বিআইডব্লিউটিএ’র প্রধান প্রকৌশলী (ড্রেজিং) এএইচএম ফরহাদুজ্জামানসহ আরও তিন প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে ২০০৮ সালে মামলা করেছিল দুদক। মামলায় আরিচা-রাজশাহী ও গোদাগাড়ী-ভোলারহাট ড্রেজিং প্রকল্পে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বেসিক ড্রেজিং কোম্পানি লিমিটেডের কাছ থেকে ১ কোটি ২৯ লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে তা পে-অর্ডারের মাধ্যমে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের ব্যাংকে জমা করার প্রমাণ পায় দুদক। ওই বছরের ডিসেম্বরে মামলাটির তদন্ত শুরু করে কমিশন। তবে নানা জটিলতা ও আসামিদের তৎপরতায় দীর্ঘ সময়েও মামলার তদন্ত কাজ শেষ করতে পারেনি। ১১ বছর পর ২০১৯ সালের জুলাইয়ে তদন্ত শেষ করে আসামিদের অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন দুদকের সহকারী পরিচালক মো. নূর-ই আলম।
প্রতিবেদন দাখিলের সময় পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা চাওয়া হয়। কিন্তু তারপরও আসামিরা মামলার বিচারপ্রক্রিয়া আটকে দেয়ার চেষ্টা করেন। তারা মামলা বাতিল চেয়ে আদালতে একাধিক আবেদনও করেন। এতে ৬ বছর আগে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিলেও ২০২৪ সালে মামলাটির বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়। বর্তমানে মামলাটি ঢাকা মহানগর বিশেষ জজ-৫-এ বিচারাধীন রয়েছে। ইতিমধ্যে মামলার ১০ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে। সূত্র বলছে, এখনো আসামিরা মামলার বিচার আটকে দিতে নানাভাবে প্রভাব খাটাচ্ছেন। মামলাটি রাজনৈতিকভাবে এক-এগারো মামলা দেখিয়েও অব্যাহতি চাওয়া হয়। এদিকে দুর্নীতির মামলা ঘাড়ে নিয়েই একজন ৪ দফা পদোন্নতি পেয়ে প্রধান প্রকৌশলী হয়ে গেছেন। একজন অবসরে গেছেন। বাকি একজন ২ দফা পদোন্নতি পেয়েছেন। তবুও মামলা শেষ হয়নি।
দুদকের মামলা মাথায় নিয়েই এর মধ্যে অভিযুক্ত ফরহাদুজ্জামান সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। পূর্বাচল, মিরপুর, নয়াপল্টন ও পাটগ্রামে নিজের ও স্ত্রীর নামে একাধিক প্লট, জমি ও ফ্ল্যাট কিনেছেন। শুধু ফরহাদ নয় মামলা চলমান থাকা অবস্থায়ই আসামিদের প্রত্যেকেই বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন। জানতে চাওয়া হলে মামলার তিন নম্বর আসামি এএইচএম ফরহাদুজ্জামান মানবজমিনকে বলেন, এটা এক-এগারোর সময়ের রাজনৈতিক মামলা ছিল। আমরা কোনো ঘুষ নিইনি। আর বিষয়টি হাইকোর্ট থেকে আমাদের অব্যাহতি দিয়েছেন। তারপরও দুদক মামলা চালাচ্ছে। নিশ্চয়ই আমরা খালাস পাবো। আদালতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মামলার ১০ সাক্ষীর সবাই আসামিদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন। শুনানি চলছে প্রতি মাসেই। মামলায় সর্বোচ্চ সাজার আশা করছে রাষ্ট্রপক্ষ। যাদের বিরুদ্ধে মামলা চলমান আছে- বিআইডব্লিউটিএ ড্রেজিং বিভাগের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম ও তার স্ত্রী শারমিন ইসলাম।
সহকারী প্রকৌশলী এএইচএম ফরহাদুজ্জামান বর্তমানে প্রধান প্রকৌশলী ড্রেজিং বিভাগ ও তার শাশুড়ি ফেরদৌস জাহান। তৎকালীন উপ-সহকারী প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিক ও তার স্ত্রী ফজিলা খাতুন। উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. জহিরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী আফরোজা খানম। এরা প্রত্যেকেই কয়েকদফা পদোন্নতি পেয়ে বড় পদে চলে এসেছেন। জানতে চাওয়া হলে মহানগর বিশেষ জজ-৫ আদালতের দুদকের আইনজীবী জহিরুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, বিআইডব্লিউটিএ প্রকৌশলীদের ড্রেজিং দুর্নীতির মামলার সাক্ষ্য চলমান আছে। প্রতি মাসেই শুনানি চলছে। দ্রুতই মামলাটির রায় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আশা করি আসামিদের সবার সর্বোচ্চ সাজা হবে। আর মামলায় এখন পর্যন্ত যত তথ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে তাতে কারও পার পাওয়ার সুযোগ নেই বলে মনে করি।
দুদকের দেয়া অভিযোগপত্রে বলা হয়, মামলার ৩ নম্বর আসামি এএইচএম ফরহাদুজ্জামানসহ ২ প্রকৌশলী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অভিযুক্ত তিন প্রকৌশলী স্বেচ্ছায় সত্য ও জবাবদিহিতা কমিশনে হাজির হয়ে স্বহস্তে লিখিত আবেদন করে ঘুষ গ্রহণের কথা স্বীকার করেন এবং অনুকম্পা সনদ গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে ঘুষের পুরো টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেন। পরে সত্য ও জবাবদিহি কমিশন তাদের অব্যাহতি দেন। কিন্তু ফৌজদারি অপরাধ হওয়ায় দুদক মামলাটি চলমান রাখে এবং তদন্ত করে। এজাহারে থাকা আসামিরা বেসিক ড্রেজিং কোম্পানি লিমিটেডের কাজের বিল উত্তোলনে বাধা প্রদান করেন এবং টাকা না দিলে বিল তুলতে দিবেন না মর্মে হুমকি প্রদান করেন। পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি বাধ্য হয়ে এসব প্রকৌশলীদের নিজ নাম এবং তাদের স্ত্রী, শাশুড়ির ব্যাংক হিসাবে পে-অর্ডারে মাধ্যমে ১ কোটি ২৯ লাখ ৫ হাজার ৯৩৯ টাকা প্রদান করেন। তারা ঘুষ হিসেবে পাওয়া টাকা বিভিন্ন সময়ে ব্যাংক থেকে উত্তোলন করেন। পে-অর্ডারের মাধ্যমে ঘুষ গ্রহণ করে দণ্ডবিধির ১৬১/১৬৫ (ক) ধারাসহ ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের (৫)২ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। মামলার তদন্তে প্রমাণ পাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হলো।
