপরিকল্পনা (২০২৬–২০৩৫)’-এর খসড়া অনুমোদন দিয়েছে। এর লক্ষ্য সীসার সংস্পর্শ কমানো, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া এবং দেশে সীসাজনিত দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও ধাপে ধাপে নির্মূল করা। এম.আই.সি.এস (MICS) এর ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে লেড বিষাক্ততার ভিত্তিমাত্রা ৩৮.৩৪ শতাংশ। কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই ভিত্তিমাত্রার তুলনায় ২০৩০ সালের মধ্যে শিশুদের রক্তে সীসার মাত্রা ৫০ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ৯৫ শতাংশ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অংশগ্রহণকারীরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানান, তবে তাদের মতে শুধু পরিকল্পনা থাকলেই হবে না; পর্যাপ্ত সম্পদ বরাদ্দ, মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বিত বাস্তবায়ন এবং অগ্রগতি নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে।
